হাওড়া: বিয়ের পর মহানন্দ। তাই সকলে মিলে আমরা নাচ করি। কী নাচ? কালিকাপাতাড়ি নাচ। রাতভর নীলের বিয়ে দিয়ে পরের দিন ভোর বেলা গ্রামের মানুষ মাতেন কালিকাপাতাড়ি নাচে। এটাই রীতি হাওড়ার এই অঞ্চলের। আজ ভোরে সেই নৃত্যেই মাতলেন গ্রামের মানুষ।

ছৌ-নাচ, রণপা, ঝুমুর, ব্রিতা, টুসু, নাচনি নৃত্যের মতো বঙ্গ লোক-সংস্কৃতির অন্যতম অঙ্গ হাওড়া জেলার নিজস্ব লোকনৃত্য কালিকাপাতাড়ি।প্রসঙ্গত, সমগ্র ভারতের মধ্যে হাওড়া জেলার শ্যামপুর, বাগনান ও আমতায় এই লুপ্তপ্রায় লোকনৃত্যের চল রয়েছে। ইতিহাসের পাতা উল্টে দেখলে জানা যায়, প্রায় একশো বছর আগে অর্থাৎ বিংশ শতকের সূচনা লগ্নে কালিকাপাতাড়ি বা কালকেপাতাড়ি নৃত্যের উদ্ভব ঘটে বলে জানা যায়। মূলত, শিবচতুর্দশীর রাতে শিবের ব্রত করা মহিলাদের জাগিয়ে রাখতে ও আনন্দদানের উদ্দেশ্যে বিভিন্ন জায়গায় এই লোকশিল্প পরিবেশিত হত। শুধু শিবচতুর্দশী নয়, নীলষষ্ঠীর রাতে নীলের বিয়ের পর ভোরে এখনও কালিকাপাতাড়ি নৃত্য অনুষ্ঠিত হয় শ্যামপুরের রতনপুর গ্রামে।

প্রধানত, পুরাণ ও মহাকাব্যের ভিত্তিতে মুখে মুখে রচিত হয় এক-একটি টুকরো কাহিনী। বাদ্যযন্ত্র সহকারে এই কাহিনীগুলিই মঞ্চে অভিনীত হয়। কাহিনীগুলি পুরাণ ও মহাভারতের এমন সমস্ত অংশ থেকে গৃহীত হয় যেখানে শক্তির প্রদর্শন হয়। শিব-দুর্গা-কালী অশুভ শক্তির বিনাশ করে স্থলে-জলে-অন্তঃরীক্ষে তথা ত্রিভুবনে কীভাবে শান্তির বাণী পৌঁছে দিয়েছিলেন তা-ই প্রধানত হাওড়ার প্রত্যন্ত গ্রামের মানুষের কাছে এই নৃত্যের মধ্য দিয়ে তুলে ধরা হয়। বিভিন্ন বেশভূষায় সু-সজ্জিত হয়ে কলাকুশলীরা পালায় অংশ নেন। অন্যদিকে, মঞ্চের বাইরে থেকে পুতুল নাচের মতো সঞ্চালনা করেন একজন ব্যক্তি। সাথে ঢোল-মাদল-কাঁসরের রব। এভাবেই দর্শকদের মনোরঞ্জন করেন কলাকুশলীরা। সময়ের সাথে সাথে এই নৃত্য তার জৌলুস হারিয়েছে।

বর্তমানে শ্যামপুরে ৩টি দলে ৫০ জন শিল্পী আছেন। এক একটি দলে ১৫ থেকে ২০ জন করে শিল্পী প্রাচীন এই শিল্পে অভিনয় করেন। শত সমস্যার মাঝেও এখনো কালিকাপাতাড়ির চর্চা চালিয়ে যাচ্ছে শ্যামপুর-২ ব্লকের আমড়দহ গ্রাম পঞ্চায়েতের অন্তর্গত রতনপুর রত্নমালা কালিকাপাতাড়ি নৃত্য সংস্থা। সংগঠনের জ’না পনেরো শিল্পী হাওড়া জেলার এই লোকনৃত্যকে বাঁচিয়ে রাখতে নিয়মিত লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন।

অন্যতম শিল্পী বছর চৌষট্টির নরোত্তম রায় জানান, ‘কালিকাপাতাড়ি সারা জেলা তথা বাংলার গর্ব। এখনো প্রাচীন রীতি মেনে নীলষষ্ঠীর রাতে নীলের বিয়ের আসরে এই নৃত্য অনুষ্ঠিত হয় রতনপুরে।” তিনি আরও বলেন,”১৯৭৭ সাল থেকে আমি কালিকাপাতাড়ির সাথে যুক্ত। এখন তথ্য ও সংস্কৃতি দপ্তরের উদ্যোগে বছরের বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন জায়গায় শোও করতে যাই। তবে বয়সের ভারে এখন আর সেভাবে অভিনয় করিনা। মঞ্চের নীচের কাজই বেশি করি।’

কিন্তু, দুর্ভাগ্যের বিষয় নব প্রজন্মের কোনো মুখ সেভাবে এই লোক-নৃত্যজগতে না আসায় হয়তো অচিরেই ইতিহাসের পাতায় খোদিত হবে এই নৃত্যের নাম, এমনই আশঙ্কা নরোত্তম রায়ের মতো সুদক্ষ কালিকাপাতাড়ি নৃত্য শিল্পীর। যদিও নরোত্তম বাবু ও তাঁর মতো প্রত্যন্ত গ্রামের কিছু মানুষ নিজ পেশাকে বজায় রেখে আজও সারা দেশের বুকে হাওড়া জেলার এই অনন্য গৌরবকে তুলে ধরে চলেছেন শিব-কালীর উদ্দাম মোনোমুগ্ধকর নৃত্যের মধ্য দিয়ে।

লাল-নীল-গেরুয়া...! 'রঙ' ছাড়া সংবাদ খুঁজে পাওয়া কঠিন। কোন খবরটা 'খাচ্ছে'? সেটাই কি শেষ কথা? নাকি আসল সত্যিটার নাম 'সংবাদ'! 'ব্রেকিং' আর প্রাইম টাইমের পিছনে দৌড়তে গিয়ে দেওয়ালে পিঠ ঠেকেছে সত্যিকারের সাংবাদিকতার। অর্থ আর চোখ রাঙানিতে হাত বাঁধা সাংবাদিকদের। কিন্তু, গণতন্ত্রের চতুর্থ স্তম্ভে 'রঙ' লাগানোয় বিশ্বাসী নই আমরা। আর মৃত্যুশয্যা থেকে ফিরিয়ে আনতে পারেন আপনারাই। সোশ্যালের ওয়াল জুড়ে বিনামূল্যে পাওয়া খবরে 'ফেক' তকমা জুড়ে যাচ্ছে না তো? আসলে পৃথিবীতে কোনও কিছুই 'ফ্রি' নয়। তাই, আপনার দেওয়া একটি টাকাও অক্সিজেন জোগাতে পারে। স্বতন্ত্র সাংবাদিকতার স্বার্থে আপনার স্বল্প অনুদানও মূল্যবান। পাশে থাকুন।.