সৌপ্তিক বন্দ্যোপাধ্যায় : বিপ্লবের রক্ত তখন রন্ধ্রে রন্ধ্রে। বর্তমান, ভবিষ্যৎ এসব নিয়ে চিন্তিত নয় যুবক। লক্ষ্য শুধু একটাই, দেশের স্বাধীনতা। হয় দেশ স্বাধীন হবে নয়তো বা প্রাণ যাবে স্বাধীনতার আন্দোলনে। এমনই ছিলেন আঠেরোর যুবক। বিপ্লবের তাজা রক্তও মজেছিল প্রেমে। করতে চেয়েছিলেন বিয়ে। বন্ধুদের সে কথা জানিয়েওছিলেন। বীর বিপ্লবীর জন্মদিনে একটু অন্য গল্পের সন্ধান…

গল্পটা কেমন ? ক্ষুদিরাম বসুর বন্ধুরা হঠাৎ একদিন দেখেন, ক্ষুদিরাম দোকান থেকে জুতো কিনছেন। তারা তো রীতিমত অবাক। কারণ তারা জানত ক্ষুদিরাম বেশ কিছুদিন আগে থেকে জুতো পরা ছেড়ে দিয়েছে। বিদেশিদের হাতে তৈরি জিনিস তিনি পড়বেন না। রন্ধ্রে রন্ধ্রে স্বরাজ। অবাক বন্ধুরা ক্ষুদিরামকে প্রশ্ন করেছিল – ‘জুতো কি হবে রে?’ ক্ষুদিরাম হেসে উত্তর দিয়েছিলেন – ‘বিয়ে করতে যাচ্ছি, বিয়েতে নতুন জুতো পরতে হবে তো?’ তাঁর উত্তর শুনে বন্ধুরা আবার কিছুটা অবাক হ’ল। কারণ ক্ষুদিরাম বলতেন, তিনি কখনও বিয়ে করবেন না। বন্ধুদেরও সংসার না করে দেশের কাজ করার কথা বলতেন।

কিন্তু ক্ষুদিরামের সহজ সরল কথাবার্তা বন্ধুরা অবিশ্বাস করতে পারল না। তাই ক্ষুদিরামকে তারা জিজ্ঞাসা করল – ‘কোথায় যাচ্ছিস বিয়ে করতে?’ বন্ধুরা জিজ্ঞাসা করেছিল ‘বিয়ে করে ফিরবি কবে?’ ক্ষুদিরাম হেসে বলেছিলেন, ‘কি জানি ফিরব কিনা, শুনছি আমায় ঘরজামাই রাখবে।’ ‘একবার বিদায় দে মা ঘুরে আসি’ গানের লাইনের সঙ্গে ক্ষুদিরামের জুতো কেনার গল্পের মিল পাচ্ছেন কি ? না পেলে স্পষ্ট করে দেওয়া যাক। আসলে ক্ষুদিরাম দেশপ্রেমে মগ্ন ছিলেন, তাঁকেই বিবাহ করার কথা মজার ছলে বলেছিলেন। সেই বিবাহের বন্ধন ছেড়ে তাঁর আর ফিরে আসা সম্ভব নয় সেটাও তিনি বলে দিয়েছিলেন। এই ঘটনার পরেই ঘটে কিংসফোর্ড হত্যার চেষ্টা।

১৯০৮ সালের ৩০ এপ্রিল, রাত ৮টায় এল সেই সুযোগ। ক্লাব হাউজ থেকে সাহেবের বাড়ি পর্যন্ত যে পথ, সেই পথের মাঝখানে ঝোপ-ঝাড়ে ঢাকা একটি জায়গায় ওত পেতে ছিলেন ক্ষুদিরাম ও তাঁর সঙ্গীরা। সন্ধ্যার পর সাদা ফিটন গাড়িটি তাঁদের কাছে পৌঁছানো মাত্র গাড়িটি লক্ষ্য করে বোমা নিক্ষেপ করলেন। প্রচণ্ড শব্দে বোমাটি ফাটে গাড়ির উপর। হামলার নায়ক ক্ষুদিরাম আর প্রফুল্ল চাকী কাজ শেষ করে ছুটতে থাকেন। কিন্তু তখনও তাঁরা জানতেন না ভুলবশত বোমা গিয়ে যে গাড়িতে পড়েছে সেই ফিটন গাড়িতে কিংসফোর্ড ছিলেন না। ছিলেন দু’জন বিদেশিনী। নিহত হন মিসেস কেনেডি আর তার কন্যা সহ চাকর।

ধরা পড়ার পর বোমা হামলার সমস্ত দায় নিজের উপরে নিয়ে নেন ক্ষুদিরাম। অন্য কোন সহযোগীর নাম বা কোন গোপন তথ্য শত অত্যাচারেও প্রকাশ করেননি। মজফফরপুর আদালতে ক্ষুদিরামের বিচার কাজ শুরু হয় ০৮ জুন ১৯০৮। কিন্তু সারা পশ্চিমবাংলা থেকে কোন আইনজীবী মামলায় আসামী পক্ষের হয়ে কোন আইনজীবী আদালতে দাঁড়াতে সাহস পাননি। তখন পূর্ববঙ্গ থেকে রংপুর বারের উকিল সতীশ চন্দ্র চক্রবর্তী, কুলকমল সেন ও নগেন্দ্রনাথ লাহিড়ী ক্ষুদিরামের পক্ষে মামলায় পরিচালনায় এগিয়ে আসেন।

বিচারকের অনুরোধে কালিদাস বসু নামে স্থানীয় এক আইনজীবীও এগিয়ে আসেন আসামী পক্ষে। ৬ দিন চলে বিচার। বিচারের শুরুতেই ক্ষুদিরাম স্বীকারোক্তি প্রদান করেন। কিন্তু বিচারক কর্নডফ এই স্বীকারোক্তিকে এড়িয়ে আদালতের প্রচলিত নিয়মেই বিচার করা হবে বলে দেন। রংপুর থেকে যাওয়া তিন আইনজীবী সতীশ চন্দ্র চক্রবর্তী, কুলকমল সেন ও নগেন্দ্রনাথ লাহিড়ী দুই দিন সরকারী সাক্ষীদের জেরা করলেন। কিন্তু ক্ষুদিরাম তখন প্রাণের মায়া ত্যাগ করে নিজেকে দেশমাতৃকার হাতে সমর্পণ করেছিলেন। ১৯০৮ সালের ১১ আগষ্ট হাসতে হাসতে ফাঁসির মঞ্চে জীবন উৎসর্গ করেন ব্রিটিশ বিরোধী সশস্ত্র আন্দোলনের শহীদ ক্ষুদিরাম বসু।