কিম ন্যামের মৃত্যু মারকভ হত্যার কথা মনে করিয়ে দেয়

নিখিলেশ রায়চৌধুরী

উত্তর কোরিয়ার শাসক কিম জং-উনের সৎ ভাই কিম জং-ন্যামের অস্বাভাবিক মৃত্যু নিয়ে বেশ কিছু দিন ধরে তুলকালাম কাণ্ড ঘটেছে৷ অভিযোগ, মালয়েশিয়ায় কিম ন্যামকে বিষপ্রয়োগ করে হত্যা করিয়েছে কিম জং-উন৷ এই ঘটনার সূত্রে মালয়েশিয়ার সঙ্গে উত্তর কোরিয়ার কূটনৈতিক সম্পর্কেরও যারপরনাই অবনতি ঘটেছে৷ যাদের সঙ্গে এখনও উত্তর কোরিয়ার কূটনৈতিক সম্পর্ক রয়েছে, মালয়েশিয়া ছিল সেই রকমই হাতে-গোনা কয়েকটি রাষ্ট্রের একটি৷ কিম ন্যামের রহস্যময় মৃত্যুকে কেন্দ্র করে সেই সম্পর্কেও ঘুচে গেল৷

সত্যিই যদি আততায়ীর মাধ্যমে বিষপ্রয়োগে কিম জং-উনের সৎ ভাইয়ের মৃত্যু হয়ে থাকে, তাহলে বলতে হবে— প্রায় একই ভাবে মৃত্যু হয়েছিল বুলগেরিয়ার দেশান্তরী সাংবাদিক গেওর্গি মারকভের৷ লন্ডনে তাঁকে অদ্ভূতভাবে বিষপ্রয়োগে হত্যা করেছিল বুলগেরিয়ার শেষ কমিউনিস্ট শাসক টোডর ঝিভকভের ঘাতকেরা৷ একটা ছাতার ডগায় সিরিঞ্জ ঢুকিয়ে তার একখোঁচায় ভবলীলা সাঙ্গ করে দেওয়া হয়েছিল মারকভের৷ সিরিঞ্জের মুখে ছিল একটি অতি ক্ষুদ্র প্ল্যাটিনাম ও টাইটেনিয়ামে তৈরি ক্যাপসুল৷ তার মধ্যে ছিল বিষাক্ত রাসায়নিক৷ রাসায়নিক বলতে রজন৷ ছাতার বাঁটে লুকানো ছিল ট্রিগার৷ টেপার সঙ্গে সঙ্গে রিভলভারের মতো স্প্রিং ছিটকে যাবে৷ আর ক্যাপসুলটা ঢুকে যাবে শিকারের শরীরে৷

এই প্রতিবেদকের আরও লেখা পড়ুন: বেজিং থেকে খালি হাতেই ফিরলেন সুব্রহ্মণ্যম জয়শঙ্কর

যৌবনেই লেখক হিসাবে সুখ্যাতি পেয়েছিলেন মারকভ৷ তখনও তিনি কমিউনিস্ট শাসনের বেজায় ভক্ত৷ ফলে বুলগেরিয়ার কমিউনিস্ট শাসকদের আনুকূল্য এবং অনুগ্রহও কিছু কম পাননি৷ রাজধানী সোফিয়ায় দামী ভিলা, বিএমডব্লু গাড়ি, ডলার-পাউন্ড-মার্কে ঠাসা আমানত— কী ছিল না তাঁর! কিন্তু সেই মারকভই ১৯৬০-এর শেষাশেষি সেদেশের শাসককুলের প্রতি বীতশ্রদ্ধ হয়ে পড়লেন৷ লেগে গেল শাসকদের সঙ্গে খটাখটি৷ শাসকদের ব্যঙ্গ করে একটি নাটক লিখলেন— এক জেনারেলের মৃত্যু৷ নাটকের মূলকথা— শাসকদের বিরাগভাজন হয়ে জেনারেলকে মরতে হল৷ বুলগেরিয়ার শাসককুলের সঙ্গে মারকভের ঝামেলা তুঙ্গে উঠল৷ অবশেষে দেশান্তরী হলেন৷ চলে গেলেন ব্রিটেনে৷ শাসকরাও হাঁফ ছেড়ে বাঁচলেন, মারকভ-ও৷ কিন্তু একটা ব্যাপারেই বুলগেরিয়ার কমিউনিস্ট শাসকদের দূরদর্শিতার অভাব ছিল৷ তাঁরা ভেবেছিলেন, আপদ বিদেয় হয়েছে৷ আর কোনও ভয় নেই৷ লন্ডনে গিয়ে মারকভ বিবিসিতে যোগ দিলেন এবং বুলগেরিয়ার কমিউনিস্ট শাসনের আদ্যশ্রাদ্ধ শুরু করে দিলেন৷ সেদেশের শাসক টোডর ঝিভকভের রাতের ঘুম উড়ে গেল৷ তিনি ঠিক করলেন, মারকভকে এই ধরাধাম থেকেই চিরতরে সরাতে হবে৷ কিন্তু উপায়?

টোডর ঝিভকভ তাঁর ভাগ্যবিধাতা তদানীন্তন সোভিয়েত নেতৃত্বের শরণাপন্ন হলেন৷ তাদের গুপ্তচর বাহিনী কেজিবি-ই একমাত্র পারে তাঁর অভিলাষ পূরণ করতে৷ ১৯৭৭ সাল৷ তখন কেজিবি-র মাথায় ইউরি আন্দ্রোপভ৷ টোডর ঝিভকভের দূত হয়ে বুলগেরিয়ার স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী গেলেন তাঁর সঙ্গে দেখা করতে৷ আন্দ্রোপভ কিন্তু প্রথমে এ ব্যাপারে রাজি হননি৷ সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর গোটা পর্বটার কথা স্বীকার করেছিলেন এক রুশ মেজর জেনারেল, নাম কালুগিন৷ কারণ, তাঁর তত্ত্বাবধানেই লেখা হয়েছিল মারকভ নিধন পর্বের চিত্রনাট্য৷

এই প্রতিবেদকের আরও লেখা পড়ুন: পাকিস্তান সন্ত্রাসবাদী নয়! মোদী সরকারকে ভুগতে হবে

১৯৭৮ সালের গোড়ায় কেজিবি-র সেই মিটিংয়ে আন্দ্রোপভের সঙ্গে ছিলেন কালুগিন, কেজিবি-র তৎকালীন উপকর্তা ক্রিউচকভ এবং উতাসভ নামে আর এক বড় অফিসার৷ টোডর ঝিভকভের আবদারের কথা পাড়ার পরই আন্দ্রোপভ গম্ভীর হয়ে যান৷ তিনি চেয়ার ছেড়ে উঠে উত্তেজিতভাবে পায়চারি শুরু করেন৷ বেশ কিছুক্ষণ পরে বলেন, ‘‘আমি এতে একেবারেই রাজি নই৷ আমি ব্যক্তিহত্যায় বিশ্বাসী নই৷’’ খোদ কেজিবি চেয়ারম্যানের মুখে এই জবাব শুনে তখন অন্যরা কী বলবেন আর বুঝে উঠতে পারছেন না৷ শেষ পর্যন্ত ক্রিউচকভ বললেন, ব্যাপারটাকে রাজনৈতিক দিক থেকে বিচার করুন৷ বুলগেরিয়ার সঙ্গে আমাদের যা সম্পর্ক, তাতে এ ব্যাপারে সটান ‘না’ বলে দিলে পরবর্তীকালে তার প্রতিক্রিয়া কী হবে সেটা ভাবা দরকার৷ অবশেষে আন্দ্রোপভ নিমরাজি হলেন, তবে সেইসঙ্গে নির্দেশ দিলেন— এ ব্যাপারে অন্য সাহায্য যা করার করুন, কিন্তু সরাসরি কেজিবি যেন এতে না থাকে৷ ওই নোংরা কাজ সারতে হলে বুলগেরিয়ানদের নিজেদেরই তা করতে হবে৷ আমরা তাতে নেই৷

দায়িত্ব পড়ল কালুগিনের উপর৷ বুলগেরিয়া চায় রাসায়নিক প্রয়োগ করে মারকভকে মারতে৷ এ ব্যাপারে তখন কেজিবি-তে যিনি সিদ্ধহস্ত সেই কর্নেল গোলোবেভকে ডেকে পাঠালেন কালুগিন৷ গোলোবেভ ছিলেন ‘wet’ দফতরের পাণ্ডা৷ যাদের দায়িত্ব ছিল যে কাউকে হাপিশ করে দেওয়ার জন্য মাথা খাটানো এবং সেইমতো সাফাই ধোলাই করা৷ ‘wet’ ছিল কেজিবি-র অভ্যন্তরে ওই দফতরের চলতি নাম৷ বুলগেরিয়ার আবদারমতো গোলোবেভকে একটা প্রাণঘাতী রাসায়নিক তৈরির নির্দেশ দিলেন কালুগিন৷ অবশেষে সেই রাসায়নিকের উপযুক্ত উপাদানের সন্ধান মিলল বুলগেরিয়াতেই৷ রজন৷ বিষভরা ক্যাপসুল তৈরি করে এবং ছাতার মাধ্যমে তা প্রয়োগ করার গোটা প্রযুক্তিটা বানিয়ে বুলগেরিয়ার গুপ্তচর বাহিনীর হাতে তুলে দিল কেজিবি৷

১৯৭৮ সালের হেমন্তে লন্ডনের জনবহুল রাস্তায় সেই বিষ প্রয়োগ করা হল মারকভের উপর৷ মারকভ রাস্তা দিয়ে আপনমনে হাঁটছেন, বাসস্টপে যাত্রীদের লম্বা লাইন৷ হঠাৎ তাঁর ডান উরুতে একটা পিন ফোটার যন্ত্রণা৷ মারকভ ফিরে দেখলেন, অপেক্ষারত এক বাসযাত্রীর ছাতার ডগায় খোঁচা খেয়েছেন তিনি৷ কিছু বলার আগেই সেই যাত্রী স্লাভিক টানের ইংরেজিতে ক্ষমা চাইল, আর তার পরই তড়িঘড়ি লাইন ছেড়ে বেরিয়ে একটা ট্যাক্সি ডেকে উঠে পড়ল৷ বিবিসি-র দফতরে পৌঁছে মারকভ দেখলেন, যেখানে খোঁচা লেগেছিল সেখানটা ফুলে গিয়েছে৷ এক সহকর্মীকে বললেনও গোটা ঘটনাটা৷ রাতে বাড়ি ফিরতে না ফিরতেই ধুম জ্বর এল৷ পর দিন তাঁর স্ত্রী অ্যানাবেল স্বামীকে যখন হাসপাতালে নিয়ে গেলেন তখন বহু পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেও ডাক্তাররা জ্বরের হদিশ বের করতে পারলেন না৷ কোনও অ্যান্টি-বায়োটিকে ইঞ্জেকশনেই কোনও কাজ হল না৷ ছাতার খোঁচা লাগার চার দিনের মাথায় হাসপাতালের বেডেই হার্টফেল করলেন মারকভ৷ কিন্তু ডাক্তারদের সন্দেহ হওয়ায় তাঁরা পোস্ট মর্টেম করতে বললেন৷ ল্যাব টেস্টে মারকভের শরীরে পাওয়া গেল মাত্রাতিরিক্ত রজন৷ কেন এবং কীভাবে এটা ঘটল, বহু কাল বাদে সেটাই লন্ডনে বসে MI5-এর অফিসারদের আগাগোড়া জানিয়েছিলেন কালুগিন৷ যদিও ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার আগে মারকভ হত্যা সংক্রান্ত যাবতীয় নথি পুড়িয়ে দিয়েছিল বুলগেরিয়ার কমিউনিস্ট কর্তৃপক্ষ৷