স্টাফ রিপোর্টার, বাঁকুড়া: রাত পোহালেই কালীপুজো। মহানগর থেকে শহরতলি শুরু হয়েগিয়েছে জোরকদমে পুজো উদ্যোক্তাদের ব্যস্ততা। পিছিয়ে নেই জেলার পুজোও। জেলার বিভিন্ন ক্লাবের বারোয়ারি পুজো থেকে শুরু করে প্রাচীন কালীপুজো সব জায়গাতেই এখন সাজসাজ রব।

প্রাচীন পৌর-শহর হিসাবে কালী পুজোর আয়োজনে পিছিয়ে নেই বাঁকুড়া জেলাও। এই শহরের প্রান কেন্দ্র এবং ইতিহাস বিজড়িত সোনামুখী শহরেও ছোটবড় মিলিয়ে অসংখ্য কালীপুজো হয় ফি বছর। শুধু তাই নয় প্রাচীন এই জেলার ইতিহাস জানাচ্ছে জেলার ‘কালী ক্ষেত্র’ হিসেবে পরিচিত এখানকার অন্যতম প্রাচীন পুজোগুলির মধ্যে অন্যতম হল ‘হট্ নগর কালী’। সারা বছর এখানে নিত্য পুজো হলেও কার্তিকের অমাবস্যায় তিথি মেনে বিশেষ বাৎসরিক পুজো হয় এখানে।

জানা গিয়েছে, সোনামুখীর অন্যান্য প্রাচীন পুজো গুলির মতো হট্ নগর কালীকে নিয়েও অনেক লোককথা প্রচলিত রয়েছে বহুকাল ধরে। সবচেয়ে জনপ্রিয় লোক কথা হলো, ‘সাড়ে চারশো বছর আগে সোনামুখী ছিল জঙ্গলাকীর্ণ। আর তাছাড়া সেই সময়কালে বিনিময় প্রথা চালু ছিল’। সোনামুখীর তারিণী সূত্রধর নামে এক বৃদ্ধ প্রতিদিন জঙ্গল পথ পেরিয়ে পায়ে হেঁটে মাথায় ঝুড়িতে করে বড়জোড়ার নিরশা গ্রামে চিঁড়ে বিক্রি করতে যেতেন। লোককথা অনুসারে, সেই চিঁড়ে বিক্রি করে পাওয়া ধান নিয়ে তিনি আবারও পায়ে হেঁটেই সোনামুখী ফিরে আসতেন। যাওয়া-আসার পথে পড়তো একটি খাল। বৃদ্ধা তারিণী সূত্রধর বাড়ি ফেরার পথে সেই খালের পাশে খানিক বিশ্রাম নিয়ে সঙ্গে থাকা চিঁড়ে মুড়ি খেতেন। সেখানে প্রায় দিনই লাল পাড় শাড়ি পরা একটি ছোট্ট শ্যামাঙ্গী মেয়ে তার সাথে সোনামুখী আসার জন্য বায়না করতো। জানা গিয়েছে, বৃদ্ধা প্রতিদিনই কিছু না কিছু বলে ওই ছোট্ট কন্যা শিশুটিকে বিরত থাকতেন। শেষে এক দিন সে জেদ ধরে বসলো। বৃদ্ধার সাথে সে সোনামুখী যাবেই যাবে। তখন নিরুপায় তারিণী সূত্রধর তাকে সঙ্গে নিয়ে যেতে সম্মত হলেন। কিছু দূর যাওয়ার পর ঐ ছোট্ট মেয়েটি বলে আমি আর হাঁটতে পারছিনা। আমাকে কোলে নাও। কিন্তু মাথায় আর কোলে ধানের ঝুড়ি আর বস্তা থাকায় বৃদ্ধা তার অসহায়তার কথা বললে, ওই শ্যামাঙ্গী এক রত্তি মেয়ে তার মাথার ঝুড়িতেই চাপার কথা বলে। নিরুপায় তারিণী সূত্রধর তাই করেন।

আরও পড়ুন – সোনামুখীতে মা-ই-তো কালী, জানুন প্রচলিত জনশ্রুতি

পরে তিনি বাড়ি ফিরে দেখেন ওই মেয়ে তো নেই। তার বদলে ঝুড়িতে রয়েছে দু’টি পাথর। ভয় পেয়ে তিনি সেই পাথর দু’টিকে তুলসীতলায় রেখে দেন। সেদিন রাত্রেই বৃদ্ধা তারিণী সূত্রধর স্বপ্নাদেশ পান, সেই শ্যামাঙ্গী ছোট্ট মেয়েটি তাকে বলছে, ‘আমার পুজোর ব্যবস্থা কর’। ‘তোর বাড়ির আঁকড় গাছের নিচে আমাকে রেখে আয়’। ‘আমি মা কালী, তোর ভার বইতে যাতে কোন কষ্ট না হয় তাই এই পাথর রুপে এসেছি’। ভয় পেয়ে পর দিন সকালে ওই বৃদ্ধা লালবাজার এলাকার মানুষকে সব কথা জানান। শুধু তাই নয়, সেই সময় ছোঁয়া-ছুঁয়ি আর জাতপাতের ঘটনা এতটাই তীব্র ছিল পুরোহিত পুজো করতে অস্বীকার করেন। গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েন পুরোহিত। জানা গিয়েছে, পরে তিনিও স্বপ্নাদেশ পেয়ে এই পুজো করতে রাজী হন। স্বপ্নাদেশে স্থানীয় জমিদার গিন্নী কাদম্বরী দেবী মন্দির নির্মাণের জন্য এক খণ্ড জমি ও পুজো পরিচালনার জন্য কিছু জমি দেন। তখন থেকেই এই পুজো এলাকার মানুষ পরিচালনা করছেন।

বর্তমানে বর্ধমানের এক সমাজসেবী অজিত সিংহ সুদৃশ্য মন্দির তৈরী করে দিয়েছেন।এই মন্দির নির্মাণেও অভিনবত্ত্ব রয়েছে। মূল মন্দিরের সামনে রাখা রয়েছে, তারিণী সূত্রধরের মাথায় ধানের ঝুড়িতে চেপে মা আসছেন তার মূর্তি। অন্য দিকে সিদ্ধপুরুষ হট্ যোগীর মূর্তি। সবার উপরে শিব। আজও প্রাচীণ সেই প্রথা মেনে সূত্রধররাই কেবল ঘট আনার অধিকারী। এই ঘট সারা বছর মন্দিরে রেখে পুজো করা হয়। পরে বছর বাৎসরিক পুজোর সময় সেই ঘট বিসর্জন দিয়ে নতুন ঘট আনা হয়।

‘হট্ নগর কালী’র নামকরণ নিয়ে এলাকায় দ্বিমত রয়েছে। কেউ কেউ বলেন, হট্ নামে এক যোগী পুরুষ এই কালীর পুজার্চণা করতেন। তাই এরূপ নামকরণ। আবার কেউ বলেন, মা কালী হঠাৎ এসেছিলেন। তাই হট্ নগর কালী নামকরণ হয়েছে। স্থানীয়রা জানিয়েছেন, মা কালীর নির্দেশে যে আঁকড় গাছের নিচে পাথর দু’টি রাখা হয়েছিল সেই গাছ আজও আছে। আশ্চর্য্যের বিষয় সেই গাছে কোন কাঁটা নেই। এমনকি ঐ গাছের আদি মূলের কোন খোঁজ পাওয়া যায়নি। আর পাথর দু’টি আজও সেই আঁকড় গাছের নিচে রেখে পুজার্চণা করা হয়। তবে আশ্চর্য্যের বিষয় ঐ পাথর দু’টি ঋতুভেদে রং পরিবর্তন হয়। এমনটাই দাবী স্থানীয়দের।

এই মন্দির নির্মাণেও অভিনবত্ত্ব রয়েছে। মূল মন্দিরের সামনে রাখা রয়েছে, তারিণী সূত্রধরের মাথায় ধানের ঝুড়িতে চেপে মা আসছেন তার মূর্তি। অন্য দিকে সিদ্ধপুরুষ হট্ যোগীর মূর্তি। সবার উপরে শিব।

এখানকার বর্তমান পুরোহিত অসিত ভট্টাচার্য বহুচর্চিত হটনগর কালীর ইতিহাস বর্ণণা করে বলেন, কালী পুজোর জন্য বিখ্যাত সোনামুখী। তবে ৪৫০ বছরের প্রাচীণ ও পরম্পরা মেনে এখনো হটনগর কালীর পুজো হয় বলে তিনি জানান।

প্রশ্ন অনেক-এর বিশেষ পর্ব 'দশভূজা'য় মুখোমুখি ঝুলন গোস্বামী।