সৌপ্তিক বন্দ্যোপাধ্যায়, কলকাতা : শরীর এখানে থাকলেও তাঁর মন থাকত গুরাপে। তাই কলকাতায় বিখ্যাত গণিতবিদের বিশেষ স্মৃতি কিছুই নেই। তাঁর ইহ জীবনের মতোই পরলোক জীবনেও তাঁর সবকিছুই থেকে গিয়েছে হুগলীর পৈতৃক বাড়িতেই। কেশব চন্দ্র নাগ , ১০ই জুলাই, ১৮৯৩ বাংলাভাযায় গণিতের সর্বাধিক প্রচলিত বিদ্যালয়স্তরের পাঠ্যপুস্তকের রচয়িতার হুগলির গুড়াপের নাগপাড়ায় জন্ম। তারপর কাজের সূত্রে এসেছেন কলকাতায়। থেকেওছেন এই শহরে কিন্তু মন পরে থেকেছে এই গুরাপেই।

রথযাত্রার দিন জন্মগ্রহণ করেন কেশব চন্দ্র নাগ। পিতা রঘুনাথ নাগ ও মাতা ক্ষীরোদাসুন্দরী। শৈশবেই পিতৃহারা হন। মা ক্ষীরোদাসুন্দরীই সন্তানদের মানুষ করার দায়িত্ব পালন করেন। পড়াশোনা শুরু হয় গুড়াপের একমাত্র বাংলা বিদ্যালয়ে। সপ্তম শ্রেণী থেকে বাড়ি থেকে তিন মাইল দূরের ভাস্তাড়া যজ্ঞেশ্বর উচ্চ বিদ্যালয়ে পড়াশোনা। নবম শ্রেণীতে আবার বিদ্যালয় পরিবর্তন, কিষাণগঞ্জ হাইস্কুল। এখান থেকেই ১৯১২ সালের প্রবেশিকা পরীক্ষায় প্রথম বিভাগে উত্তীর্ণ হন। প্রবেশিকা উত্তীর্ণ হয়ে তিনি কলকাতায় এসে ১৯১৪ সালে রিপন কলেজ ( অধুনা সুরেন্দ্রনাথ কলেজ) থেকে আইএসসি প্রথম বিভাগে পাশ করেন। প্রবেশিকা পরীক্ষার পর থেমে কেশব চন্দ্র নাগের বাকি জীবন কেটেছে কলকাতায়।

তিনি মহাবিদ্যালয়ে পড়ার সময়ে গৃহশিক্ষকতার শুরু করেন। ভাস্তাড়া যজ্ঞেশ্বর উচ্চ বিদ্যালয়ে থার্ড মাস্টার হিসাবে কর্মজীবনের শুরু। কিছুদিনের মধ্যেই সংসারের দায়িত্ব সামলেও চাকরি ছেড়ে অঙ্ক ও সংস্কৃত নিয়ে বিএ পাশ করেন। এরপর অঙ্কের শিক্ষক হিসাবে কিষেণগঞ্জ হাইস্কুল যোগ দিলেন। পরবর্তীতে বহরমপুর কৃষ্ণনাথ কলেজিয়েট স্কুলে যোগ দেন। অঙ্কের শিক্ষক হিসাবে তাঁর সুখ্যাতি স্যার আশুতোষ মুখোপাধ্যায়ের কানে আসলে তিনিই কেশবচন্দ্রকে ভবানীপুরের মিত্র ইনস্টিটিউশনে অঙ্কের শিক্ষক হিসাবে নিয়ে আসেন। সুদীর্ঘ কর্মজীবন শেষে এখান থেকেই তিনি প্রধানশিক্ষক হিসাবে অবসর গ্রহণ করেন। এই সময়ে কলকাতায় প্রথমদিকে রসা রোডে মেসে ভাড়া থাকতেন। পরে ১৯৬৪ সাল থেকে থাকতে শুরু করেন দক্ষিণ কলকাতার গোবিন্দ ঘোষাল লেনে নিজস্ব বাড়িতে।

তিরিশের দশকের মাঝামাঝি প্রকাশক ইউএন ধর অ্যান্ড সন্সের মাধ্যমে প্রকাশিত হল নব পাটীগণিত। কিছুদিনের মধ্যেই পঞ্চম-ষষ্ঠ শ্রেণীর ছাত্রছাত্রীদের মধ্যে অসম্ভব জনপ্রিয় হয়ে পড়ে বইটি। পাঠ্যপুস্তক হিসাবেও স্বীকৃত হয়। ১৯৪২ সাল নাগাদ ক্যালকাটা বুক হাউসের পরেশচন্দ্র ভাওয়ালের আগ্রহাতিশয্যে কেশবচন্দ্রের বাঁধানো অঙ্কের খাতা প্রকাশিত হয় অঙ্কের সহায়িকা ম্যাট্রিক ম্যাথমেটিক্স নামে। বইটি বিশাল জনপ্রিয় হয়। একে একে আরও অঙ্কের বই প্রকাশিত হয়। ধীরে ধীরে ইংরেজি, হিন্দি, নেপালি, উর্দু ইত্যাদি ভাষায় অনুদিত হয় তাঁর বই। গণিতের বইয়ের অসম্ভব জনপ্রিয়তা দেখে ১৯৫৫ সালে তিনি নাগ পাবলিশিং হাউস নামে নিজের প্রকাশনা সংস্থা খোলেন। দীর্ঘ সাফল্যের জীবন কলকাতাতেই।

বই বিক্রি থেকে পাওয়া রয়্যালটির টাকার একটা বড় অংশ দেওয়া হয় দুটি চ্যারিটি ফান্ডে; একটি তাঁর নিজের নামে, অন্যটি তাঁর স্ত্রী লক্ষ্মীমণির নামে। এই যে অর্থ তা থেকে কখনও মেয়েদের জন্য স্কুল বানিয়েছেন। কখনও ছেলেদের জন্য স্কুল বানিয়ে দিয়েছেন। ফুটবল ভালোবাসতেন তাই ওনার নামে গুরাপে শিল্ড হয়। সবই যা আছে ওনার গ্রামেই। জন্মদিনে তাঁর কলকাতার বাড়িতে পৌঁছে গিয়েছিল kolkata24x7

আর পাঁচটা দিনের মতোই সাধারণ। বিশেষ কোনও আয়োজন নেই। ভুল ভাঙলেন নাতনী রত্না বন্দ্যোপাধ্যায়। তিনি বলেন, “দাদুর জন্মদিন নয় তিথি পালন করি আমরা। আসলে এটাই হয়ে এসেছে। আগে ঠাকুমাকে দেখেছি। পরে বাবা এখন আমরা ভাই বোনেরা মিলে দাদুর জন্মতিথি পালন করি রথের দিন। তাই আজ আর আয়োজন হয় না। গুরাপে রামকৃষ্ণ মিশন দাদুর জন্মদিন পালন করে। নবান্নে গত বছর এই দিনেই অনুষ্ঠান করা হয়েছিল।” বাড়িতে কেশবচন্দ্রের কিছু স্মৃতি চিহ্ন রয়েছে?

রত্না দেবী জানালেন, “অনেক কিছুই ছিল। এটা সত্যি মানতেই হবে বাড়িতে রেখে কোনও স্মৃতি রক্ষা করার চেয়ে কোনও সংস্থাকে দিয়ে দেওয়াই ভালো। বাড়িতে সব সময় সঠিক যত্ন নাও হতে পারে। প্রত্যেক প্রজন্ম এর গুরুত্ব নাও বুঝতে পারে। তাই দাদুর সমস্ত কিছু লাঠি থেকে শুরু করে চশমা সব গুরাপের কেশব সংগ্রহসালায় দিয়ে দিয়েছি।” একইসঙ্গে তিনি বলেন, “শ্রীশ্রী মা সরাসরি দীক্ষা দিয়েছিলেন আর বিশুদ্ধাননন্দজীর শিষ্য ছিলেন। তাই ওই সংগ্রহশালা ওনার সবকিছু দেখাশোনা করে।” রত্না বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন, “এটা বলা যেতেই পারে উনি কলকাতায় কর্মজীবন কাটিয়েছেন কিন্ত ওনার মন সবসময়েই গ্রামে থেকেছে। উনি এখানে থাকলেও মন থেকেছে গুরাপে।”