প্রতীকী ছবি

সৌমেন শীল, কলকাতা: তিন তালাকের বিরুদ্ধে কেন্দ্রের অবস্থানকে স্বাগত জানাল প্রগতিশীল মুসলিম সমাজ। একই সঙ্গে লোকসভায় তিন তালাক বিল পাশ হওয়ার বিষয়টিকেও স্বাগত জানানো হয়েছে।

বৃহস্পতিবার লোকসভায় পাশ হয়েছে তিন তালাক বিরোধী বিল। যা নিয়ে চর্চা শুরু হয়েছে রাজনৈতিক মহলে। বিরোধী শিবিরের অনেক রাজনৈতিক দল মোদীর সরকারের এই বিলের বিরোধিতা করেছে। কংগ্রেস সহ একাধিক দল ওয়াক আউট করেছে। বাম-তৃণমূল সহ অনেক দল আবার সংসদে বিতর্কে অংশ নিয়েছে।

সব মিলিয়ে তিন তালাক বিল নিয়ে বৃহস্পতিবার উত্তপ্ত ছিল লোকসভা। যদিও শেষ হাসি হেসেছে সরকার। এই বিষয়টিকে নিজেদের সাফল্য বলেই মনে করছে প্রগতিশীল মুসলিম সমাজ। এমনই জানিয়েছেন ওই সংগঠনের পশ্চিমবঙ্গ শাখার সভাপতি কাজি মাসুম আখতার। তিনি বলেছেন, “অনেক দিন ধরে আমরা তিন তালাকের বিরুদ্ধে আন্দোলন করছি। অনেক প্রতিকূলতার সম্মুখীন হতে হয়েছে আমাদের। অবশেষে লোকসভায় বিল পাশ হল। এটাকে সাফল্য বলেই মনে করছি।”

বিজেপি বিরোধী এবং সর্বোপরি মুসলিম সমাজের প্রকৃত বন্ধু বলে দাবি করা আসাদুদ্দিন ওয়াইসি এই বিলের তীব্র বিরধিতা করেছেন। সংসদে হাজির থেকে এআইএমআইএম কড়া ভাষায় আক্রমণ করেছে কেন্দ্রকে। তাঁর অভিযোগ, “তিন তালাক মুসলিমদের ধর্মীয় আবেগের সঙ্গে জড়িত। দেশের কোনও মুসলিম মহিলা এর বিরোধী নয়। মোদী সরকার উদ্দেশ্যপ্রনোদিতভাবে ধর্মীয় ভাবাবেগে আঘাত করার জন্যেই এই বিল নিয়ে এসেছেন।”

এই বিষয়েও মুখ খুলেছেন প্রগতিশীল মুসলিম সমাজের সভাপতি কাজি মাসুম আখতার। তাঁর কথায়, “তিন তালাক কোনও ধর্মীয় আচার নয়। ইসলামকে বিকৃত করে পুরুষশাসিত সমাজ তালাকের অপব্যবহার করছে। তাৎক্ষণিক তিন তালাক মারাত্মক অপরাধ এবং এতে ইসলামের অসম্মান হয়।” কিন্তু আসাদুদ্দিন ওয়াইসি তো বলছেন অন্য কথা? এই প্রসঙ্গে কাজি মাসুম আখতার বলেছেন, “তাৎক্ষণিক তিন তালাক বিরোধী বিল দরকার ছিল। এটা খুব ভালো কাজ হয়েছে। কে করছে সেটা বড় কথা নয়। কী করেছে সেটাই বড়। বিদ্যাসাগর এবং রামমোহন রায়ের সমাজ সংস্কারেও ইংরেজরা সাহায্য করেছিল।”

তিন তালাক বন্ধের দাবিতে গত বছরে দিল্লিতে ধর্নাও দিয়েছিল প্রগতিশীল মুসলিম সমাজ। মুসলিম মহিলাদের বৈবাহিক অধিকার এবং তাঁদের সুরক্ষার জন্য একগুচ্ছ প্রস্তাব খসড়া আকারে সংসদে পেশ করতে চলেছে প্রগতিশীল মুসলিম সমাজ। তাঁদের দাবি ছিল, কোনও স্বামী নিজের স্ত্রীকে তিন তালাক দিলে সেই ব্যক্তির বিরুদ্ধে জামিন অযোগ্য ধারায় মামলা রুজু করতে হবে। দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য এই সকল মামলার বিচার যাতে ফার্স্ট ট্র্যাক কোর্টে হয় তার ব্যবস্থা করতে হবে। আইনে পরিষ্কার করে উল্লেখ করতে হবে যে তাৎক্ষনিক তালাক সম্পূর্ণভাবে অবৈধ। এবং এই বিষয়ে সমাজের সর্বস্তরে সচেতনতা গড়ে তুলতে হবে।

তালাক পরবর্তী সময়ে মহিলাদের কথা মাথা রেখেও ইতিমধ্যেই নানাবিধ পরিকল্পনা প্রস্তাব করেছে প্রগতিশীল মুসলিম সমাজ। এই বিষয়ে সংগঠনের সভাপতি কাজি মাসুম আখতার বলেছেন, “একজন মহিলাকে তালাক দিয়ে দেওয়ার পর তাঁর উপরে দিয়ে একটা ঝড় বয়ে যায়। প্রবল প্রতিকূল অবস্থার মুখোমুখি হতে হয় তাদের। তালাকপ্রাপ্ত মহিলাদের উপযুক্ত ক্ষতিপূরণের ব্যবস্থা করার দাবি করছি আমরা।” স্বামী তালাক দিলে স্ত্রী এবং সকল সন্তানদের জন্য খোরপোষ বাধ্যতামূলক করতে হবে। প্রয়োজনে স্বামীর সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করে হলেও দিতে হবে খোরপোষ।

এই খোরপোষ ব্যবস্থার মধ্যেও রয়েছে জটিলতা। সেই দিকগুলিও খতিয়ে দেখেছে প্রগতিশীল মুসলিম সমাজ। সভাপতি কাজি মাসুম আখতারের কথায়, “অনেক ক্ষেত্রে স্বামী খোরপোষ দিতে অসমর্থ হতে পারে। একইসঙ্গে তার আহামরি সম্পত্তি নাও থাকতে পারে। সেক্ষেত্রে স্বামী পরিত্যক্তা ওই মহিলা যাতে সরকারের তহবিল থেকে ক্ষতিপূরণ পায়, সেই ব্যবস্থা করতে হবে।” এটিকেই ‘তালাক ভাতা’ বলে অভিহীত করেছে প্রগতিশীল মুসলিম সমাজ। বিধবা ভাতা বা বার্ধক্য ভাতা-র মতোই মুসলিম সমাজের মহিলাদের জন্য ‘তালাক ভাতা’ খুবই প্রয়োজন বলেও জানিয়েছেন কাজি মাসুম আখতার।