কাজি মাসুম আখতার: পশ্চিমবঙ্গে একই সময়ের মোদী ও মমতার সভায় গণতন্ত্রের হুল্লোড় দেখে এদেশের গণতন্ত্রকে বুঝতে নীচের কথাগুলি না বলে পারলাম না। কথাগুলি সত্যিই কি খুবই অযৌক্তিক? বর্তমান রাজনীতিতে ‘সততা’ ও ‘আদর্শ’ শব্দ দুটি অনেকটা যেন’ সোনার পাথরবাটি’র মতো।

রাজনীতিকদের দেশপ্রেমও তাই, অসচেতন বা সচেতন ধান্দাবাজ জনগণের গণতন্ত্রও তাই। হ্যাঁ,গণতন্ত্র আম জনগণের-যারা বিরোধী নেতাদের চুরি চিটিংবাজি বা মিথ্যাচারের বিরুদ্ধে সর্বদাই সরব হন।

কাজি মাসুম আখতার

অথচ তারাই অফিসে-দফতরে, কলে-কারখানায় বা অন্যের জমিতে ক্ষেত মজুরের কাজে ফাঁকিতে বা দেশকে কর ফাঁকিতে বা সুযোগ পেলেই ঘুষ খেতে বা দিতে পারলে বা ট্রেনে বিনা টিকিটে যাত্রী হয়ে ধরা না পড়লে নিজেকে চালাক ও যোগ্য ভেবে গর্ববোধ করে, তারপর শ্লোগান তোলে—মেরা ভারত মহান,সন্ত্রাসবাদী পাকিস্তান নিপাত যাক।

জনগণের এই গণতন্ত্র আসলে অন্ধের হস্তী দর্শনের মতো নয় কি ?যাদের না আছে গণতন্ত্রের সম্যক ধারনা,না আছে গণতান্ত্রিক শিক্ষা, চেতনা, দায়, দায়িত্ব বা মূল্যবোধ! প্রতিটি ভোটের প্রাক-মুহূর্তে এমত জনগণের ভোটের কাঙাল থাকে দেশের বৃহত্তম গণতন্ত্রের ভোট ভিক্ষুকরা! যারা ভোটে জিতে আনন্দের ঢেঁকুর তুলে গর্বের সঙ্গে জনগণের ভোটে জয়ের আত্ম-গরিমা প্রকাশ করে ।ক্ষমতায়নের মধুভান্ডে ছোবল মারার আনন্দে আত্মহারাদের কাছে তাই ভোট গণতন্ত্রের বৃহৎ উৎসব।জনগণের সংবিধান প্রদত্ত ভোটাধিকারই এদের হাতিয়ার। জনগণ যার শিকার মাত্র।গণতন্ত্র যেখানে কেবলই একটি গালভরা শব্দ।

তাই এহেন জনগণের নেতারাই আজ সিপিআইএমে,হার্মাদ ,গুণ্ডা বা লুটেরার ভূমিকায়—আবার কালই তারা তৃণমূলের সম্পদ, পরশু হাওয়ার দিক নির্দেশ মেনে সেই হার্মাদ বা চোরা চালানকারী বা সারদা নারদার লুটেরাই হয়তো বিজেপিতে স্থান নেবে!! তারপর হয়তো কংগ্রেস বা অন্য কোথাও! তারপর তারা মানুষ(গণতন্ত্র!) এর ভোটে বিপুলভাবে জিতবে। সকলে বলবে, যো জিতা ওহি সিকন্দর!!

দীর্ঘদিন অদ্ভুত কোন আদর্শের বা সততার বুলি এরা আওড়াবে।জনগণের অনেকে তা বিশ্বাসও করবে।তারপর হাওয়া বা সুযোগ বুঝে হঠাৎ লম্ফ দিয়ে বা পালটি খেয়ে অন্য কোন এক সম্পূর্ণ বিপরীত আদর্শের দলে নাম লেখাবে। এদেশের রাজনীতিতে এরাই আসলে সংখ্যাগুরু।এমন বিশ্বাস ঘাতককেও জনগণ বিশ্বাস করে ভোট দেবে। গণতন্ত্রের কি অপূর্ব মহিমা! রিগিং বা ক্ষমতাবান কর্তৃক ভোটদাতাদের ভয়-ভীতি প্রদানও এদেশের গণতন্ত্রের অনিবার্য অঙ্গ। তাইতো এই ধারা এদেশে অপ্রতিরোধ্য।

পালটিবাজরা এতদিন যে দলকে আলোকিত করে ছিল ,দল বদলের সঙ্গে সঙ্গেই সেই পুরানো দলের কাছে এরা হয়ে উঠবে আবর্জনা বা বস্তার পচা আলুর মতো— যারা নাকি অন্য ভালো আলুর পচনের কারণ ছিল!!! সংখ্যাগুরু প্রভাবশালী এই সকল তথাকথিত পচা-আবর্জনার আড়ালে তলানিতে থেকে যায় মাত্র দু-তিন শতাংশ প্রকৃত দেশপ্রেমী, মানব প্রেমী, সৎ ও প্রতিবাদীরা,যারা একই সঙ্গে ক্ষমতাশালীদের হাতে সর্বদাই অত্যাচারিত ও উপেক্ষিত কিছু মানুষ। এদের কেউ কেউ কখনও-সখনও ভুলক্রমে নেতাও হন— তারা নেতা হয়ে হয় নিজেকে আদর্শচ্যুত করেন নতুবা দ্রুত পদচ্যুত বা বিতাড়িত হন। লোকে এদের আসলে বোকা বলে!!!!

তাইতো ঐতিহ্য মেনে এবারের লোকসভা নির্বাচনেও প্রার্থী তালিকাতে দেশজুড়ে এত চোর, ডাকাত, মাস্তান, বিচারাধীন খুনের বা ধর্ষণের আসামী বা দাঙ্গাবাজদের এত রমরমা!!!! অথবা নিজের বা অন্য ধর্ম ও জাত-পাত নিয়ে ভন্ডামীদের এত সাফল্য!!! কারণ এরাই যে দেশের গণতন্ত্রের প্রহরী !! এদেশের রাজনীতির নাট্য যজ্ঞে দেশপ্রেম বা মানবতা তাই এত বেমানান!! তাই মনে প্রশ্ন জাগে—এদেশের ভোটের গণতন্ত্র যাত্রা কি আসলে গণতন্ত্রের শ্মশান যাত্রা নয়?

লেখক কাজি মাসুম আখতার বিশিষ্ট সমাজসেবী এবং দেশের জাতীয় সংগীতের জন্য রক্ত বলিদানকারী। পশ্চিমবঙ্গ সরকার কর্তৃক শিক্ষারত্ন সম্মানে ভূষিত।

মতামত লেখকের সম্পূর্ণ ব্যক্তিগত।