দেবযানী সরকার: ‘পান দিলে সুপারী লাগে আরও লাগে চুন, ঘষিয়া ঘষিয়া জ্বলে পীরিতের আগুন।’ এক লোককবি তাঁর গানেই বুঝিয়ে দিয়েছেন একখিলি পানই যথেষ্ট হৃদয় জিততে৷পান সম্রাট সনাতন দত্ত সেটা বুঝেছিলেন৷ তাই ওপার বাংলার পর এপারেরও মন জয় করতে পেরেছিলেন তিনি৷ এই প্রমাণ মিলবে ‘কল্পতরু’তে গেলেই৷

ছবি-শশী ঘোষ
ছবি-kolkata24x7

রাধাবিনোদ দত্ত ও সনাতন দত্ত৷ আদি বাড়ি বর্তমান বাংলাদেশের ঢাকা শহরে।দেশ স্বাধীনের পর ঢাকার পানের দোকানের ব্যবসা গুটিয়ে কলকাতায় চলে আসেন এই দুই ভাই৷ ১৯৪৭ সালে কলেজ স্ট্রিটে খোলেন কল্পতরু৷ বর্তমানে সনাতন দত্তের ভাইপো অর্থাৎ রাধাবিনোদ দত্তের ছেলে শ্যামল দত্ত এই দোকান চালাচ্ছেন৷

ছবি-শশী ঘোষ
ছবি-kolkata24x7

বাংলাদেশ থেকেই পান সম্রাটের খেতাব নিয়ে এদেশে এসেছিলেন সনাতন দত্ত৷তাই এখানে পান ব্যবসার শক্তিশালী সাম্রাজ্য গড়ে নিতে বেশিদিন সময় লাগেনি৷ তাঁর বানানো পান কে খাননি? ইন্দিরা গান্ধী, ডঃ সর্বপল্লী রাধাকৃষ্ণন, প্রাক্তণ রাষ্ট্রপতি জাকির হুসেন৷ পদ্মজা নাইডু তো আছেনই৷ মান্না দে, ভানু বন্দ্যোপাধ্যায়, ভি বালসারা মতো সেলেবরা এই দোকানে এসে পানের আমেজ নিয়েছেন৷পানের ঢালাও প্রশংসাও করেছেন তাঁরা৷

pan-5
ছবি-kolkata24x7

পশ্চিমবঙ্গ সরকারের রেজিস্টার্ড এই দোকানে গেলেই দেখতে পাওয়া যাবে ফ্রেমে বাঁধানো সব দিকপালদের সার্টিফিকেট। কল্পতরুর নিজস্ব সাইনবোর্ডেও সেই গর্ব ফুটে উঠছে৷ দোকানের সাইনবোর্ডে জ্বলজ্বল করছে ‘ঢাকার সুপ্রসিদ্ধ ও বিখ্যাত এবং বহু প্রশংসাযুক্ত সার্টিফিকেট প্রাপ্ত নানা প্রকার মশল্লাপূর্ণ খিলি পান বিক্রেতা।’ নীচে লেখা, দয়া করে একটু দাঁড়ান৷!ভাল পান পাবেন৷

pan-4
ছবি-kolkata24x7

১৯৪৭ সালে কল্পতরুর একখিলি পানের সর্বোচ্চ মূল্য ছিল পাঁচ টাকা৷ এখন এটাই সর্বনিম্ন৷ বর্তমানে তাদের একখিলির সর্বোচ্চ মূল্য ১০০১টাকা৷ একহাজারি এই পানের নাম কল্পতরু স্পেশাল৷ বাদশাহী পানের এক খিলির দাম ৫০১ টাকা৷ এছাড়াও মন মাতোয়ারা, দিলখোস, মুখ বিলাস ও বেনারসি রুচিও রয়েছে তালিকায়৷

পানের দাম নিয়ে কোনও প্রশ্ন উঠলেই কল্পতরুর বর্তমান মালিক শ্যামলবাবু মনে করিয়ে দেন বহু প্রচলিত কথা- যেমন গুড় তেমন মিষ্টি৷ তাঁর কথায়, ‘‘আমাদের পানের মশলা আসে চেন্নাই, কানপুর, বেনারস থেকে৷ এলাহাবাদ থেকে সুপুরি আর ভুবনেশ্বর থেকে পানের পাতা আসে৷ প্রায় ৪০ রকমের মশলা রাখি আমরা৷ আমাদের পানের বিশেষত্ব হল, পানের পিক বেরোয় না, চুন,খয়ের খাকলেও মুখে লাল বা জিভ ভারী হয় না, মুখের মধ্যেই পুরো পানটা মিলিয়ে যায়৷’’
তবে আগের থেকে কল্পতরুর কাউন্টার সেল অনেক কমেছে৷ বর্তমানে অনুষ্ঠান বাড়ির অর্ডারের উপর টিকে আছে এই বাদশাহী পান ব্যবসা৷

ইলেকট্রনিক্স ইঞ্জিনিয়ারিং-এর ছাত্র ছিলেন শ্যামলবাবু৷ একসময় ভালো মাইনের চাকরীও করতেন৷ কিন্তু বাপ-কাকার মৃত্যুর পর কল্পতরুর হাল ধরেন তিনি৷ ষাট বছরের দোরগোড়ায় দাঁড়িয়ে৷ তাঁর চিন্তা এখন কল্পতরুর ভবিষ্যত নিয়ে৷ একমাত্র মেয়ের বিয়ে হয়ে গিয়েছে৷ উত্তরসূরি সেভাবে কেউ নেই৷ তাহলে বইপাড়ার এই ঐতিহ্যবাহী দোকানের অস্তিত্ব শুধুই কি বইয়ের পাতায় বা মানুষের মনে স্মৃতি হয়ে থাকবে?