সৌপ্তিক বন্দ্যোপাধ্যায় : দ্বিতীয় হুগলী সেতুর পাশ দিয়ে গিয়ে একটা হালকা বাঁক। সেখানেই একসঙ্গে বসবাস হিন্দুদের আরাধ্য দেবতা শিব ও মুসলিমদের খোয়াজা খিজির পীরের। দুই ধর্মের সহাবস্থানে গড়ে উঠেছে কলকাতার আমদানি রফতানি ব্যবসার কেন্দ্র খিদিরপুর। কিন্তু কেন এই অঞ্চলের নাম হল খিদিরপুরভ ? সেই ইতিহাস ঘাঁটতে গেলেই জানা যাচ্ছে দুই ধর্মাবলম্বী মানুষের বছরের পর বছর ধরে একসঙ্গে বসবাস করার ইতিহাস।

খিদিরপুর ব্রিটিশ ভারত এর সূচনা কাল থেকেই গুরুত্ব পেয়ে আসচ্ছে। ব্রিটিশরা এখানে একটি আধুনিক সমুদ্র বন্দর গড়ে তোলে। এর পর এলাকাটির দ্রুত উন্নয়ন ঘটে ও কর্ম ব্যবস্থ হয়ে ওঠে। এখনও এই বন্দরটি চালু রয়েছে কলকাতা বন্দর নামে। এই অঞ্চলে কাজের খোজে ভারতীয় উপমহাদেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে বহু মানুষ চলে আসে। ফলে এই অঞ্চলটিতে অবাঙালিরা সংখ্যাগরিষ্ঠ। এখানে হিন্দি ভাষা বহুলপ্রচলিত। খিদিরপুরে কলকাতা বন্দর এর দুটি ডক অবস্থিত। এই ডক দুটি হল খিদিরপুর ডক ও নেতাজি সুভাষ ডক। নামকরণের ইতিহাস কেমন ?

জানা যাচ্ছে , খিদিরপুর নামটির উৎসের সঙ্গে শিবপুর বোটানিকাল গার্ডেন এর সম্পর্ক রয়েছে বলে মনে করা হয়। শিবপুর বোটানিকাল গার্ডেনের প্রতিষ্ঠাতা হলেন রবার্ট কিড। তাঁর পুত্র জেমস কিড ১৮০৭ সালে এই অঞ্চলে একটি ডক প্রতিষ্ঠা করেন। মূলত ভূকৈলাস রাজবংশের জমিতেই তৈরি হয় এই ডক। জেমস কিড-এর নামানুসারে জায়গাটির নাকি নামকরণ হয় ‘কিডারপুর’।

অন্য একটি মতে, মুসলমানদের বিশ্বাস অনুযায়ী জলসাম্রাজ্য তথা দরিয়ার পিরের নাম খাজা খিজির। ফারসিতে যা ‘খিজির’ উচ্চারণ, আরবিতে তা ‘খিদ্‌র’। এই খাজা খিজির বা ‘খাজা খিদ্‌র’-এর নাম থেকেই নাকি এসেছে খিজিরপুর তথা খিদিরপুর। আবার আরবি ভাষা থেকে আসা ‘খিদির’ মানে সবুজ। গঙ্গা তীরবর্তী ওই অঞ্চলের সবুজ বনানী ও তৃণক্ষেত্র দেখে জায়গাটির নাম হয়েছে ‘খিদিরপুর’ এটি মোটেই কষ্টকল্পনা নয়, কেননা খিদিরপুরের পাশেই রয়েছে গার্ডেনরিচ। সবুজ গাছপালায় সমৃদ্ধ বাগানবাড়ির জন্য এই গার্ডেনরিচ একসময় ইংরেজ রাজপুরুষদের খুব প্রিয় জায়গা ছিল। তাই ‘খিদিরপুর’-এর আসল অর্থ হয়তো সবুজ বনানী ও তৃণক্ষেত্র সমৃদ্ধ নগর। আবার খয়েরের শুদ্ধ নাম হল ‘খদির’। খয়েরের ব্যবসা ছিল বলে হয়তো জায়গাটির নাম হয়েছে ‘খদিরপুর’।

খিদিরপুরের ব্যুৎপত্তিতে আর একটি বিষয় আছে।আরবি ভাষায় যা ‘খিঞ্জির’, বাংলায় তাকে বলে শুয়োর। গবেষক সুকুমার সেন লিখেছেন – ‘খিঞ্জিরপুর’ থেকেই নাকি এসেছে ‘খিদিরপুর’। অর্থাৎ একসময় গঙ্গা তীরবর্তী এই জায়গাটিতে শুয়োরের প্রাধান্য ছিল। ডক সংলগ্ন এলাকায় শুয়োরের প্রাচুর্য থাকা অসম্ভব কিছু নয়।