ভারতের সংবিধানের ধারা ৩৫(ক) এবং ৩৭০ নিয়ে দীর্ঘ বিতর্ক রয়েছে। দেশের জাতীয়তাবাদীদের তরফে সংবিধানের এই দুটি অংশকে সংশোধন করার দাবী দীর্ঘদিনের, এই দাবিই সম্প্রতি গতি পেয়েছে বিজেপির নির্বাচনী ইস্তেহার প্রকাশের পর। বিজেপির সংকল্পপত্রের চোদ্দ নম্বর পৃষ্ঠায় বলা হয়েছে আগামী লোকসভায় ক্ষমতায় ফিরলে তারা বিতর্কিত অংশদুটি সংশোধন করে দেশের বাকি রাজ্যের সাথে জম্মু-কাশ্মীরের সাংবিধানিক মর্যাদার সমতা বিধান করবে। আপাত দৃষ্টিতে দেখলে এই প্রতিশ্রুতির মধ্যে অন্যায় কিছুই নেই, কিন্তু বিষয়টাকে শুনতে যতটা হাল্কা লাগে আদপেই ততটা সরল নয় তাই বিস্তৃত পর্যবেক্ষণের প্রয়োজন

ইতিহাসের পথে দুইপা হাঁটলে দেখা যায় ব্রিটিশের ভারত ত্যাগের মুহূর্তে জম্মু-কাশ্মীর ভূখণ্ডটি একটি দেশীয় রাজন্য শাসিত অঞ্চল ছিল যার সংখ্যাগরিষ্ঠ প্রজা ছিল ইসলাম ধর্মাবলম্বী। প্রস্তাবিত পাকিস্থান(পশ্চিম)-এর একদম লাগোয়া এই মুসলিম গরিষ্ঠ রাজ্যটিকে নিয়ে নবগঠিত দুই ইউনিয়নের মধ্যে চাপা উত্তেজনার ছিলই উপরন্তু জনমত উপেক্ষা করে শাসক রাজা হরি সিং স্বাধীন রাষ্ট্রের স্বপ্ন দেখতেন। তবে ভূস্বর্গের প্রধান রাজনৈতিক সংগঠন শেখ আব্দুল্লার ন্যাশনাল কনফারেন্স ভারত ইউনিয়নে আসতে চেয়েছিল বলে জানা যায়। পরিস্থিতি যাই হোক ‘বিকলাঙ্গ ও কীটদষ্ট’ পাকিস্তানে অখুশি জিন্না কাশ্মীর দখলের জন্য উপজাতীয়দের ছদ্মবেশে পাক সেনা পাঠালে বিপন্ন হরি সিং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী প্যাটেলের প্রস্তাব মতো ‘ভারতভুক্তির দলিল’এ স্বাক্ষর করতে বাধ্য হয়।

অতঃপর ভারত প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী পাক বাহিনীকে হঠিয়ে উপত্যকার দখল নেয়। এইসময় আচমকা প্রধানমন্ত্রীর নেহেরুর আন্তর্জাতিক রাজনীতির নিয়মনীতির প্রতি অপ্রয়োজনে সচেতন হয়ে ওঠেন উঠেন এবং যুদ্ধ বন্ধ রেখে নিরাপত্তা পরিষদে কাশ্মীরসমস্যা নিয়ে হাজির হন। বলাবাহুল্য ক্ষমতাবান রাষ্ট্রপঞ্চকের রেষারেষিতে দীর্ণ নিরাপত্তা পরিষদের পক্ষে বিবাদমান দুইপক্ষকে দেওয়ার কিছুই ছিলনা ফলে কাশ্মীর সমস্যা স্থিতাবস্থাপ্রাপ্ত হয়। পরিষদের নির্দেশমতো কাশ্মীরের অর্ধেক অংশ পাকিস্তানের নিয়ন্ত্রনে থেকে যায় যা এখনও পাক অধিকৃত কাশ্মীর বা POK নামে পরিচিত। বাকি অংশে ভারতের রাজনৈতিক শাসন প্রতিষ্ঠিত হয়।

কিন্তু এখানেই স্বাধীন ভারতের সবচেয়ে বড় সাংবিধানিক জটিলতার জায়গাটি তৈরি হয়। হরি সিংহ ভারতভুক্তির ক্ষেত্রে কাশ্মীরের স্বাতন্ত্রের দাবী রেখেছিলেন, বিপন্ন রাজনের এই প্রস্তাব মানার নিশ্চয়ই কোন বাধ্যবাধকতা ছিলনা তবুও ভারত অন্যান্য রাজ্যসমূহের সঙ্গে অসমানতা সৃষ্টি করে কাশ্মীরকে বিশেষ মর্যাদায় ভূষিত করে এবং ধারা ৩৭০ ও অনুচ্ছেদ ৩৫(ক) নামক দুটি অনন্য সাংবিধানিক রক্ষাকবচ কাশ্মীরকে বেঁধে দেয়। উল্লিখিত ধারা দুটির মাধ্যমে কাশ্মীর ভারত ইউনিয়নের মধ্যেই একটি স্বশাসিত অঞ্চলের মতো মর্যাদা লাভ করে যেখানে ইউনিয়ন কেবল বিদেশ, সঞ্চার অর্থাৎ যোগাযোগ আর সুরক্ষা ব্যতীত অন্যান্য বিষয়ে হস্তক্ষেপ করতে পারবে না।

এছাড়াও কাশ্মীরের জন্য পৃথক সংবিধান, পতাকা, দ্বৈতনাগরিকত্ব এবং জম্মু কাশ্মীর বিধানসভার কেন্দ্রীয় আইন অনুমোদনের বিশেষ ক্ষমতা গৃহীত হয়। একার্থে নেহেরু নেতৃত্বাধীন সরকার দেশের মধ্যে আরেকটি দেশ স্বীকার করে নেয়। বিভিন্ন মহল থেকে অনুমান করা হয় দীর্ঘ সাত দশকে কাশ্মীর পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হওয়ার পিছনে রাজনৈতিক ব্যর্থতার পাশাপাশি এই বিষয়গুলিও দায়ী।

লক্ষ্য করলে দেখা যায় সংবিধানের ৩৫(ক) ধারাটি কাশ্মীরের পৃথক নাগরিক অধিকার ও ভূরাজনৈতিক স্বাতন্ত্র্যের স্বীকৃতি। আদতে কাশ্মীরের ভারতভুক্তির আগে বিশের দশকে মহারাজা হরি সিং এক আদেশ বলে কারা কাশ্মীরের বাসিন্দা গণিত হবে তা নির্ধারণ করে দেন, এই আদেশটি ‘রাজ্যপ্রজা আইন’(১৯২৭) নামে পরিচিত। কাশ্মীরের ভারতভুক্তির পর কাশ্মীরের সাংবিধানিক
অবস্থান স্থির করতে শেখ আব্দুল্লাহ ও নেহেরু সরকার বিস্তর আলোচনার পর কাশ্মীরের স্বাতন্ত্র্য স্বীকার করে ১৯৫৪ সালের ১৪ই মে এক রাষ্ট্রপতি আদেশবলে সংবিধানের ৩৫(ক) ধারাটি যুক্ত করে। এই আইনের মাধ্যমে সেদিনের ‘রাজ্যপ্রজা আইন’টি সামান্য পরিবর্তনের পর ভারতের সংবিধানের অঙ্গীভূত হয়।

উল্লেখ করার বিষয় ভারতের সংবিধান সংশোধনের যে কয়টি পদ্ধতি আছে তার একটিও এক্ষেত্রে অনুসরণ করা হয়নি। রাষ্ট্রপতির আদেশ অর্থাৎ অধ্যাদেশের মেয়াদ মাত্র ছয় মাস। অথচ এটিকে স্থায়ীভাবে সংবিধানের অন্তর্ভুক্ত করা হয়, কখনই সংসদে পেশ করা হয়নি। সংবিধান বিশেষজ্ঞ সুভাষ কাশ্যপ এই ত্রুটিটির কথা উল্লেখ করেছেন।

অদ্য এই ৩৫(ক) আইন বলে,
১। ১৯৫৪ সালের ১৪ই মে’র আগে যারা জম্মু ও কাশ্মীরের বাসিন্দা ছিল কেবল
তারাই নাগরিক গন্য হবেন;
২। উল্লিখিত তারিখের অন্ততঃ দশ বছর আগে থেকে যারা জম্মু ও কাশ্মীরে বসবাস
করছে যারা নাগরিকত্ব পাবেন;
৩। উল্লিখিত তারিখের আগে যারা আইনানুসারে রাজ্যে সম্পত্তি খরিদ করেছেন
তারা নাগরিক হওয়ার সুযোগ পাবেন;
৪। ১/৩/১৯৪৭-র পর যারা জম্মু ও কাশ্মীরের ভূখণ্ড থেকে পশ্চিম পাকিস্তানে
গেছেন এবং পুনরায় বসতির অনুমোদন পেয়েছেন তারা নাগরিক গণ্য হবেন;
৫। ভারতের অন্যান্য রাজ্য থেকে কোন ব্যক্তি কাশ্মীরে স্থাবর সম্পত্তি
খরিদ করতে পারবেন না এবং স্থায়ী বসতির অধিকার পাবেন না;
৬। জম্মু ও কাশ্মীরের কোন মহিলা রাজ্যের বাইরের কোন নাগরিককে বিবাহ করলে তিনি সম্পত্তির অধিকার ও নাগরিকত্ব হারাবেন। কিন্তু কোন পুরুষ রাজ্যের বহিঃস্থ কোন নারীকে বিবাহ করলে এরকম বৈষম্যের শিকার হবেন না। অত্যন্ত পুরুষতান্ত্রিক এই আইনটির বিরুদ্ধে মামলা হলে জম্মু হাইকোর্ট আইনটি সামান্য পরিবর্তন করে বাইরে বিবাহ করা নারীর জীবৎকাল সম্পত্তি ও নাগরিকত্ব স্বীকার করে নেয়। কিন্তু এই অধিকার তার সন্তানদের প্রসারিত করা যাবে না (২০০২)।

অর্থাৎ ৩৫(ক) ধারায় জম্মু ও কাশ্মীরকে ভারত ইউনিয়নের মধ্যেই বিশেষাধিকার পেয়ে এসেছে। আমার ব্যক্তিগত মত এই বিশেষাধিকারগুলির জন্যই বাকি ভারতের জনসত্ত্বা জম্মু-কাশ্মীরের মানুষের সাথে কখনও একাত্ম হতে পারেনি, তাদের সমস্যাকে নিজের সমস্যা বলে সহজভাবে নিতে পারেনি। কারণ কাশ্মীর তাদের কাছে অচেনা রয়ে গেছে, সাধারণ ভারতীয় কাশ্মীরের জনসত্ত্বার সঙ্গে মেশার সুযোগ পায়নি। কিন্তু আপাত এই সামাজিক বিষয়গুলোর বাইরেও কিছু বিষয় আছে যেগুলি মানবাধিকার লঙ্ঘনের গুরুতর বিষয়। যেমন বাল্মীকি সম্প্রদায়ের প্রতি বঞ্চনা।

ফাইল ছবি

কথিত আছে ১৯৫৭ সালে পাঞ্জাব রাজ্য থেকে নিম্নবর্গীয় বাল্মিকী সমুদায়ের বেশ কিছু মানুষকে কাশ্মীর আনা হয় সাফাই কাজের জন্য। সেই থেকে বাল্মীকি সম্প্রদায়ের মানুষ কয়েক প্রজন্ম ধরে কাশ্মীরে সাফাইকর্মীর কাজে লিপ্ত অথচ নূন্যতম নাগরিক অধিকার, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, রাজ্য সরকার কর্তৃক নাগরিককে দেয় সুযোগ-সুবিধা ভোগ করতে পারে না কারণ তারা এই রাজ্যে বাস করেও নাগরিক হতে পারেননি।

একই ভাবে দেশভাগ জনিত কারণে পশ্চিম পাকিস্তান থেকে আসা কয়েক লাখ মানুষ কাশ্মীরে বসতি করেও আজও নেই রাজ্যের বাসিন্দা। কারণ ৩৫(ক) ধারার কারণে তারা কাশ্মীরি হতে পারেনি আর কাশ্মীরিয়ৎ তাদের ত্যাজ্য করে রেখেছে। এদের প্রথম প্রজন্ম চলে গিয়ে আজ তৃতীয় ও চতুর্থ প্রজন্ম চলছে কিন্তু জন্মভূমির ভালবাসা ও আশ্রয় থেকে এরা চির বঞ্চিত। হিন্দুস্থান, পাকিস্থান বা কাশ্মীরস্থান ইত্যাদি রাজনৈতিক দড়ি টানাটানিতে এরা কার্যত নেই-মানুষ। শুধু এই দুই জনসত্ত্বাই নয়, জীবন-জীবিকার সন্ধানে কাশ্মীরে এসে কেউ মূলস্রোতে মিশতে পারেননি। কারণ আলগাওবাদীরা চায়নি, স্থানীয় সরকার চায়নি এবং কেন্দ্রীয় সরকার ও তাদের আইন সেই অন্যায়কে দীর্ঘদিন প্রশ্রয় দিয়ে এসেছে।

 

কাশ্মীর সমস্যার পিছনে অনেকে উন্নয়নকে দায়ী করেন কিন্তু হিসেব করলে দেখা যাবে দেশের অন্যান্য অঞ্চল অপেক্ষা কাশ্মীর বরাবর ইউনিয়ন থেকে বেশী সাহায্য পেয়ে এসেছে। তাহলে অনুন্ননের কারণ কি?সহজ কথা মেধা ও সম্পদের চলাচলে বালির বাঁধ। বাইরের থেকে কেউ কাশ্মীরে বিনিয়োগ করতে পারেননা কারণ জমি দেওয়া যাবে না, থাকার জায়গা দেওয়া যাবে না, কাশ্মীরিৎ ক্ষতিগ্রস্ত হবে।

সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রী নিজে উল্লেখ করেন জম্মু আইআইটিতে কোন খ্যাতনামা অধ্যাপক পড়াতে আসতে চাননা কারণ তিনি সেখানে নাগরিকত্ব ও অন্যান্য সুযোগ সুবিধে পাবেন না। বাইরে থেকে ব্যবসা, চাকরি, গবেষণা করতে আসা মানুষের সন্তান স্কুলে ভর্তি হতে পারছে না। দেশের মধ্যে থেকেও কাশ্মীর আলাদা দেশের মতো হয়ে আছে। পরিস্থিতির প্রতিকারকল্পে অবিলম্বে কাশ্মীরকে ইউনিয়নের অন্যান্য রাজ্যের সাথে একই মর্যাদায় আনা জরুরি। কাশ্মীরের ভূরাজনৈতিক অবস্থান এবং কাশ্মিরিয়ৎ আবেগের কথা মাথা রেখে তাদের জন্য চাকুরী, শিক্ষা,কর্মসংস্থানের আলাদা সুযোগ-সুবিধা এবং সাংবিধানিক রক্ষাকবচ রাখা যেতে পারে। কিন্তু সমতা ও মানবতার মৌল নীতি মেনে ‘এক দেশ এক নিয়ম’ হওয়া উচিত। দেশবাসীর আবেদন ভূস্বর্গ তার দ্বার খুলে দিক, বাকি দেশ কাশ্মীরিদের হৃদয়ে জায়গা দিতে প্রস্তুত।

লেখক: নন্দন সাহা। সহকারী অধ্যাপক। ভিক্টোরিয়া ইন্সটিটিউশন (কলেজ)। প্রতিবেদনের মতামত লেখকের।