প্রসেনজিৎ চৌধুরী, বর্ধমান: বিকেল গড়াতেই বহু প্রতীক্ষিত সেই সংবাদ- খাগড়াগড় বিস্ফোরণ কাণ্ডের সাজা ঘোষণা হয়েছে। ধৃত জেএমবি জঙ্গিদের কারাদণ্ড। কলকাতা থেকে খবর ছড়িয়ে পড়েছে দেশজুড়ে মায় প্রতিবেশী বাংলাদেশেও। পাঁচ বছর পার হয়েছে সেই সাড়া জাগানো বিস্ফোরণ মামলার। খাগড়াগড় বিস্ফোরণ কাণ্ডে ১৯ জনের মধ্যে ৬ জনের সর্বোচ্চ ১০ বছরের কারাদণ্ড। দুই মহিলা ও একজনের ৬ বছরের কারাদণ্ড।

বাকিদের ৮ বছরের কারাবাস। প্রত্যেকের ২০ হাজার টাকা করে জরিমানার নির্দেশ দিয়েছেন বিচারক। রায় ঘোষণার দিন সকাল থেকেই নিরুত্তাপ বর্ধমান শহর। আর রায়ের পরেও সেই একই উত্তাপহীন পরিবেশ। শহরের সব থেকে গুরুত্বপূর্ণ মোড় কার্জন গেট এলাকা। সবাই ব্যস্ত ঘর ফেরতা কেনাকাটি বা আসন্ন শারদোৎসবের শপিংয়ে ।

খাগড়াগড় বিস্ফোরণ কাণ্ডের রায় বের হল জানেন ?
চটজলদি উত্তর আসে- ওহঃ রায়টা বের হল তাহলে !

এর পরেই নিজের মতো ব্যস্ত হয়ে যান উত্তরদাতা। মোটের উপর সবারই এক প্রতিক্রিয়া। রায় নিয়ে নিরুত্তাপ বর্ধমানবাসী। মায় খাগড়াগড় এলাকাও। সেখানে তবু চাপা আলোচনা। কিন্তু বাকি শহরের সর্বত্র উদাসীনতা।

সেই আন্তর্জাতিক নাশকতার ছক তৈরির কেন্দ্র বর্ধমান। ২০১৪ সালের ২ অক্টোবর দুর্গা পূজার সময় বিস্ফোরণ হয়েছিল শহরের উপকণ্ঠে খাগড়াগড় এলাকার একটি বাড়িতে। এরই মধ্যে ভৌগোলিক পার্থক্য হয়েছে, তখনকার যুক্ত বর্ধমান জেলা এখন পূর্ব ও পশ্চিম বর্ধমানে বিভক্ত। খাগড়াগড় পড়েছে পূর্ব বর্ধমানে তদন্তে উঠে আসে, বাংলাদেশে অস্থিরতা তৈরি ও সেখানকার প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে খুনের ষড়যন্ত্রে লিপ্ত জামাতুল মুজাহিদীন (জেএমবি) সংগঠনের কথা।

পাঁচ বছর আগের মুহূর্তগুলো প্রবল আতঙ্কের। খাগড়াগড়ের বিস্ফোরণস্থল থেকে শহরের ইতি উতি চলছিল গোয়েন্দাদের আনাগোনা, পুলিশি অভিযান, অস্ত্র বিস্ফোরক উদ্ধার, দামোদর নদের পাড়ে বালিতে বিস্ফোরণ নিষ্ক্রিয় করা নিয়ে তীব্র চাপান উতোর। রাজ্যের গণ্ডি ছাড়িয়ে দেশজুড়ে তখন বর্ধমান বিস্ফোরণ (খাগড়াগড় বিস্ফোরণ) তখন প্রবল আলোচিত বিষয়।

সীমান্ত ছাড়িয়ে সেই রেষ ছড়িয়ে পড়েছিল বাংলাদেশে। সূত্রে পর সূত্রের জাল ছিঁড়ে বাংলাদেশ থেকে ছড়িয়ে পড়া জঙ্গি কার্যকলাপের বিস্তার নিয়ে চলছিল আলোচনা। আপাত নিরুপদ্রব বর্ধমানবাসীর কাছে তথা রাজ্যবাসীর কাছে সেই প্রথম বিরাট আকারে জেএমবি জঙ্গি সংগঠনের পরিচয়।

বর্ধমানে ঘন ঘন গোয়েন্দা বিভাগের কর্তাদের আসা যাওয়া, জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত দোভালের আগমন ঘিরে তীব্র উত্তেজনাপূর্ণ সময় তখন। অন্যদিকে প্রতিবেশী বাংলাদেশে সরকারের দেওয়া তথ্যে উঠে এসেছিল জেএমবি শীর্ষ জঙ্গি নেতাদের বিষয়। পশ্চিমবাংলা, অসম, বিহার জুড়ে ছড়িয়ে পড়া এই জঙ্গি চক্রের জাল ধীরে ধীরে গুটিয়ে এনেছে জাতীয় তদন্তকারী সংস্থা (এনআইএ)। সর্বশেষ খাগড়াগড় বিস্ফোরণ কাণ্ডের অন্যতম চাঁই তথা জেএমবি জঙ্গি ইজাজকে বীরভূম থেকে গ্রেফতার করা হয়েছে।

২০১৪ সালের পর থেকে সন্ত্রাসবাদ সংক্রান্ত বহু চর্চিত বিষয়টি হল ভারতের জমিকে ভিত্তি করে বাংলাদেশে নাশকতা চালানোর প্রক্রিয়া। খাগড়াগড় বিস্ফোরণের পর ২০১৬ সালে ভয়াবহ নাশকতা মুখে পড়ে বাংলাদেশ।
ঢাকার অভিজাত এলাকা গুলশনের হোলি আর্টিজান ক্যাফেতে ঢুকে গুলি করে ও কুপিয়ে ২০ জনকে খুন করা হয়। সেনা-কমান্ডো অভিযানে সেই জঙ্গিদের নিকেশ করে বাংলাদেশ সরকার। হামলা দায় নেয় ইসলামিক স্টেট ও তাদের সহযোগী নব্য জেএমবি সংগঠন।

খাগড়াগড় বিস্ফোরণের ঘটনায় জেএমবি সংগঠনের পুরনো অংশটি জড়িত। বাংলাদেশে একাধিক প্রধান নেতাকে গ্রেফতারের পর ভারত থেকে নাশকতার পথ বেছে নিয়েছে জেএমবি। তৈরি হয়েছে জেএম-আই। আর নব্য জেএমবি বাংলাদেশেই ঘটিয়েছে একের পর এক হামলা। তাদেরও বহু নেতা নিকেশ হয়েছে বা গ্রেফতার। নতুন করে পুরনো জেএমবি সক্রিয়। সেই রিপোর্ট প্রকাশ হয়েছে আগেই।

এমনই পরিস্থিতিতে সেই খাগড়গড় বিস্ফোরণের ঘটনা দোষী সাব্যস্ত জঙ্গিদের সাজা ঘিরে কলকাতার ব্যাংকশাল আদালত চত্বর ছিল নিরাপত্তার বেড়াজালে ঘেরা। কিন্তু শহর বর্ধমান, দিনভর চলেছে নিজের খেয়ালে। রাস্তায় ভিড়। দোকানে দোকানে কেনাকাটি, অফিস যাত্রী সব মিলে রোজকার চেনা ছবি। আর খোদ খাগড়াগড়ের পরিস্থিতি, বেশিরভাগই প্রশ্ন এড়িয়ে গিয়েছেন। কেউ কেউ জানিয়েছেন, না দাদা, কিছু বলতে পরব না। আমরা কিছু জানি না। তবে দোষীরা শাস্তি পেলেই ভালো। পাঁচ বছর আগে ও পরে তফাৎটা বেশ স্পষ্ট।