সৌপ্তিক বন্দ্যোপাধ্যায়: না আছে জমিদারি না আছে সামর্থ্য। তবু টিকে রয়েছে জমিদার বাড়ি। এমনকি ৪০০ বছরের পুরনো দুর্গা পুজোর ভরসাও এখনও ফিল্মের শ্যুটিং বাবদ পাওয়া অর্থ। পথটা দেখিয়েছিলেন বিশ্ববরেণ্য পরিচালক মৃণাল সেন। সেই পথ ধরেই আজ দাঁড়িয়ে রয়েছে ‘কালিকাপুর রাজবাড়ি’র কিছু ঐতিহ্য , অল্প পরম্পরা।

মৃণাল সেন পরিচালিত ‘খন্ডহর ’ সিনেমায় শহর থেকে গ্রামে বেড়াতে আসে তিন বন্ধু। নাসিরউদ্দিন শাহ, পঙ্কজ কাপুর ও অনু কপূর ভগ্ন জমিদার বাড়ির দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করে , “বাড়ি রক্ষণাবেক্ষণ হয় কী করে?” অজান্তে উত্তর দিয়েছিল মৃণাল সেন পরিচালিত ছবি ‘খন্ডহর’। সেনবাবুর সেই সিনেমাই প্রকৃত পক্ষে টিকিয়ে রেখেছে পূর্ব বর্ধমানের কালিকাপুর রাজবাড়িকে৷ সিনেমার শুটিং থেকে রোজগারের অংশ দিয়ে দুর্গাপুজোও হয়।

আজ থেকে প্রায় ৪০০ বছর আগে বর্ধমান রাজার দেওয়ান ছিলেন পরমানন্দ রায়। সেই সূত্রে ইজারায় হাতে এল বিরাট জঙ্গল। জঙ্গল কেটে তৈরি হল বসত বাড়ি। পেলেন আউশগ্রামের বড় অংশের জমিদারি। তৈরি হল পুকুর, বাগান, মন্দির, দুর্গামণ্ডপ। তারপর সাত পুত্রের জন্য সাতমহলা প্রাসাদ তৈরি করলেন। আদতে তাঁরা ছিলেন পাশের গ্রাম মৌখিরার বাসিন্দা। সেখানে থাকার সমস্যা, বন্যার প্রকোপ এড়াতে চলে আসেন কালিকাপুরে। সেই থেকেই পরিবারের রমরমা। সময়ের সঙ্গে অনেক কিছুই গিয়েছে কিন্তু তবে থেকে গিয়েছে কিছু ঐতিহ্য । সৌজন্যে মৃণাল সেন এবং তাঁর সিনেমা ‘খন্ডহর’।

রাজবাড়ির জৌলুস নিস্তেজ হয়ে গেলেও এখনও জমজমাট , সৌজন্যে সিনেমাওয়ালাদের ভিড়। বছরভর এখানে সিনেমার শ্যুটিং হয়। সেই সিনেমার শুটিংই কালিকাপুর রাজবাড়ি ও দুর্গাপুজো বাঁচিয়ে রেখেছে৷ শুটিং করার জন্য বাড়ি ভাড়া বাবদ যে টাকা পাওয়া যায় তা দিয়ে বাড়ি রক্ষণাবেক্ষণসহ পুজোর কাজে খরচ করা হয়৷ ‘খন্ডহর’-এর পর থেকে অর্পনা সেনের ‘গয়নার বাক্স ’, ‘গোঁসাই বাগানের ভূত’, ‘হনুমান ডট কম ’, ঋতুপর্ণ ঘোষের ‘নৌকাডুবি ’হরনাথ চক্রবর্তীর ‘ভূতচক্র ডট কম’, অমিতাভ বচ্চন অভিনীত ‘Teen’, পাওলি দাম অভিনীত ‘এলার চার অধ্যায়’সহ এমন বহু সিনেমার শুটিং এই বাড়িতে হয়েছে। এমনকি ইতালির পরিচালক ইলাম্বো লাম্বোর্তিনি এখানে একটি তথ্যচিত্রের শ্যুটিংও করেন৷ সম্প্রতি রাইমা সেন ও ভিক্টর বন্দ্যোপাধ্যায় অভিনীত সিনেমার শুটিংও হয়েছে৷ প্রচুর বাংলা সিরিয়ালের শুটিং হয় এখানে৷

সাতমহলা বাড়ির পাশাপাশি রয়েছে বিশাল দরদালান, মধ্যে ফাঁকা আটচালা আর তিন দিক ঘেরা মন্ডপ। প্রায় ৩৮০ বছর আগে এখানেই দুর্গাপুজো শুরু করেছিলেন পরমানন্দ রায়। রাজত্ব না থাকলেও রাজার বাড়ির পুজোর সমস্ত আদব কায়দা এখনও বজায় রেখে চলেন বর্তমান প্রজন্ম৷ কর্মসূত্রে পরিবারের অধিকাংশ সদস্যই বছরভর বাইরে থাকেন। তবে পুজোর সময় তাঁরা ঠিক কালিকাপুরে হাজির হন তাঁদের পরিবারের দূর্গোৎসবে অংশ নিতে।

তবে চারদিন নয়। একসময় বর্ধমান রাজবাড়ি থেকে কালিকাপুর রায় বাড়িতে তত্ত্ব আসত৷ পুরোনো রীতি মেনে এখনও পালকিতে চাপিয়ে কলাবউকে স্নান করাতে নিয়ে যাওয়া হয়। আগে ১৫ দিন ধরে ছাগবলি হতো। এখন সপ্তমী থেকে নবমী মাত্র তিনদিনই হয় ছাগবলি। নবমীর দিন অসংখ্য মানুষ প্রসাদ নিতে আসেন। বাড়ির এই পুজোতে একসময় নাটমন্দির আলোকিত হত বিশাল বিশাল ঝাড়বাতিতে। পুজোর ক’দিন নিয়ম করে বসত কবিগানের আসর, দুর্গাপুজোয় যাত্রাপালা মাস্ট ছিল কালিকাপুর রাজবাড়িতে। পালা দেখতে ভেঙে পড়ত গ্রাম। বাড়ির মেয়েরা যাত্রা দেখতেন দোতলার আড়াল থেকে।

পরিবারের কেউ চাকরি করেন, কেউবা গ্রামেই চাষ করেন৷ বাড়ি রক্ষণাবেক্ষণ প্রচণ্ড ব্যয় সাপেক্ষ৷ অনেক জায়গায় দেওয়ালের পলেস্তরা খসে পড়ে গেছে৷ ছাদ ভেঙে পড়েছে৷ বেশিরভাগ ঘটনাই এখন অতীত। তবু কিছু রয়ে গিয়েছে। ভরসা লাইট , ক্যামেরা, অ্যাকশন। পথটা দেখিয়েছিলেন মৃণাল সেন। তাঁর দেখানো পথ বাঁচিয়ে রেখেছে রাজ বাড়িকে।

ছবি সৌজন্য – প্রণব ভট্টাচার্য (আঞ্চলিক ইতিহাসবিদ)