দিল্লিতে কিডনি পাচারের এক পাণ্ডাকে ধরে বড়সড় অপরাধ চক্রের খোঁজ পেয়েছে পুলিশ৷ সূত্র এসে পৌঁছেছে কলকাতায়৷ যদি ঠিক ঠিক পথে তদন্ত এগোয়, তাহলে কেঁচো খুঁড়তে কেউটের সন্ধান পেতে পারেন তদন্তকারীরা৷

নিখিলেশ রায়চৌধুরী
নিখিলেশ রায়চৌধুরী

একটা সময় ছিল যখন মূলত দাক্ষিণাত্যের রাজ্যগুলিতে, বিশেষ করে তামিলনাড়ু এবং অন্ধ্রে এই ধরনের একাধিক চক্র রমরমা কারবার চালাত৷পড়াশোনা না-জানা, প্রত্যন্ত গ্রামের হতদরিদ্র মানুষজনই হত এদের টার্গেট৷ সামান্য কিছু টাকা দিয়ে তাদের কিডনি বের নিয়ে তারা বিভিন্ন বেসরকারি হাসপাতালে পাচার করত এবং কোটি কোটি টাকা লুটে নিত৷ প্রশাসন জেনেশুনেও কিছু বলত না, তার কারণ অপরাধীদের হাত ছিল অনেক লম্বা৷ মোটা ঘুষ দিয়ে বড় বড় ডাক্তার, পদস্থ পুলিশ অফিসার এবং রাজনীতিকদের তারা বশে রাখত৷ সংবাদ মাধ্যমে এ নিয়ে দীর্ঘ লড়াই চালানোর সুবাদেই অবশেষে ক্ষমতাসীনদের টনক নড়ে এবং সেইমতো ব্যবস্থা নেওয়া হয়৷তামিলনাড়ু এবং অন্ধ্রপ্রদেশ থেকে তাড়া খেয়ে কিডনি পাচারকারীদের অনেকেই ছড়িয়ে পড়ে অন্যান্য রাজ্যে৷ সে রকমই একটি চক্রের সন্ধান মিলল দিল্লিতে এবং তার সুতো এসে পৌঁছাল কলকাতায়৷

দুঃখের বিষয়, পশ্চিমবঙ্গের মতো বিপুল এবং নানা ভাষাভাষীর রাজ্যে পুলিশ-প্রশাসনের কিন্তু এ ব্যাপারে অনেক আগেই হুঁশিয়ার হওয়া উচিত ছিল৷তার কারণ, গত সাত-আট বছর ধরে এ রাজ্যের বহু সংবাদপত্রে কিডনি চেয়ে বিজ্ঞাপন এবং আবেদনের সংখ্যা হঠাৎ করেই বেড়ে গিয়েছে৷ এ ধরনের অনেক আরজি হয়তো যথার্থ, কিন্তু সবই যে সাচ্চা সে কথা গ্যারান্টি দিয়ে কে বলতে পারে? দিল্লি পুলিশ যদি ওই চক্রকে না ধরত, তাহলে হয়তো এ রাজ্যের পুলিশও নড়ে বসত না৷

মুশকিল হল, এই ধরনের ব্যাপার জানাজানি হওয়ার পর হয়তো বা একটু তোড়ফোড় হবে৷ কিছু কিছু ধরপাকড়ও চলবে৷ কিন্তু প্রকৃত সত্য আদৌ উদ্ঘাটিত হবে কি না, সন্দেহ৷ এই ধরনের কারবার যারা চালায় তাদের সঙ্গে বিভিন্ন বেসরকারি চিকিৎসালয়, বেসরকারি প্যাথলজিক্যাল ল্যাব, সর্বোপরি চিকিৎসকদের যোগাযোগ না থাকলে, দিনের পর দিন এ জিনিস চালিয়ে যাওয়া কোনওক্রমেই সম্ভব নয়৷ এখন যেসব চিকিৎসক নামধারী ব্যক্তি মোটা টাকার লোভে এইসব চক্রের সঙ্গে যোগসাজশ রাখেন এবং অপারেশন করে কিডনি বের করে আনেন, তাঁদের ব্যাপারে কি কোনও ব্যবস্থা নেওয়া হবে? যাঁরা প্রকৃত সৎ চিকিৎসক, তাঁরা কি এ নিয়ে তদন্তে পুলিশকে সহায়তা করবেন? না কি স্বার্থান্বেষী রাজনীতির থাবা তাঁদেরও মুখ চেপে ধরবে?

যদি প্রশাসন ও চিকিৎসা জগতের একটি প্রভাবশালী মহলের মদত এবং পৃষ্ঠপোষকতা না থাকে, তাহলে এই ধরনের নষ্টামির কারবার ফেঁদে বসা কারও পক্ষেই কখনও সম্ভবপর হয় না৷ এখন সেই তাঁদেরই অনেকে যদি সব কিছু জেনেও ন্যাকা সাজেন, তাহলে আগামী দিনে আরও বহু মানুষকে এই ধরনের অপরাধীদের শিকার হতে হবে৷

আবারও বলতে হচ্ছে, অপারেশন করে কারও শরীর থেকে কিডনি বের করে আনা এবং সেটিকে প্রতিস্থাপনের উপযোগী অবস্থায় পাচার করা– এই গোটা ব্যাপারটা কোনও নভিসের পক্ষে আদৌ সম্ভব নয়৷ একমাত্র অভিজ্ঞ শল্যচিকিৎসকদের পক্ষেই সেটা করা সম্ভব৷ প্রশ্ন হল, শুধুমাত্র কিছু চিকিৎসকের সহায়ককে পাকড়াও করলেই কি এই ধরনের ক্রাইমের উৎসে পৌঁছানো যাবে? সাম্প্রতিক কিডনি পাচার কাণ্ডের তদন্তে এখনও পর্যন্ত যা প্রকাশ পেয়েছে তাতে এই অপরাধ চক্রের পাণ্ডা শুধু দেশের মধ্যে নয়, অন্যান্য দেশেও কিডনি পাচার করত৷ নেপালে, শ্রীলঙ্কায়, ইন্দোনেশিয়ায়৷ কেন্দ্র-রাজ্য প্রশাসন এবং চিকিৎসা জগতের সেইসব চ্যানেল এবং ঘাঁতঘোঁত যদি কারও জানা না থেকে থাকে, তাহলে সে কি কোনও প্রকারেই এই ধরনের ব়্যাকেট কখনও চালাতে পারে?

সুতরাং, এক অর্থে এই চক্রের হদিশ কেন্দ্র তথা রাজ্যস্তরের কর্তাব্যক্তিদের সামনে একটা বড় সিদ্ধান্ত নেওয়ার জায়গা তৈরি করে দিয়েছে৷ দেশের লক্ষ-কোটি নাগরিকদের জীবন ও নিরাপত্তার খাতিরে তাঁরা যদি সৎ সাহস দেখাতে পারেন, তাহলে পুলিশি তদন্তে হয়তো এমন আরও অনেক কিছুই বেরিয়ে আসবে যা অভাবনীয়-অচিন্তনীয় না-হলেও, অবাঞ্ছনীয় এবং অনভিপ্রেত তো বটেই৷

লাল-নীল-গেরুয়া...! 'রঙ' ছাড়া সংবাদ খুঁজে পাওয়া কঠিন। কোন খবরটা 'খাচ্ছে'? সেটাই কি শেষ কথা? নাকি আসল সত্যিটার নাম 'সংবাদ'! 'ব্রেকিং' আর প্রাইম টাইমের পিছনে দৌড়তে গিয়ে দেওয়ালে পিঠ ঠেকেছে সত্যিকারের সাংবাদিকতার। অর্থ আর চোখ রাঙানিতে হাত বাঁধা সাংবাদিকদের। কিন্তু, গণতন্ত্রের চতুর্থ স্তম্ভে 'রঙ' লাগানোয় বিশ্বাসী নই আমরা। আর মৃত্যুশয্যা থেকে ফিরিয়ে আনতে পারেন আপনারাই। সোশ্যালের ওয়াল জুড়ে বিনামূল্যে পাওয়া খবরে 'ফেক' তকমা জুড়ে যাচ্ছে না তো? আসলে পৃথিবীতে কোনও কিছুই 'ফ্রি' নয়। তাই, আপনার দেওয়া একটি টাকাও অক্সিজেন জোগাতে পারে। স্বতন্ত্র সাংবাদিকতার স্বার্থে আপনার স্বল্প অনুদানও মূল্যবান। পাশে থাকুন।.