সিদ্ধার্থ মুখোপাধ্যায় : জহরলাল নেহরুর চেয়ে বয়েসে প্রায় ১৫ বছরের ছোট ছিলেন জেআরডি টাটা৷ কিন্তু পরাধীন ভারতে জহরলালকে নেতা হিসেবে গুণমুগ্ধ প্রশংসা করলেও পরবর্তীকালে তাঁর সমাজতান্ত্রিক মনোভাবের জন্য ক্ষুব্ধ হয়েছিলেন টাটা গোষ্ঠীর এই কর্তা৷ এমনকি স্বাধীন ভারতে নেহরু বিরোধী স্বতন্ত্র পার্টিকে আর্থিক সহায়তা করতে দ্বিধা করেননি জেআরডি ৷ কারণ নেহরুর মনোভাব দেশের শিল্পবিকাশ ও উন্নয়নের পরিপন্থী বলেই মনে হয়েছিল তৎকালীন টাটাগোষ্ঠীর চেয়ারম্যানের৷

নেহরুর সমাজতান্ত্রিক মনোভাব বিশেষত প্রধানমন্ত্রী হয়ে ১৯৫৪ সালে চিনে যাওয়ার পর সেখানকার অবস্থা দেখে আরও বেশি করে উদ্বুদ্ধ হন৷ দ্বিতীয় পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনায় এর জোরালো প্রভাবে প্রধান প্রধান শিল্পকে জাতীয়করণ করার উদ্যোগ নেওয়া হয়৷ সেই সময় নেহরু জানিয়েছিলেন, মুনাফা কথাটাই তাঁর পছন্দ নয়৷ যদিও তখন জেআরডি তাঁকে রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থারও মুনাফা করার দিকটা বোঝাতে চান ৷ তার জবাবে নেহরু জানিয়েছিলেন, তাঁর কাছে মুনাফা একটা নোংরা শব্দ৷

তাছাড়া ১৯৫৭ সালের সাধারণ নির্বাচনে দেখা গিয়েছিল ভারতীয় কমিউনিস্ট পার্টি (কমিউনিস্ট পার্টি অফ ইন্ডিয়া) দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম দল হিসেবে ক্রমশ শক্তি বৃদ্ধি করছে লোকসভায় ৷ তার আগের নির্বাচনে দ্বিতীয় বৃহত্তম দলটি ভারতীয় কমিউনিস্ট পার্টি বা সিপিআই হলেও তাদের ঝুলিতে ছিল মাত্র ১৬টি আসন৷ কিন্তু দ্বিতীয় সাধারণ নির্বাচনে বামদলটির আসন সংখ্যা আরও কিছুটা বেড়ে গিয়ে দাঁড়ায় ২৭টি ৷ ওই পরিস্থিতিতে জেআরডি আশংকা করেছিলেন, কমিউনিস্টদের উত্থান এদেশে অবাধ শিল্পবিকাশের অন্তরায় হবে৷ ফলে নেহরু যাই ভাবুন না কেন শিল্প সমর্থক কোনও রাজনৈতিক দলের উত্থান হওয়া দরকার যারা শিল্পোদ্যোগীদের সমর্থক ৷

এদিকে ৫০ দশকের শেষের দিকে প্রাক্তন গভর্নর জেনারেল রাজাগোপালাচারি নেহরু-কংগ্রেসের নীতির বিরোধিতা করতে শিল্পোদ্যোগীদের সমর্থক একটি রাজনৈতিক দল গড়তে উদ্যোগী হন ৷ ১৯৫৯ সালে তিনি তাঁর নব গঠিত স্বতন্ত্র পার্টিকে সমর্থন করার জন্য জেআরডি-কে অনুরোধ জানান৷ সেই সময় এভাবে রাজাজি সমর্থন পেলে স্বাভাবিক ভাবেই ক্ষুব্ধ হতে পারেন নেহরু আর সেই ব্যাপারে জেআরডি-কে সতর্ক করেছিল নওয়ল টাটা ৷ ফলে জেআরডি মাস দুয়েক সময় নেন রাজা গোপালাচারিকে তাঁর ইতিবাচক সাড়া দিতে ৷ তবে স্বচ্ছতা বজায় রাখতে তাঁর এই সিদ্ধান্তের কথা নেহরুকে জানিয়েছিলেন ৷ আর টাটাদের এমন মনোভাবের কথা শুনে নেহরুর প্রতিক্রিয়া ছিল, তবে টাটাদের আর কি কোনও কাজ নেই ?

এই ব্যাপারে জেআরডি তাঁর নিজের অবস্থান ব্যাখ্যা করে নেহরুকে জানান, দায়িত্বশীল সংগঠিত গণতান্ত্রিক বিরোধী দরকার এবং জাতীয় স্বার্থে কমিউনিস্টদের সরিয়ে সংসদে অন্য কোনও দ্বিতীয় বৃহত্তম দল আনা দরকার৷ এই কথা বলতে গিয়ে জেআরডি তখন বার্তা দেন, কংগ্রেসকে নির্বাচনের সময় যেমন আর্থিক সহায়তা করে থাকেন তা তাঁরা করবেন৷ পাশপাশি তুলনায় কম হলেও স্বতন্ত্র পার্টির তহবিলেও অর্থ সাহায্য করবেন৷ যদিও তার প্রেক্ষিতে নেহরুর জবাব ছিল, তিনি স্বাধীনভাবে তাঁর ইচ্ছে মতো স্বতন্ত্র পার্টির মতো অন্য কাউকে সহায়তা করতেই পারেন ৷ যদিও তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীর অভিমত ছিল, জেআরডি-র আশানিরুপ স্বতন্ত্র পার্টি প্রধান বিরোধী হিসেবে উঠে আসবে না৷

সেই দিক থেকে বলতে গেলে বাস্তবে টাটার বদলে নেহরুর ভবিষ্যৎ বাণীই যেন মিলেছিল কারণ কংগ্রেসের দক্ষিণপন্থী নেতাদের নিয়ে ১৯৫৯ সালে আত্মপ্রকাশ করলেও এই স্বতন্ত্র পার্টির মেয়াদ ছিল বছর পনেরো৷ ব্যবসায়ী শিল্পপতিদের সমর্থিত এই দলটি সমাজতন্ত্রের বদলে বাজার অর্থনীতির দিকে ঝুঁকেছিল৷

পাশাপাশি এই দলে জমিদার এবং রাজন্যবর্গের প্রতিনিধিদের যোগ দিতে দেখা যায়৷জন্মের পরে ১৯৬২ সালে প্রথম লোকসভা নির্বাচন লড়ে এই দলটি ৬.৮শতাংশ ভোট পেয়ে ১৮টি আসন জিতেছিল৷ তবে বিহার, রাজস্থান, গুজরাত এবং উড়িষ্যা এই চার রাজ্যে প্রধান বিরোধী দল হিসেবে উঠে এসেছিল৷ পরের বার ১৯৬৭ সালের সাধারণ নির্বাচনে স্বতন্ত্র দল শতকরা ভোট এবং আসন উভয়ই বাড়ায়৷ সেবার ৮.৭ শতাংশভোট পেয়ে ৪৪টি আসন দখল করে৷ এরপরে ১৯৭১ সালে স্বতন্ত্র দল প্রধানমন্ত্রীইন্দিরা গান্ধীকে হারাতে জনসংঘ এবং কংগ্রেস(ও) সঙ্গে জোট বাঁধলেও ফল খুবই খারাপ করে৷ শতকরা ভোট এবং আসন উভয়ই কমে যায় এই নির্বাচনে৷ ৩ শতাংশ ভোট পেয়ে মাত্র আটটি আসন দখল করেছিল৷

১৯৭২ সালে স্বতন্ত্র দলের প্রতিষ্ঠাতা রাজাগোপালাচারির মৃত্যু হলে দলও যেন ক্রমশ ক্ষয়িষ্ণু হতে থাকে ৷ ১৯৭৪ সালে এই দলটি অবশ্য কংগ্রেস বিরোধী চরণ সিং-এর নেতৃত্বাধীন ভারতীয় লোকদলের সঙ্গে মিশে গিয়েছিল৷