সৌপ্তিক বন্দ্যোপাধ্যায়, হাওড়া: প্রবল ঝড়ের প্রকোপে এলাকায় বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন। তাই অগত্যা আঁধারেই মায়ের আরাধনা হল। পুজো হল ফলহারিনী কালী পুজো। বৃহস্পতিবার ছিল ফলহারিনী পুজো। আর তা হল অন্ধকারেই। প্রামাণিক বাড়িতে বিখ্যাত কালী পূজা। কার্তিক মাসের কালী পূজায় প্রথা অনুসারে কুমোরটুলি থেকে দো-মেটে করে পুজোর কিছুদিন আগে ঠাকুর নিয়ে আসা হয় তারক প্রামাণিক রোডের ঠাকুরবাড়িতে।

এখানে আসার পর ঠাকুরের গায়ে রং হয়। পুজোর আগের দিন ভেজানো পাঁচকলাই আর ধান বিছিয়ে দেওয়া হয় ঠাকুরের চৌকির তলার মাটিতে। এরপর ঠাকুরকে চৌকিতে তোলা হয়। পুজোর আগে থেকেই সমস্ত উপকরণ তৈরি করার কাজ শুরু করেন বাড়ির মেয়েরা। মঙ্গলঘট, বরণডালা সাজানো হয়। ১০৮ টা দুর্বা আর ১০৮ টা চাল তুলোর মধ্যে দিয়ে লাল সুতো দিয়ে সিঁদুরে মাখিয়ে অর্ঘ্য তৈরি হয় । দেবীকে অর্পণ করার পর সেটি তুলে নেওয়া হয়। এই বাড়িতে অর্ঘ্যের বিসর্জন হয় না। বহু মানুষ আসেন এই বাড়ি থেকে অর্ঘ্য নিতে।

ঠাকুরের আশীর্বাদী হিসাবে নিজেদের কাছে রাখেন তাঁরা প্রিয়জনের অসুস্থতা সারাতে বা মনস্কামনা পূর্ণ করতে। পুজোর দিন সকাল থেকে বাড়ির মেয়ে বউরা ঠাকুর সাজান। সাতটি জ্ঞাতি ঘর থেকে পাওয়া সোনা রুপোর গয়না, রুপোর মুকুট , সোনার মুকু‌ট খাঁড়া-সহ বেশ কিছু অলংকার আছে। সেগুলি সবই পরানো হয় দেবীকে। কাচের কিছু পুরনো ফানুস এখনও আছে বাড়িতে। পুজোর সময় সেগুলিও জ্বালানো হয় ঠাকুরদালানের দু’পাশে।

ঠাকুরমশাই পুজোর সময় নিজের বাড়ির নারায়ণ এই বাড়িতে নিয়ে এসে ঠাকুরদালানে বসান। তাঁর পাশে বসেন প্রমাণিক বাড়ির নিত্যপূজিতা ধান্যলক্ষ্মী। পুজোর সময় ১৬ থেকে ১৭ টি নৈবেদ্য চাল, কলা , মিষ্টি , নারকেলের মণ্ডা পানের খিলি দিয়ে সাজিয়ে দেওয়া হয়। এ ছাড়াও ছোট ধামায় দেওয়া হয় পাঁচকলাই আর ছোলা ভিজানো। নুন ছাড়া পাঁচরকম ভাজা, লুচি দেওয়া হয় ঠাকুরকে। এই বাড়িতে পুজোর সময় যাঁদের মনস্কামনা থাকে তাঁরা দণ্ডী কেটে আসেন । বুক চিরে রক্ত দেন অনেক ভক্তই।

এছাড়াও নারী পুরুষ নির্বিশেষে যাঁরা মানত করেন পুজোর দিন তাঁরা ধুনো পোড়ান। এর পর দালানের সামনে ২৮ টি প্রদীপ খড় দিয়ে সাজিয়ে দেওয়া হয়। তারপর শুরু হয় হোম। আগে পুজোতে পাঁঠাবলি আর মোষবলি হত। স্থানীয় মানুষ বিশ্বাস করতেন বলির সময় দেবী এগিয়ে আসতেন। তাই পুরোহিতের বিধানে বিগ্রহকে বলির সময় সোনার শিকল দিয়ে আটকে রাখা হত। বলি হয়ে যাওয়া মাত্র বলির সামগ্রী তাঁর সামনে সাজিয়ে দেওয়া হত। এখন অবশ্য এই বাড়িতে আর বলি হয় না।

কালীপুজোর পরে তিথি অনুযায়ী এখানে যন্ত্র পুজো হয়। লোহার জিনিস ঠাকুর দালানে সাজিয়ে সেগুলিকে পুজো করা হয়। যন্ত্রপুজোর পর প্রামাণিকদের ঠাকুরদালানে বিজয়ার কোলাকুলি এবং মিষ্টিমুখ হয়। বাড়ির সদস্যরা জানাচ্ছেন , ‘মায়ের কাছে প্রার্থনা করলাম সকলের ভালো হোক ও পৃথিবীর উন্নতি হোক’।