স্বরলিপি দাশগুপ্ত: কলকাতার প্রাচীন মন্দির কালীঘাট সতীপীঠ হিসেবে পরিচিত। পুরাণমতে এখানে সতীর ডান পায়ের কনিষ্ঠ অঙ্গুলি পড়েছিল। দীর্ঘকাল সেই মন্দিরে সন্ন্যাসীরা পুজো করেছেন বলে শোনা যায়। কালীঘাট মন্দির নিয়ে আরও বেশ কিছু বিষয় প্রচলিত রয়েছে। যেমন জানা যায় কালীঘাট মন্দির নির্মাণের জন্য অর্থ দিয়েছিলেন সেই সময়ে (১৮০৯) কলকাতার এক বাবু কালীপ্রসাদ দত্ত। এই বাবুর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে সেই সময়ে কলকাতার অন্যতম ঘটনা কালীপ্রসাদী হাঙ্গামা। তবে এই তথ্যএর জন্য কেবল রাধারমণ মিত্র ও প্রাণকৃষ্ণ দত্তের কলকাতা সম্পর্কিত লেখার উপরে নির্ভর করতে হয়।

কালীপ্রসাদ দত্ত ছিলেন চূড়ামণি দত্তের ছেলে। উত্তর ২৪ পরগণা জেলার সাঁইবনা গ্রাম থেকে কলকাতায় আসেন নবাব সিরাজদ্দৌলার কলকাতা দখলের পরে। গ্রে স্ট্রিটের (বর্তমানে অরবিন্দ সরণি) উত্তর দিকে ছিল চূড়ামণি দত্তের প্রাসাদপ্রমাণ বাড়ি। সেই বাড়িকে লোকজন বালাখানা বলতেন। ফারসি শব্দ বালাখানার অর্থ উঁচুবাড়ি। গ্রে স্ট্রিটের দক্ষিণে ছিল মহারাজা নবকৃষ্ণ দেবের বাড়ি। প্রতিবেশী হলেও দুইজনের মধ্যে ছিল প্রবল প্রতিদ্বন্দ্বিতা। কেউ যে কারও থেকে কম নন, সেটি দেখাতে উদ্যত থাকতেন।

সেই সময়ে মরণাপন্ন মানুষ চাইতেন গঙ্গাবক্ষে ডুবে থেকে মৃত্যুবরণ করবেন। গঙ্গায় ডুবে থেকে ঈশ্বরের নাম জপ করতে করতে মৃত্যুর মধ্যে পুণ্য খুঁজে পেতেন। একদিন চূড়ামণিও বুঝলেন তাঁর মৃত্যু আসন্ন। তখন তাঁর দেহ নিয়ে বিপুল জনতা মহারাজা নবকৃষ্ণের বাড়ি সামনে দিয়ে ঢোল, শিঙে বাজাতে বাজাতে গঙ্গার উদ্দেশ্যে যাত্রা করলেন। এতে নাকি বেশ অপমানিত বোধ করেন নবকৃষ্ণ। এরপরেই চূড়ামণির শ্রাদ্ধের আয়োজন করা হল। কিন্তু সেই শ্রাদ্ধ অনুষ্ঠানে বাধ সাধলেন মহারাজা নবকৃষ্ণ দেব।

নবকৃষ্ণ তখন কলকাতার ব্রাহ্মণ ও কায়স্থদের চূড়ামণির শ্রাদ্ধে যেতে না করে দেন। বিপাকে পড়েন ছেলে কালীপ্রসাদ দত্ত। তখন তিনি রামদুলাল সরকারের শরণাপন্ন হন। রামদুলাল বড়িষার সাবর্ণ চৌধুরী সন্তোষ রায়কে বলে তাঁদের অনুগত ব্রাহ্মণ ও কায়স্থদের শ্রাদ্ধে নিয়ে আসেন। এবং তখন কালীপ্রসাদ পিতৃদায় থেকে মুক্ত হন। কালীপ্রাসাদ ২৫ হাজার টাকা দক্ষিণা দিতে গেলে, এই ব্রাহ্মণরা বদনামের আশঙ্কায় তা নিতে অস্বীকার করেন। অবশেষে ধর্মীয় কোনও সৎকাজে ব্যবহার করার জন্য সন্তোষ রায়ের হাতে সেই ২৫ হাজার টাকা তুলে দেন কালীপ্রসাদ। সন্তোষ রায় সেই টাকা দিয়েই কালীঘাটের মন্দির নির্মাণ শুরু করেন। ১৮০০ সালে সেই নির্মাণ শেষ করেন তাঁর ছেলে রামদুলাল রায়।

এরই মধ্যে অর্থাৎ ১৭৯৭ থেকে ১৮০১ এর মধ্যেই ঘটে যায় কালীপ্রসাদী হাঙ্গামা। কালীপ্রসাদ দত্ত নাকি একের পরে এক অহিন্দু আচরণ শুরু করেন। আর তাই তখনকার গোঁড়া হিন্দুরা তাঁকে একঘরে করেছিলেন। জানা যায়, তিনি লখনউ-এর এক মুসলিম মহিলাকে উপপত্নী হিসেবে বেলেঘাটার বাগানবাড়িতে এনে রেখেছিলেন। সেই মহিলার নাম ছিল বিবি আনারো। সেই সময়ে নাকি কালীপ্রসাদ দত্ত মুসলিমদের মতো পোশাক পরতেও শুরু করেন এবং গোমাংস খান বলেও দাবি ওঠে। যে বাগানবাড়িতে বিবি আনারোর সঙ্গে থাকতেন, সেটি তাঁকেই দান করেছিলেন কালীপ্রসাদ। এই বিবি আনারোকে পরে বিয়ে করেন মুনশিবাজারের মুনশি আমির। পরবর্তী কালে এই বাগানবাড়ি পশ্চিমবঙ্গ সরকারের সম্পত্তির আওতায় আসে।

তথ্যঋণ– কলিকাতা দর্পণ (রাধারমণ মিত্র), ইন্টারনেট

পচামড়াজাত পণ্যের ফ্যাশনের দুনিয়ায় উজ্জ্বল তাঁর নাম, মুখোমুখি দশভূজা তাসলিমা মিজি।