জিন্দেগি কা সফর

বাবার কাছে ছেলেটির আবদার ছিল চমকপ্রদ৷ ‘দাদামণি’র গান গাইলে চারআনা দিতে হবে সায়গল সাহেবের গান গাইলে আটআনা৷ অবিশ্যি ‘দাদামণি’ অশোককুমারের ছবির ‘ম্যায় বনকে চিড়িয়া’ গানখানা গাইলে অন্য হিসেব৷ তখন তো আবার পুরুষ কণ্ঠের সঙ্গে নারীকণ্ঠের অংশটুকুও গাইতে হবে৷ তাই সোজা ‘রেট’ এক একটির জন্য আটআনা করে৷ হ্যাঁ, সে বালক অবলীলায় নারীকণ্ঠের গানও গেয়ে দিতে পারত৷ ‘হাফ টিকিট’ ছবির গান রেকর্ডিংয়ের দিন এই প্রতিভারই পরিচয় পাবেন সংগীত পরিচালক সলিল চৌধুরী৷ ছবির সিকোয়েন্স ছিল, এক পুরুষ মেয়ে সেজে গান গাইছেন৷ সে গান গাওয়ার কথা ছিল লতাজির৷ তিনি সেদিন স্টুডিওতে আসতে একটু দেরি করছেন৷ এমন সময় যিনি পুরুষকণ্ঠে গান গাইবেন তিনি ঠিক করলেন, তিনিই নারীকণ্ঠের গানও গেয়ে দেবেন৷ তা আবার হয় নাকি! আলবাত হয়৷ গেয়ে দেখালেন৷ এবং এমন গাইলেন যে, সকলে আজও স্বীকার করবেন, যদি লতাজিও গাইতেন গান হয়তো অনেক ভালো হত, কিন্তু অমন মজা বোধহয় হত না৷

 

নতুন করে বলে দেওয়ার প্রয়োজন পড়ে না যে,ইনিই কিশোরকুমার৷ বিধাতার সৃষ্টিশালায় অনেক সৃষ্টিছাড়া সৃষ্টির সন্ধান মেলে, সাধারণের ভাষায় যার উপমা দেওয়া অসম্ভব হয়ে পড়ে৷ বলাবাহুল্য কিশোরকুমার সে গোত্রের উজ্জ্বলতম প্রতিনিধি৷ তাঁকে বিরল প্রতিভা বলে আখ্যায়িত করাই যায়, তাতে তিনি অনেকখানিই অধরা থেকে যান৷ খতিয়ে দেখলে দেখা যাবে,  এই একটু খ্যাপামি, হাসি মজা, ইয়ডলিং-এসব হয়ত এক আদ্যন্ত জীবনসংগ্রামীর স্বল্প পরিসর আত্মজীবনীর প্রচ্ছদ৷ প্রথাগত কাঠামো থেকে একটি দূরে স্বশিক্ষিতের আত্মপ্রতিষ্ঠার ভিতরের ইতিহাসে আজও লেগে আছে ঘামের গন্ধ৷ ‘জিন্দেগি কা সফর হ্যায় ইয়ে ক্যায়সা সফর কোই সমঝা নেহি কোই জানা নেই..৷’ সত্যি তো আমরা আর কতটুকু জানব, শুধু দেখি সুরের গায়ে তিনি অবিশ্বাস্য দক্ষতায় মিশিয়ে দেন দীর্ঘশ্বাস৷

 

দুনিয়াকা নজর মে ম্যায় পাগল হুঁ…

এই তাঁর ইমেজ৷ তিনি নিজেও তা জানতেন৷ কিন্তু তার সঙ্গেই বিশ্বাস করতেন, ‘লেকিন মেরে নজর মে দুনিয়া পাগল হ্যায়৷’ দুনিয়া পাগল বলেই তাঁর খ্যাপামির দিকটা যতোখানি সামনে আসে, তাঁর শিক্ষার প্রসঙ্গ ততোখানিই আড়ালে৷ তাঁর গান এত সহজ যে, সকলে মুখে মুখে তুলে নিতে পারেন৷ আসলে তাঁর শিক্ষার গুণটিই ওরকম৷ সংগীতকে তিনি আত্মস্থ করেই তা সবার সামনে এনেছেন৷ আর তাই সে গান এভাবে হয়ে উঠেছে এরকম প্রাণের গান৷ তাই বলে শিক্ষার কোনও কসুর ছিল না৷ নাহ তেমন করে গুরুর কাছে নাড়া বেঁধে গান শেখেননি বটে, কিন্তু মা গৌরীদেবীর হাত ধরেই হারমোনিয়াম রিডে আঙুল চালনা শিখেছিলেন কিশোর৷ বাবার ছিল গ্রামফোন আর অসংখ্য রেকর্ড৷উচ্চাঙ্গসংগীত থেকে পাশ্চাত্য সংগীত, ভক্তিগীতি, রবীন্দ্রসংগীত কোনও বাছবিচার ছিল না৷সে সবের নিবিষ্ট শ্রোতা ছিলেন কিশোর৷ শুধু শুনেই শেষ নয়৷ তা নিয়ে প্রশ্নও করতেন? এমন প্রশ্ন যার সামনে তাঁর খ্যাতনামা দাদাও নিরুত্তর৷ উচ্চাঙ্গসঙ্গীত নিয়ে তাঁর অনেক প্রশ্ন ছিল, এবং সেসবের সম্মান রক্ষা করেই তাঁর গানকে নিজের মতো করে নিয়েছিলেন৷বস্তুত খান্ডোয়ার বাড়ির  এই  সাংগীতিক পরিবেশই ছিল তাঁর সংগীতের গুরু৷ আর একলব্য কিশোরের দ্রোণাচার্য ছিলেন কুন্দনলাল সায়গল৷

কুছ তো লোগ কহেঙ্গে

যাঁর দাদা অশোককুমার, সিনেদুনিয়ায় তাঁর দরজা তো সহজে খুলবেই-এমনটা ভাবাই স্বাভাবিক৷ তা ‘কুছ তো লোগ কহেঙ্গে, লোগোকি কাম হ্যায় কেহনা’৷ আসলে তো ব্যাপার এত সহজ ছিলই না৷ ফিল্মিস্তানের সর্বময় কর্তা শশধর মুখার্জি তাঁর জামাইবাবু হওয়া সত্ত্বেও সোলো গানের সুযোগ মেলেনি৷এমনকি যে ‘জিদ্দি’তে দেব আনন্দ অবিসংবাদিত রোম্যান্টিক নায়ক হয়ে উঠলেন, সেখানেও অশোককুমার ওতপ্রোত জড়িয়ে থাকলেন, তবু ভাইকে সুযোগ করে দিতে পারলেন না৷ কিশোর সে ছবিতে পেয়েছিলেন মালীর চরিত্র৷ তবে এই ‘জিদ্দি’তেই সায়গল স্টাইলে একটি গান গাওয়ার সুযোগ পেয়ে গিয়েছিলেন৷ সংগীত পরিচালক ছিলেন খেমচাঁদ প্রকাশ৷ এর আগে তাঁর সুরেই গেয়েছিলেন ‘সমাজ কি বদল ডালো’ ছবিতে৷সেই তাঁর ছবিতে প্রথম সোলো গান৷ যাইহোক ‘জিদ্দি’র গানেই চোখে পড়ে গেলেন শচীনদেব বর্মনের৷ তবু রাস্তাটা সোজা ছিল না৷ কেননা তখন হিন্দি গানের আসর দাপিয়ে বেড়াচ্ছেন হেমন্তকুমার৷ মান্না দে-ও উঠে আসছেন৷ আছেন মুকেশ, মহম্মদ রফি৷ এরই মধ্যে সমান্তরাল পথ বেয়ে উঠে আসার চেষ্টায় ছিলেন কিশোর৷ বন্ধু দেব আনন্দও তখন মূলস্রোতে উঠে আসার চেষ্টা করছেন৷ শেষমেশ বন্ধুকৃত্য  করলেন তিনি৷ ‘মুনিমজি’ ছবির কথাবার্তা চলছিল৷ দেব আনন্দ শচীন দেব বর্মনকে রাজি করালেন যে লিড সঙ গাইবেন কিশোরকুমার৷ ১৯৫৫ সালে গাইলেন, ‘জীবন কে সফর মে…’৷ দেব আনন্দ-শচীন দেব বর্মন-কিশোরকুমার জুটি ফিরল পরের বছরও৷ ‘দুখী মন মেরে, শুন মেরে কহেনা’- এ গানে আক্ষরিক অর্থেই দীর্ঘশ্বাসের জলছবি আঁকলেন তিনি৷ পরের বছর ‘ন দো গ্যারা’৷ এ ছবিতে কথোপকথনের ভঙ্গিতে আশা ভোঁসলের সঙ্গে যে গান গাইলেন তিনি-‘আঁখো মে কেয়া জি? .. পহেলে বাদল, বাদল মে কেয়া জি, বিসিকি আঁচল, আঁচল মে কেয়া জি?..আজব সি হালচাল’- তা তাঁকে দিল প্রার্থিত জনপ্রিয়তা৷ আর এরপর ‘পেয়িং গেস্ট’-এ গাইলেন ‘মানা জনাব নে পুকারা’৷ এই গান থেকেই অমরত্বের সড়কে যাত্রা শুরু করলেন কিশোরকুমার৷

পরবর্তীকালে তাঁর নামে অনেক বদনাম রটবে৷ কেউ কেউ বলবেন, পুরো টাকা না দিলে নাকি রেকর্ডিংয়েই যেতেন না ইত্যাদি ইত্যাদি..৷ সে সবের অন্তরালে আমরা খবরও রাখি না, তা আসলে কতখানি বিরক্তিপ্রসূত, কতটা স্ব-আরোপিত৷  উত্তরকালে যিনি গাইবেন ‘কুছ তো লোগো কহেঙ্গে, লোগোকি কাম হ্যায় কহেনা’, আমরা আবিষ্কার করব সে গানের ভিতর যে চাপা মনোকষ্ট সে কি এই এতকাল ধরে এক কাব্যে উপেক্ষিতেরই মথিত দীর্ঘশ্বাস নয়?

অগর তুম না হোতে…

কিশোরকুমার না হলে কি হিন্দি গানের গায়নরীতিতে এত বৈচিত্র পাওয়া যেত কি? এই বৈচিত্রের জেরেই তো এক নায়কে তিনি আটকে থাকলেন না৷ দেব আনন্দ থেকে অমিতাভ বচ্চন হয়ে মিঠুন চক্রবর্তী, তিনি একইরকম থেকে গেলেন৷ আর তাই অভিনয় করলেও সংগীতকেই নিজের আত্মা করে নিয়েছেন, বলেছেন, ‘ গান গাওয়া আমার প্রথম প্রায়োরিটি৷ তারপর মিউজিক৷ তার পরে অভিনয় আসতে পারে৷ আমার মনে হয়, অভিনয় সকলে বিশ্বাস করে নেন, কিন্তু গান শ্রোতাদের হৃদয় ছুঁয়ে যায়৷’

সায়গল সাহেবের গায়কি অনুকরণ করে যে গায়কের উঠে আসা, তিনি জন্ম দিতে পেরেছিলেন এমন এক গায়নরীতির, যা পরিচালক, নায়ক তো বটেই, সংগীতপ্রেমীদেরও নিজস্ব আশ্রয় হয়ে উঠবে ৷  ‘দুখি মন মোরা’র যে কিশোরকে শ্রোতারা একদা গ্রহণ  করেছিলেন , সেই শ্রোতা হয়ত পালটে গিয়েছিল, তবু ‘খাইকে পান বানারসওয়ালা’র কিশোরও শ্রোতাদেরও তৃপ্তি দিতে পেরেছিলেন৷ আসলে সায়গল পরবর্তী যুগে হিন্দি গানের দুনিয়া হেমন্তকুমারের ঈশ্বরপ্রতিম কণ্ঠস্বর  পেয়েছে, মুকেশের কণ্ঠে পেয়েছে প্যাথস, বেদনার আর্তি, তালাত মাহমুদের কণ্ঠে পেয়েছে অদ্ভুত ঝিমধরানেশা, মান্না দে-র রেওয়াজসমৃদ্ধ জোয়ারি কণ্ঠও পেয়েছে আর সর্বোপরি মহম্মদ রফির গলায় পেয়েছে নির্বিকল্প রোমান্স৷ কিন্তু একই সঙ্গে বেদনা ও প্রেমের কোলাজ কিশোরের মতো করে আর কেইবা আঁকতে পেরেছেন? সন্ন্যাসীর উদাসীনতা ও জীবনরসিকের প্রাণোচ্ছ্বাসকে এক কণ্ঠের গেলাস মদিরা করে শ্রোতাদের সামনে তুলে ধরা কিশোর ছাড়া আর কারও পক্ষে সম্ভব হত না৷ এখানেই তিনি স্বতন্ত্র৷ এখানেই তিনি তীব্রভাবেই এক ও অনন্য৷

মুসাফির হুঁ ইয়ারো

ব্যক্তিগত জীবন, বৈবাহিক জীবন কেটেছে নানা টালমাটালে৷ যে মানুষ সহজে কোটি কোটি মানুষের হৃদয় ছুঁতে পারতেন, কাছের মানুষদের মন ছুঁতে তিনি যে কেন ব্যর্থ হতেন, তার কোনও ব্যাখ্যা নেই৷ জীবনভর প্রেমের মাধুকরী করেছেন৷আর সেই আনন্দ, সেই ব্যর্থতা তিনি মিশিয়ে দিয়েছেন তাংর সংগীতে৷ মুকুবল দত্ত গানে লিখেছিলেন পুজার ফুল ভালোবাসা হয়ে গেছে, কিন্তু কিশোরের ক্ষেত্রে হয়েছে তার ঠিক উলটো৷ তাঁর পুজার ফুল হয়ে গিয়েছে ভালোবাসা৷ আর তাই পরবর্তীকালে কিশোরের গায়কি নকল করেছেন হয়ত অনেকেই, কিন্তু এই মুসাফিরানা কেইবা অর্জন করতে পারেন? এই তাঁর নিজস্ব সম্পদ৷ বহুবিবাহ, পাগলামি এ সব তো কিশোরকুমার নন,  যে ক’জন বাঙালি সর্বভারতীয় খ্যাতির মঞ্চে বসেও মনেপ্রাণে বাঙালি থাকতে পেরেছিলেন, ভিনপ্রদেশি বাঙালি হয়েও কিশোর ছিলেন তাঁদের অন্যতম৷

একদিন পাখি যে আকাশে উড়ে যাবে কিশোর জানতেন৷ তাই বোধহয় এত যত্ন করে তৈরি করেছিলেন তাঁর গানের পাখিকে৷ যার উড়ান আজও শেষ হয়নি৷ যার ডানা মেলে রাখা আগামীর বাতাসে৷ কেননা আমারা জানি চোখের জলের কোনও রঙ হয় না, তবু নয়ন সরসি জলে ভরে উঠলে সেখানে কাজলে কাজলে কী যে লেখা থাকে তা জানেন, আমাদের জানাতে পারেন একমাত্র কিশোরকুমারই৷ 

সরোজ দরবার