সরোজ দরবার: তিনি এসেছিলেন সব আপাতবিরুদ্ধ স্রোতগুলিকে মিলিয়ে দিতে৷ হিন্দুর জল, মুসলমানের পানি, খ্রিস্টানের ওয়াটারে যে কোনও তফাৎ নেই, সেই সারসত্যটা সকলের সামনে তুলে দিতে৷ চেতনার আলোকে চৈতন্যকে জাগরূক করে দিতেই তো তাঁর আসা৷ এ নশ্বর পৃথিবীতে সবকিছুই উচ্ছিষ্ট হয়৷ শুধু খাঁটি বস্তুটি থাকে ‘ব্রহ্ম-বিজ্ঞান’৷ মতের মাতামাতি নয়, পথের পাগলামো নয়, সেই জ্ঞানের শলাকাটি উসকে দিতেই তো তিনি এসেছিলেন৷ কে তিনি? কতজনে কত নামে ডেকেছে তাঁকে৷ নামের সীমায় কী তাঁর মতো সীমাহীনের পরিধি টানা যায়? যায় না বলেই তো তাঁর গৃহী ভক্ত গিরিশ বলেছিলেন, ব্যাস বাল্মীকি যাঁকে আয়ত্ত করতে পারেননি, তিনি তাঁকে কী বুঝবেন? তিনি তাই নিজেই বুঝিয়ে দেবেন তিনি কে৷ ১৮৮৬ সালের ১ জানুয়ারীই নির্ধারিত হয়েছিল সে দিন৷ যেদিন যাবার আগে হাটে হাঁড়িটি ভাঙবেন তিনি৷ সকল ভক্তকে আশীর্বাদ করে বলে যাবেন, ‘তোমাদের চৈতন্য হোক৷’ তাঁর ভক্তরা জানবে, দুনিয়া জানবে, ভারতীয় সাধনার ধারা জানবে তিনি, শ্রীরামকৃষ্ণ পরমংহসই কল্পতরু ঠাকুর৷

Ramakrishna-painting-by-NC-Dasসাধনা ও সন্ন্যাসের ধারা তো এ দেশের চিরকালীন ঐতিহ্য৷ কত হাজার বছর ধরে বৈরাগ্যের সে ধারা প্রবাহমান৷ এর মধ্যে তাঁর ধারাটি যে একেবারে আলাদা৷ তিনি তো বরাবরই বলে এসেছেন, তিনি মায়ের সন্তান মাত্র৷ মাতৃসাধক? কই, শাক্তসাধকদের মতো তাঁর তো হাবভাব নয়৷ বরং তিনি যে রসেবশে থাকতেই ভালোবাসেন৷ দক্ষিণেশ্বরের গঙ্গাকে সাক্ষী রেখে তিনি যে কর্মযজ্ঞশালা খুলেছেন, তাঁর খবর কে রাখে! কতলোকে বলেছে পাগল ঠাকুর৷ যুক্তিবাদীদেরও মনে হয়েছিল, সবই বুজরুকি বোধহয়৷ কই, দেবেন ঠাকুর বা কেশব সেনের মতো তাঁর পড়াশোনা আছে নাকি? নরেন্দ্রনাথ দত্তও বিশ্বাস করেননি৷ চোখে চোখ রেখে প্রশ্ন করেছিলেন, তিনি ভগবানকে দেখেছেন কি না৷ তিনি উত্তর দিয়েছিলেন আরও স্পষ্ট৷ আসলে তিনি তো জানতেন, তাঁর কাছে কে এসেছেন৷ এ ধরাধামে তিনি আসার আগে সপ্তর্ষিমণ্ডলের ধ্যানরত ঋষিকে জানিয়েই এসেছিলেন৷ ঋষি জানিয়েছিলেন, তিনি আসবেন৷ ঠাকুরের কাছে তিনি এলেনও, তবে বড্ড দেরী করে৷ জীবনের শেষ কটা বছর মাত্র তাঁদের একসঙ্গে চলা৷ তবু নতুন বেশে তরুণ যুবার কী তর সয়! বারবার ঠাকুরের চায় সেই পরমধন৷ একদিন ওই দক্ষিণেশ্বরের ঘরেই অল্পস্বল্প দিয়েছিলেন তা৷ আর তাতেই চোখের সামনে বিশ্বব্রহ্মাণ্ড দুলে উঠেছিল নরেনের৷ সেই তেজ সহ্য করতে পারছিলেন না৷ চিৎকার করে বলেছিলেন, এ তুমি আমার কী করলে? আমার যে মা আছে৷ সেদিনের মতো ছেড়ে দিয়েছিলেন৷ তবে সেদিন থেকেই যে তিনি কল্পতরু৷ যা তিনি দিতে এসেছেন, সেদিনই প্রকৃত আধারে তা দেওয়া শুরু করে দিয়েছিলেন৷

কিন্তু তাঁর কর্মকাণ্ডের তো একটা ধারা নয়৷ ঊনিশ শতকে দেশে যখন জাতীয়তাবাদের জাগরণ আবশ্যক, তখন তিনি জানেন কোনপথে ধর্মের চালনা জরুরি৷ শিবজ্ঞানের জীবসেবার মন্ত্র ততদিনে তিনি সঞ্চারিত করে দিয়েছেন৷ তাবড় পণ্ডিত তাঁর বশীভূত৷ সরল, সামান্য এই মানুষটির কী যে অমোঘ জাদু, কী যে অসাধারণ আকর্ষণ ক্ষমতা তার ইয়ত্তা যেন কেউই করতে পারেন না৷ কেশব সেন পণ্ডিত মানুষ, তিনি চিনেছেন কে ইনি৷ কোন বিরাটের প্রতিশ্রুতি নিয়ে ইনি প্রাণের ঠাকুর হয়ে আছেন, তা বুঝতে অসুবিধা হয়নি তাঁর৷ কিন্তু অমন মাতাল গিরীশচন্দ্র, অমন বেপরোয়া গিরীশচন্দ্রও কোন মন্ত্রে এমন শিশুর মতো হয়ে যান তাঁর সামনে! এ এক জটিল ধাঁধা৷ আসলে সমাধান তো তোলা আছে তাঁর কাছেই৷ তিনি জানেন, ধর্মের শিরদাঁড়ায় দেশকে দাঁড় করাতে হলে একটি ধারা যদি গৈরিক হয়, তবে অন্যটি অবশ্যই গৃহীর৷ একদিকটার হাল ততদিনে ধরে নিয়েছেন নরেন্দ্রনাথ৷ তাঁকে তো যা দেখানোর তিনি দেখিয়েই দিয়েছেন৷ এবার পালা গৃহী ধারার নেতা করে গিরীশকে দায়িত্বভার তুলে দেওয়ার৷ তিনি যে কী, আর কী নন তারই কূল করে উঠতে পারেন না কেউ৷ এবার তো তাহলে হাটে হাঁড়িটা ভাঙা দরকার৷

লীলাখেলার শেষবেলা৷ মানুষরূপী শরীরে বাসা বেঁধেছে মারণরোগ৷ তিনি আর থাকেনও না দক্ষিণেশ্বরে৷ ভক্তরা তাঁকে নিয়ে গিয়ে রেখেছে কাশীপুরের উদ্যানবাটীতে৷ মাসিক ৮০ টাকা ভাড়ায় নেওয়া হয়েছে এ উদ্যানবাটী৷ দোতালার ঘরে আছেন তিনি৷ চিকিৎসা করছেন ডাঃ মহেন্দ্রলাল সরকার৷ পরবর্তীকালে শ্রীম নামে যিনি কথামৃত লিখবেন৷ তিনি জানেন এ যাত্রায় তাঁর পালা শেষ৷ তাঁর সন্ন্যাসী শিষ্যরা নেমে পড়েছেন দেশের বুনিয়াদ গঠনের কাজে৷ নরেন্দ্রনাথই সেখানে সব৷ তাঁকে তো শেষবেলায় যা দেওয়ার দিয়ে তিনি ফকির হবেন৷ এবার তবে গৃহী ভক্তদেরও দেখিয়ে দেওয়া যাক৷ ১৮৮৬ সাল৷ জীবনলীলার শেষ বছর৷ পয়লা জানুয়ারি৷ ছুটির দিন৷ শরীরটা যেন আজ অনেকটা ভালো৷ দোতালা থেকে নীচে নেমে এলেন ঠাকুর৷ রোগশীর্ণ৷ কিন্তু চোখদুটি ভাবে উজ্জ্বল৷ পরনে সবুজ পোশাক৷ মাথায় টুপি৷ পায়ে ফুলপাতার নকশা আঁকা জুতো৷ ঠাকুর নীচে নামছেন দেখে সন্ন্যাসীরা ভক্তরা তাঁর বিছানা রোদে দিতে গেলেন৷ ঠাকুর এসে দাঁড়ালেন গৃহী ভক্তদের মাঝে৷ কে কে আছেন এই পরমক্ষণে? আছেন গিরিশচন্দ্র, নবগোপাল ঘোষ, অক্ষয়কুমার সেন ও আরও অনেকে৷ ঠাকুর এসে দাঁড়ালেন গিরিশের সামনে৷ জানতে চাইলেন, তাঁকে গিরীশচন্দ্র কীরকম বুঝেছেন? বিনীত গিরীশ আর কী বলবেন! বললেন, ব্যাস-বাল্মীকি যাঁকে আয়ত্ত করতে পারেননি, তিনি তাঁকে কী বুঝবেন? ভাবান্তর হল ঠাকুরের৷ দুই আঙুলের মুদ্রায় আশীর্বাদ এঁকে তিনি বললেন, ‘তোমাদের চৈতন্য হোক’৷ ধন্য হলেন ভক্তরা৷ অক্ষয় হল সেই আমগাছ, যার নীচে দাঁড়িয়ে উচ্চারিত হল পরম আশীর্বাদবাণী৷

আসলে তো পূর্ণ হল বৃত্ত৷ গোষ্ঠী নয়, বিবাদ নয়, বড় ছোট কিছু নয়, চেতনা থেকে চৈতন্যে পৌঁছেই downloadমানুষের মুক্তি৷ সন্ন্যাসী শিষ্যরা নরেন্দ্রনাথের হাত ধরে সে পথের খোঁজ পেয়ে গিয়েছেন৷ আর গৃহীদের সে খোঁজ দিয়ে গেলেন৷ দিয়ে গেলেন মানবজাতিকে৷ সংসারবন্ধনে থেকে বৈরাগ্যসাধনে এই মুক্তির শিক্ষাই তো পরবর্তীকালে উঠে আসবে বাঙালির মহাকবির কলমেও৷ সে সত্য জানিয়েই  ভারতের সাধনার ধারাকে তিনি সেদিন দিয়ে গেলেন কাঙ্ক্ষিত আধুনিকতা৷ একদল বাইরে গিয়ে সমাজ গড়বে৷ একদল সংসারেই বৈরাগ্যসাধনে ঘর গোছাবে৷ দুটোই মুক্তির পথ৷ দুটো পথই গিয়ে মিশবে এক ব্রহ্মে৷ দুটিকেই সমানধারায় চালিত করে দিলেন তিনি৷

ধর্মপ্রধান এ দেশে চৈতন্যের এ বাণীই আসল মন্ত্র৷ যুগে যুগে সাধক, মহাপুরুষরা সেটিই জানাতে চেয়েছেন৷ সকলেই নিয়েছেন অন্য পথ৷ পরাধীন দেশে জাতীয়তাবাদের উত্থানকে মাথায় রেখেই চৈতন্যের সেই বাণীকে সমাজগঠনের ঘর ও বাহির গোছানোর যে অভাবিত পথে চালিত করলেন, তাইই হয়তো পরবর্তীকালে সমাজবিজ্ঞানীদের কাছে মডেল হয়ে উঠবে৷ বৈরাগ্যসাধনের দুই পথ তিনি বেঁধে দিলেন চৈতন্যের আগুনে৷ এইটিই শিক্ষা৷ এটিই আধুনিক মানুষকে দিয়ে গেলেন কল্পতরু ঠাকুর৷

আরও একটা পয়লা জানুয়ারি মানে আরও একবার কল্পতরু উৎসব পালন৷ আজও কি ঠাকুর কল্পতরু হন? আজ গিরিশচন্দ্র নেই৷ নরেন্দ্রনাথও নেই৷ তবু গৈরিক ও গৃহীর সমান্তরাল স্রোত আছে৷ আছে বৈরাগ্যসাধনে মুক্তির খোঁজ৷  সে পথ দিশাহার হলেই তিনি আসেন৷ বলে ওঠেন, চৈতন্য হোক৷ চৈতন্যলাভেই ধর্মসাধনের সত্যিটা যখনই আমরা অনুধাবন করি ততেবারই কল্পতরু হন ঠাকুর৷ শুধু কাশীপুর উদ্যানবাটিতে সেদিনই তো, আজও ভক্তের মনউদ্যানে তিনি নেমে আসেন৷ বলেন, কে কী বুঝলি আমাকে? সেই প্রশ্নে সমপর্ণেই আছে মুক্তির খোঁজ৷ নিবেদনের সেই লগ্নে কাশীপুর আর বৃন্দাবন যেন এক হয়ে যায়৷ আর কে না জানে, বৃন্দাবনে আজও বাঁশি বাজে৷ শুধু কেউ কেউ তা শুনতে পান৷ চৈতন্যের শিক্ষায় ঠাকুর আজও তো কল্পতরু হন, শুধু কেউ কেউই তাঁর দেখা পান৷

 

 

 

 

 

 

পপ্রশ্ন অনেক: চতুর্থ পর্ব

বর্ণ বৈষম্য নিয়ে যে প্রশ্ন, তার সমাধান কী শুধুই মাঝে মাঝে কিছু প্রতিবাদ