বিটলস-পিংক ফ্লয়েড ভুলে সবাই যেন মোহিত হয়ে গিয়েছিল তাঁর মাটির গল্পে…

স্বরলিপি দাশগুপ্ত: ২৫ মার্চ, ২০১৫। আজও মনে আছে দিনটা। সুযোগ হয়েছিল শিল্পী কালিকাপ্রসাদের সান্নিধ্য পাওয়ার। স্নাতকোত্তরে ‘ফোক মিডিয়া’ নিয়ে একটি পেপার ছিল। ওয়ার্কশপ করাতে শিল্পী এসেছিলেন আমাদের ক্লাসরুমে। ক্লাসের সবার সঙ্গে পরিচয় করে দেওয়ার ভারটা পড়েছিল আমার উপরই। আগের দিন থেকে তৈরি করা হয়েছিল কালিকাপ্রসাদের জন্য ‘Introduction speech’। ইংরেজি নবিশ কলেজ। তাই পরিচয় পর্ব শেষ হল ইংরেজিতেই। কিন্তু কালিকাপ্রসাদ মনে করিয়ে দিলেন আমাদের সেদিনের বিষয় ‘লোক শিল্প’। তাই হাতে মাইক নিয়ে প্রথমেই বললেন “সবাই বাংলা বোঝ তো? আমি কিন্তু বাংলায় বলব”। সত্যিই তো অন্য দেশের ভাষা দিয়ে কি আর নিজের দেশের মাটির কথা বলে বোঝানো যায়? সেই মত বাংলাতেই শুরু হল সেদিনের ক্লাস।

সেই ২৫ মার্চ…

ক্লাস হলেও ক্লাসরুম সুলভ কোনও ব্যাপার ছিল না। গল্পের ছলে শিল্পীর মুখে উঠে আসছিল বিভিন্ন অঞ্চলের লোক শিল্পের কথা। তাঁর মুখে মাটির কথা শুনতে শুনতে মুগ্ধ হয়ে গিয়েছিল ক্লাসের ‘শহুরে’ ছেলেমেয়েগুলোও। আমার এক হিন্দিভাষী বন্ধুকেও সমস্তটাই অনুবাদ করে দিচ্ছিল আমার পাশে বসা আর এক বন্ধু। যে ছেলে মেয়েগুলোর মুখে শুধুই মেটাল, রক, ব্লুজ, জ্যাজ, পিঙ্ক ফ্লয়েড, বিটলস্‌, কোল্ড প্লে- এসব গালভরা নাম ঘোরাফেরা করে, কংক্রিটের চারদেওয়ালের মাঝে তারাও যেন কেমন মাটির গন্ধ পেয়েছিল সেদিন। সবাই স্বতস্ফূর্ত ভাবে নিজেকে জড়িয়ে নিয়েছিল কালিকাপ্রসাদের সঙ্গে। এমনকি শিল্পী সেদিন আসবে বলে যে যার ভায়োলিন-গিটার নিয়েও হাজির হয়েছিলেন সেদিন।

তখন আমাদের স্নাতকোত্তরের দ্বিতীয় বর্ষ। অনেকেই তখনও ঠিক করতে পারেননি যে প্যাশন নাকি প্রয়োজন কোন দিকটাকে বেছে নেবেন? কালিকাপ্রসাদ সেদিন বলেছিলেন যে প্যাশনকেই বেছে নিয়েছেন তিনি।

শুধু লোকশিল্প নিয়ে কথাবার্তাই নয়, বিভিন্ন অঞ্চলের লোকগীতি গেয়ে শুনিয়েছিলেন তিনি। ইংরেজি নবিশ ক্লাসরুমের পরিবেশটা এক নিমেশে পালটে ফেলেছিলেন। ছাত্রছাত্রীরাও গান গেয়ে শুনিয়েছিল তঁকে। শিল্পীর সামনে গান গাওয়ার সুযোগ হয়েছিল আমারও। রীতিমত ‘জ্যামিং’ যাকে বলে তাই হয়েছিল সেদিন দোহারের কালিকাপ্রসাদের সঙ্গে।

যাকে শুধুই সঙ্গীতশিল্পী কালিকাপ্রসাদ হিসেবে চিনতাম, সেদিন বোঝা গেল তিনি একজন গবেষক ও শিক্ষকও। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর কিভাবে লোকগীতিকে নিজের গানের সঙ্গে মিশিয়ে দিয়েছিলেন, লালন গীতি, কীর্তন, বিহু, বাউলের দেহতত্ত্ব সমস্তই সেদিন উঠে এসেছিল তাঁর কথায়। অজানা বিষয়গুলো গল্পের মতো এমন ভাবে আমাদের মধ্যে ছড়িয়ে দিয়েছিলেন যে ক্লাসরুমের ‘বোরড’ হয়ে যাওয়া কি, এক নিমেষে ভুলে গিয়েছিলেম। কয়েক ঘণ্টায় যেন নিজের দেশের সংস্কৃতি সম্পর্কে কতকিছু শিখে গিয়েছিলাম সেদিন। নিজেদের দেশের সংস্কৃতি যে এত সমৃদ্ধ সেটা একদিনেই মনের মধ্যে ঢুকিয়ে দিয়েছিলেন কালিকাপ্রসাদ। কিন্তু বাকি থেকে গেল অনেকটা। আর ১৮ দিন বাদে কালিকাপ্রসাদের সঙ্গে সাক্ষাতের দু’বছর পূর্ণ হত। কিন্তু তাঁর আগেই আজ সকালে তাঁর চলে যাওয়ার খবর। কেমন যেন তার ছিঁড়ে গেল। টেলিভিশনে শুধু প্রিয় শিল্পীর নিথর দেহ।

তবে শিল্পের মৃত্যু হয় না। শিল্পীরও না। তাই মাটির গানে-গন্ধে বেঁচে থাকবেন শিল্পী। আপাতত ‘প্লেলিস্টে’ বাজুক শুধু কালিকারই গান।