কলকাতা 24×7-এর সাংবাদিক কৌশিক সিনহা-র মুখোমুখি সামরিক বাহিনীর বঙ্গসন্তান
সময়টা ১৯৯৯, দোসরা মে। কারগিলের বাসিন্দা, মেষপালক আসি নামজেলের চোখে পড়ে যায় পাক জবরদখলকারী হানাদার বাহিনীর গোপন ঘাঁটি। একটুও সময় নষ্ট না করে সে সোজা চলে যায় কাছাকাছির এক ভারতীয় সেনা চৌকিতে। সেনা চৌকি থেকে খবর যায় উপরতলায়৷ এর পরের বিষয়টি তো অনেকেরই জানা। দীর্ঘ লড়াই। পাহাড়ের উপর থেকে পাক হানাদারদের ছোঁড়া শেল-গুলির আঘাতে একের পর এক সেনা জওয়ানের মৃত্যু। দীর্ঘ লড়াই অভিযান শেষে শেষ হাসি হাসে ভারতীয় সেনাবাহিনীই। ২৬ জুলাই কারগিল জয় করে ভারতীয় সেনা। কিন্তু শুনতে যতটা সুন্দর মনে হলেও খুব সহজে এই শৃঙ্গ জয় করা সহজ ছিল না ভারতীয় সেনার কাছে, জানাচ্ছেন তৎকালীন ভারতীয় সেনার মেজর কৌশিক সরকার।

kousik-sarkar
লেফটেন্যান্ট কর্নেল কৌশিক সরকার

kolkata 24×7– কে দেওয়া সাক্ষাৎকারে অবসরপ্রাপ্ত লেফট্যানেন্ট কর্নেল কৌশিক সরকার জানাচ্ছেন, শুধু কারগিল-দ্রাস পুনরুদ্ধার নয়, গোটা ভারতকে বাঁচানোর লক্ষ্য নিয়েই সেই সময় অপারেশন বিজয় শুরু হয়। আর সেই কারণে যে কোনও পরিস্থিতির মোকাবিলায় ভারতীয় সেনাবাহিনীকে তৈরি থাকতে বলা হয়েছিল। আর নির্দেশ পাওয়ামাত্র যে কোনও পরিস্থিতির জন্য তিনি এবং তাঁর বাহিনী তৈরি ছিল। যুদ্ধের আগে তিনি পান্ধার সেক্টরে ছিলেন। জ্বাল সেনা পোস্টের দায়িত্ব ছিল তাঁর কাঁধে।

১৯৭১ সালের যুদ্ধে পাকিস্তানের কাছ থেকে এই সেনা ছাউনি ছিনিয়ে নেয় ভারতীয় সেনাবাহিনী। এই পোস্টের পাস দিয়েই বয়ে গিয়েছে জ্বাল নদী। আর তা ধরে কিছুটা গেলেই প্রকৃত নিয়ন্ত্রণ রেখা (LoC)। কারগিল যুদ্ধের সময় সেই ছাউনির দায়িত্বেই ছিলেন তৎকালীন মেজর, বঙ্গসন্তান কৌশিক সরকার। সেই দিনগুলির কথা মনে পড়লে আজও রক্ত গরম হয়ে যায় তাঁর। লেফটেন্যান্ট কর্নেলের কথায়, পাহাড়ের ওধার চলছে একনাগাড়ে গোলাবর্ষণ, সেইসঙ্গে পাহাড়ের উপর থেকে অবিশ্রান্ত গুলি।  তার মোকাবিলা ছিল রীতিমতো চ্যালেঞ্জ। তার উপর পাহাড়ের গায়ে মাইন পুতে রেখেছিল পাকিস্তান সেনারা। পা পড়লেই একের পর এক বিস্ফোরণ। জীবন দিয়ে তার মোকাবিলায় নেমেছিল ভারতের আর্মি। দিনগুলি তাই ভোলার নয়।

যুদ্ধ চলাকালীন কীভাবে কাটাতেন ভারতীয় জওয়ানেরা?

kargil-wer

এক ধারে যুদ্ধ চলছে, অন্য ধারে পরিবার। কখন কী হবে কেউ জানে না। তবে যে কাউকেই মরতে হতে পারে, এটা সকলেরই জানা ছিল৷ তৎকালীন মেজর সরকার জানাচ্ছেন, সেই সময় সাধারণ জওয়ানদের কারও কাছে কোনও মোবাইল ছিল না। এমনকী, দুর্গম পাহাড়ে টাওয়ার পাওয়াটাও ছিল ভাগ্যের ব্যাপার। তবে সেই সময় ভারত সরকার কারগিলে থাকা সেনা-জওয়ানদের জন্য বিশেষ ফোনের ব্যবস্থা করে। স্যাটেলাইট ফোন সহ আরও বেশ কয়েকটি অত্যাধুনিক প্রযুক্তি ব্যবস্থা। লেফটেন্যান্ট কর্নেল বললেন, সেই সময় তাঁর অধীনে বেশ কয়েকজন সেনা অফিসার ছিলেন। অনেক ক্ষেত্রে তাঁদেরই এই ফোনগুলি তিনি ছেড়ে দিতেন। যাতে তাঁরা বাড়িতে খোঁজখবর নিতে পারেন৷ তবে উদ্বেগে থাকা পরিবারের জন্য নিজে প্রত্যেক দিনই একটা করে চিঠি পাঠাতেন।

লেফটেন্যান্ট কর্নেল জানাচ্ছেন, যুদ্ধরত জওয়ানদের জন্য সেই সময় ভারতীয় ডাক-বিভাগ বিশেষ তৎপরতা দেখিয়েছিল। কিন্তু সেই বিশেষ ব্যবস্থাতেও দুর্গম এলাকা থেকে বাড়িতে চিঠি পাঠাতে প্রায় সাত-আট দিন লেগে যেত। আর সেই কারণে পরিবারকে আশ্বস্ত করতে প্রতিদিনই একটি করে চিঠি লিখতেন এই বাঙালি সেনা অফিসার। যাতে রোজই তাঁর পরিবারের কাছে পৌঁছে যায় সুস্থ থাকার বার্তা। এটা অবশ্য যুদ্ধে লিপ্ত সেনাদের অনেক দিনের পুরানো অভ্যাস৷ বহু কাল ধরে সেনা প্রশিক্ষণের সময়েই সেখানো হত যে, নিয়ম করে প্রতিদিন বাড়িতে চিঠি পাঠানো যে কোনও সেনার রুটিন কাজ৷

যুদ্ধ চলার সময় ছাউনিতে কাটানোটাও ছিল জওয়ানদের কাছে যারপরনাই চ্যালেঞ্জের। দুর্গম পাহাড়ি এলাকা৷ ইলেকট্রিকের কোনও ব্যাপার নেই। এখনও নেই। দিনের পর দিন তাঁদের তাঁবু কিংবা বাংকারের মধ্যে লণ্ঠন কিংবা হ্যাজাক জ্বালিয়েই দিন কাটাতে হয়েছে। লেফটেন্যান্ট কর্নেল কৌশিক সরকারের মতে, কাশ্মীর সীমান্তে ভারতীয় সেনাবাহিনীর জন্য এখনও যে পরিমাণে লণ্ঠন-হ্যাজাক সরবরাহ করা হয়, দেশের কোনও প্রান্তে তা হয় না।

যুদ্ধের সময় কীভাবে পৌঁছত রেশন থেকে গোলাবারুদ?

loc

অবসরপ্রাপ্ত লেফট্যানেন্ট কর্নেল কৌশিক সরকারের বক্তব্য, ভারতীয় সেনার লজিস্টিক প্ল্যানিংটা বরাবরই অসাধারণ। যুদ্ধে থাকা জওয়ানদের জন্য ডাব্বায় করে খাবার আসত। তাতেই মোটামুটি সাত থেকে ১৪ দিন চলে যেত। অন্যদিকে, যে সমস্ত রাস্তা দিয়ে মূলত অস্ত্রশস্ত্র কিংবা গোলাবারুদ আসত, তা ছিল শত্রুপক্ষের নাগালে। কারণ তাদের দখল করা পাহাড়গুলি থেকে পাক সেনারা সড়কপথটা পরিষ্কার দেখতে পেত৷

আরও পড়ুন: কারগিল যুদ্ধে মৃত্যু হতে পারত পাক প্রধানমন্ত্রীর

লেফটেন্যান্ট কর্নেল বলছেন, শত্রুপক্ষ ভালো করেই জানত, এই সংযোগের রাস্তা (লাইন অফ কমিউনিকেশন) গুঁড়িয়ে দিতে পারলেই ভারতের মনোবল ভেঙে দেওয়া যাবে। সে কারণেই ভারতের সেনাবাহিনীকে দুটি কাজ একসঙ্গে করতে হত৷ একদিকে পাকিস্তানের দখল-করা শৃঙ্গগুলির উপর নজরদারি, অপরদিকে এই লাইন অফ কমিউনিকেশন যাতে চালু থাকে সেটা দেখা। এজন্য প্রতি মুহূর্তে চলত পেট্রলিং, যাতে পাক হানাদাররা সহজে না ওই সাপ্লাই লাইনে আঘাত হানতে পারে।

কোনও আক্ষেপ?

wer

শুনে একটু গম্ভীর হয়ে গেলেন লেফটেন্যান্ট কর্নেল৷ তাঁর কথায়, আমেরিকা-ইউরোপের মতো অনেক জায়গাতেই এমন দিন স্মরণীয় রাখতে বিভিন্ন ধরনের অনুষ্ঠান হয়। সাধারণ মানুষ সেইসব অনুষ্ঠানে সগর্বে শামিল হয়৷ কিন্তু ভারতে কারগিল বিজয় দিবসকে স্মরণ করে রাখার জন্য দেশজুড়ে কার্যত কোনও অনুষ্ঠানই হয় না সরকারের তরফে। যদিও সেনা ছাউনি, মিলিটারি স্কুল সহ ভারতীয় সামরিক বাহিনীর বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে বিজয় দিবস পালিত হয়, কিন্তু সামগ্রিকভাবে কোনও সরকারি উদ্যোগ বা অনুষ্ঠান ইত্যাদি দেখা যায় না।

আরও পড়ুন: পাকিস্তানকে উচিত শিক্ষা দিতে চান কারগিল শহিদের স্ত্রী

লেফট্যানেন্ট কর্নেল কৌশিক সরকারের আরও আক্ষেপ, সেইসব দিনের কথা নতুন প্রজন্ম জানেই না। বীর জওয়ানদের মরণপণ লড়াই ও শহিদত্ব বরণের কথা নতুন প্রজন্মের কাছে পৌঁছানোই হয় না। এজন্য অবশ্যই সরকারের এমন কিছু করা উচিত যাতে কারগিলের কথা ভেবে দেশবাসী গর্ব অনুভব করতে পারে৷ প্রতি বছরই হওয়া উচিত এমন সব অনুষ্ঠান যেখানে শহিদ জওয়ানদের পরিবার থেকে শুরু করে তৎকালীন কর্তব্যরত সেনা জওয়ান-অফিসাররা সসম্মানে আমন্ত্রিত হবেন, তাঁদের অভিজ্ঞতার সবার সঙ্গে শেয়ার হবে। তাতে নতুন প্রজন্মের কাছেও যেমন কারগিল বিজয় দিবসের কথা পৌঁছাবে, তেমনই বর্তমানে কর্তব্যরত জওয়ানদেরও অনুপ্রেরণা বাড়বে। আগামী দিনে সেনাবাহিনীতে যোগ দিতে তরুণদের উদ্বুদ্ধ করবে। সেইসঙ্গে নবীন প্রজন্মের মধ্যে বাড়বে দেশাত্মবোধ, দেশপ্রেম, দেশভক্তি।  স্বাধীনতার এতকাল বাদেও তারা বুঝতে শিখবে, জননী জন্মভূমিশ্চ স্বর্গাদপি গরীয়সী৷

এ জন্য কি কোনও পদক্ষেপ নেবেন?

chakra
বর্তমানে নিজের বইতে মগ্ন কৌশিক সরকার

অবসরপ্রাপ্ত লেফট্যানেন্ট কর্নেল কৌশিক সরকারের কথায়, আমাদের একটি অরগাইনেজশন রয়েছে, এক্স-সার্ভিসমেন অ্যাসোসিয়েশন। এই সংস্থার মাধ্যমেই সরকারের কাছে আমরা কারগিল বিজয় দিবস নিয়ে কোনও অনুষ্ঠান করার কথা জানাতে চাই।

বর্তমান কাশ্মীরের অবস্থা নিয়ে কিছু বলবেন?

যেভাবে পাক প্রধানমন্ত্রী শরিফ কাশ্মীর ছিনিয়ে নিয়ে যাওয়ার কথা বলছেন, তা কখনই মেনে নেওয়া যায় না। এই কথা শোনার পর প্রত্যেক ভারতবাসীর চোয়াল শক্ত হওয়া উচিত। ভারতে থেকে সবাই পাকিস্তানি বনে গিয়েছে নাকি! এই মন্তব্য করে অবসরপ্রাপ্ত লেফট্যানেন্ট কর্নেল কৌশিক সরকারের প্রস্তাব, কড়া দাওয়াই দরকার।