pulakesh-ghoshপুলকেশ ঘোষ, (কারগিল যুদ্ধ কভার করা বর্তমানের প্রাক্তন সাংবাদিক)
বাংলা সংবাদমাধ্যমে কারগিল যুদ্ধের প্রথম খবর ছাপা হয়েছিল একমাত্র বর্তমান পত্রিকায়। সেই যুদ্ধ চোখের সামনে দেখার সুযোগ যে ক’জন পেয়েছিলেন, তাঁদের মধ্যে একজন পুলকেশ ঘোষ। কারগিল বিজয় দিবসে সেইসব দিনগুলির কথাই Kolkata24x7-এ তুলে ধরলেন তিনি।

সেদিন সকাল থেকেই টাইগার হিল পাহাড়টাকে তিনদিক থেকে বোফর্স কামান সাজিয়ে ঘিরে ফেলেছিল আমাদের জওয়ানরা। দ্রাস ব্রিগেডের সামনে সারি দিয়ে গাড়িতে রাখা ছিল মাল্টি ব্যারেল রকেট লঞ্চার। বিকেল একটু গড়াতে না গড়াতেই শুরু হয়ে গেল ধুন্ধুমার যুদ্ধ। রকেট লঞ্চারগুলি থেকে হাউইয়ের মতো রকেটগুলি প্রতি সেকেন্ডে আকাশ কাঁপিয়ে উড়ে গিয়ে আছড়ে পড়তে লাগল টাইগার হিলের শত্রু বাঙ্কারগুলির উপরে ও আশপাশে। বোফর্সের একেকটা গোলা শত্রু বাঙ্কারগুলি গুঁড়িয়ে দেওয়ার তুমুল সম্ভাবনা বুকে নিয়ে উড়ে যেতে লাগল টাইগার হিলের দিকে। পাল্টা ছুটে আসছে শত্রুপক্ষের গোলা। সাঁই সাঁই শব্দে জানান দিয়ে এসে তাদের বেশিরভাগই লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়ে আশ্রয় নিচ্ছিল দ্রাস নদীর গর্ভে। সন্ধে নেমেছে। গোটা কারগিল যুদ্ধক্ষেত্রে তখন দেওয়ালি। অমাবস্যার অন্ধকার কাটিয়ে শান্তির ভোর আনার দেওয়ালি।

আরও পড়ুন: পাকিস্তানকে উচিত শিক্ষা দিতে চান কারগিল শহিদের স্ত্রী

মুগ্ধ হয়ে দেখছি সেই দেওয়ালি। আর কল্পনায় মনে পড়ছে কর্ণেল ঠাকুরের ছেলের মুখটা। গোটা দেশবাসীর সঙ্গে সেও আজ অপেক্ষা করছে তার বাবার জয়ের। দুপুরের খাবার খেয়ে ১৮ গ্রেনেডিয়ার্সের বাহিনী নিয়ে টাইগার হিল জয়ে রওনা দেওয়ার সময়ে ছেলে ফোনে বাবাকে বলেছিল, পাপা, জিতকে আনা। তারপর থেকে মানুষটাই যেন বদলে গেলেন। সংকল্পে দৃঢ হয়ে গেলেন। আজ যেন ওই তাঁর কমান্ডার। তার নির্দেশ, জিতকে আনা।

আরও পড়ুন: কারগিল যুদ্ধে খোদ পাকিস্তানে হামলা চালাতে তৈরি ছিল বায়ুসেনা

পরের দিন দুপুরে দাঁড়িয়ে আছি সেই একই জায়গায়- হলিয়াল প্রাথমিক স্কুলের সামনে। ওটাই ছিল টাইগার হিল অপারেশনের বেস ক্যাম্প। রণক্লান্ত সৈনিকরা নামছে বিজয়োল্লাস করতে করতে। বেস ক্যাম্পে ঢুকে হাতল ঘোরানো ফোনে যোগাযোগ করলাম কর্ণেল ঠাকুরের সঙ্গে। বললেন, আমরা পেরেছি। হানাদারদের খতম করে দেশের মাটি উদ্ধার করেছি। এই জয় দেশের মানুষের জয়।

জয়টা সহজসাধ্য ছিল না। পাহাড়চুড়োয় বসে থাকা হানাদারদের নীচের সৈন্যদের পক্ষে তাড়ানো চাট্টিখানি ব্যাপার নয়। এটা বুঝেই পাকিস্তান ১৯৯৯ সালে এই নোংরা চাল চেলেছিল। কারগিল জেলার নিয়ন্ত্রণরেখা বরাবর পর্বতশিখরে শীতকালে তাপমাত্রা মাইনাস ৬০ ডিগ্রিতে নেমে যায়। ওই তাপমাত্রায় বাঙ্কারে টিকে থাকা প্রায় অসম্ভব বলেই প্রতি শীতে ভারত ও পাকিস্তান উভয় পক্ষের সৈন্যরাই এলাকা খালি করে চলে আসত। এটাই ছিল প্রথা। কিন্তু সে বছর নিজের বাহিনী ও পাক মদতপুষ্ট জঙ্গিদের প্রচুর অস্ত্রসহ বাঙ্কারে ঢুকিয়ে দেয় পাকিস্তান। তাদের এই মারাত্মক চালের কথা ঘুণাক্ষরেও বুঝতে পারেনি আমাদের সেনারা।

কার্গিলে সাংবাদিক পুলকেশ ঘোষ (ছবির বাঁদিক থেকে দ্বিতীয়)
কার্গিলে সাংবাদিক পুলকেশ ঘোষ (ছবির বাঁদিক থেকে দ্বিতীয়)

আরও পড়ুন: কারগিল যুদ্ধেই প্রথম অবতীর্ণ হন দুই মহিলা পাইলট

মে মাসের শুরুতেই নিজেদের গবাদি পশু খুঁজতে গিয়ে বাতালিক অঞ্চলের গ্রামবাসীরা পাকিস্তানি হানাদারদের ঘাড়ের উপর বসে থাকতে দেখেন। তাঁদের কাছ থেকে খবর পেয়ে ভারতীয় সৈন্যরা ওই এলাকায় টহলদারি করতে গিয়ে বিপাকে পড়ে যান। ক্যাপ্টেন সৌরভ কালিয়া সহ কয়েকজন ভারতীয় জওয়ান পাকিস্তানি সৈন্যদের হাতে অত্যাচারিত হন ও মারা যান। ততদিনে আকাশ ও স্থলপথে সমীক্ষা করে ভারত বুঝতে পেরে গিয়েছে, এটা কোনও ছোট ঘটনা নয়। দ্রাস, কারগিল, বাতালিক বরাবর নিয়ন্ত্রণরেখা জুড়ে ভারতে অনেকখানি ভিতরে ঢুকে এদেশের সৈন্যদের ছেড়ে আসা বাঙ্কারগুলি দখল করে বসে গিয়েছে হাজার হাজার পাকিস্তানি সেনা, আধা সেনা ও জঙ্গি। পাকিস্তানের মতলব খারাপ। তারা চায়, বিশ্বজুড়ে এই ঘটনার প্রচার। তারা চায়, আন্তর্জাতিক মহলে বিষয়টি আলোচনা হোক।

ভারত কড়া ভাষায় পাকিস্তানি হামলার জবাব দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিল। শুরু হয়ে গেল যুদ্ধ যার পোশাকি নাম ‘অপারেশন বিজয়’। বাস্তবে এ এক ভয়ঙ্কর অসম যুদ্ধ। উপরে থাকার সুবাদে যোগাযোগের একমাত্র রাস্তা ১ নম্বর জাতীয় সড়কের উপরে তখন পাকিস্তানিদের নজরদারি। জাতীয় সড়কের উপর শুরু হয়ে গেল যথেচ্ছ গোলাবর্ষণ। এই পরিস্থিতির মধ্যে অদম্য সাহস আর যুদ্ধকুশলতার সুবাদে ভারতীয় সৈনিকরা পাকিস্তানি সমরাস্ত্রের মোকাবিলা করে একের পর এক পার্বত্য এলাকার দখলদারি ফিরিয়ে আনতে সক্ষম হল।

আরও পড়ুন: নেতাদের মারধরে অপমানিত কারগিল যুদ্ধের সেনানি

একদিকে ভারতীয় সৈন্যদের রুখে দাঁড়ানোর চাপ, অন্যদিকে ভারত থেকে সেনা প্রত্যাহারের জন্য আমেরিকা সহ বহির্বিশ্বের চাপ- এই দুইয়ের কারণে পাকিস্তানও বাধ্য হল পিছু হঠতে। ৪ জুলাই টাইগার হিল জয়ের পর ভারতীয় সেনারা নিয়ন্ত্রণরেখা বরাবর সব বাঙ্কার দখলমুক্ত করে। এলাকা শত্রুশূন্য বলে নিশ্চিত হওয়ার পরেই ২৬ জুলাই ‘অপারেশন বিজয়’ সমাপ্ত হলে সরকারিভাবে ঘোষিত হয়। এক গৌরবজনক লড়াইয়ের পর এই দিনটি প্রতি বছর পালিত হয় ‘অপারেশন বিজয় দিবস’ হিসাবে। আজ সেই বিজয় দিবস। ভারতীয় সেনাদের সাহসিকতাকে আমরা সেলাম জানাই। আর সেই সঙ্গে স্মরণ করি তাঁদের, মুক্তির মন্দির সোপানতলে যাঁরা জীবন দিয়ে শত্রুকে বুঝিয়ে দিলেন, আমরা পাঁজর দিয়ে দুর্গঘাঁটি গড়তে জানি।

আরও পড়ুন: কারগিল যুদ্ধে মৃত্যু হতে পারত পাক প্রধানমন্ত্রীর