সৌপ্তিক বন্দ্যোপাধ্যায়: ‘যাক যদি যায় প্রাণ, হীরকের রাজা ভগবান’। এই কথাটা বলতে চাননি উদয়ন পণ্ডিত। পাঠশালায় তাঁর শিক্ষা দেওয়া শিকেয় তুলে আত্মগোপন করেছিলেন এক পাহাড়ের গুহায়। দিনের পর দিন তিনি অপেক্ষা করছিলেন। সুদিনের জন্য। একদিন আসে সেই সুদিন, দু’জনের হাত ধরে। একজন গান গায়, অপরজন ঢোল বাজায়। উদয়ন পন্ডিত যেখানে লুকিয়েছিলেন সেই পাহাড় পুরুলিয়ার জয়চন্ডী।

দুঃখের বিষয়, ওই স্থানে সত্যজিৎ রায়ের নামে কোনও ফলকও নেই। আছে শুধুই একটি টিনের চালের নীল সাদা মঞ্চ।

পাহাড় আজও বর্তমান। পাহাড়ের একটি পাথরের উপর বসে বাঘা (রবি ঘোষ) বললেন, ‘চলো যাই কালভৈরবের মন্দির’ বলেই গুপির (তপেন চট্টোপাধ্যায়) সঙ্গে ‘হাই ফাইভ’ এবং ভূতের রাজার বরে পৌঁছে যান সেই মন্দিরে। এইরকম সত্যজিতের ‘হীরক রাজার দেশে’ সিনেমার বহু দৃশ্যের স্মৃতিকে আঁকড়ে ধরা দাঁড়িয়ে আছে জয়চণ্ডী। সেই ২০০৬-০৭ সাল, সত্যজিৎ রায়ের স্মৃতির উদ্দেশ্যে তৎকালীন সাংসদ বাসুদেব আচার্য একটি মঞ্চ বানিয়ে দিয়েছিলেন। সেই শেষ। তারপরে আর কিছু হয়নি।

স্থানীয় মানুষদের দাবি, ওই মঞ্চেরও বিশেষ কোনও রক্ষণাবেক্ষণ হয় না। শুধু বছরে একবার জয়চন্ডী উৎসবের সময় ব্যবহৃত হয়। তাও সেই উৎসবের জৌলুসও দিনে দিন কমেছে। নতুন কোনও বিশেষ পরিকল্পনাও নেই। রঘুনাথপুর কর্পোরেশনের চেয়ার পার্সন ভাবেশ চট্টোপাধ্যায় বলেন, “ওখানে ওই মঞ্চটাতো রয়েছে। একটা পার্ক করব। সেই কাজ এখন চলছে। ওই সত্যজিৎ রায়ের নামেই ওই পার্কটা করব বলে ঠিক করেছি।” অথচ সামনেই একটি বিশাল হোটেল হয়েছে। হোটেলটি বেশ ঝাঁ চকচকে।

গড়পার থেকে জয়চন্ডী। দুরত্ব ২৬৩ কিলোমিটার। নিজের শহর থেকে কাছে এমন লোকেশনকে বাদ দিয়ে অন্য কোথাও স্যুটিং করার কথা ভাবতেই পারেননি সত্যজিৎ রায়। আপন সৌন্দর্যের পাশাপাশি ৮০০ ফুট উচ্চতা বিশিষ্ট জয়চন্ডী পাহাড়টি পাহাড়প্রেমীদের কাছে একটা অন্যতম আকর্ষণ। মা চন্ডি র নামানুসারেই এই পাহাড়টির নাম রাখা হয়েছে জয়চন্ডি পাহাড়।পাহাড়ের উপর থেকে পুরুলিয়া জেলার অপূর্ব রূপ দেখা যায়।

শোনা যায়, বহু বছর আগে ডাকাতরা এই পথ ব্যবহার করত। মন্দির ছাড়াও পাশ্ববর্তী হ্রদ, একশিলার গঠনযুক্ত পাহাড়, গুহা এবং রঘুনাথপুর সিল্ক কারখানা পর্যটকদের কাছে বিশেষ দ্রষ্টব্য স্থান। প্রকৃতি এখানে শান্ত। মনোরম পরিবেশ অপরূপ হয়ে উঠেছে একাধিক হ্রদের উপস্থিতিতে। পাহাড়ে ওঠার মুখে একটি অর্ধচন্দ্রাকৃতি তোরণ রয়েছ। তোরণের লেখা আছে ” শ্রী জয়চন্ডী মাতা ও বজরংবলীজির মন্দির”।

প্রায় ৫০০ এর মতো সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠতে হবে। প্রথমে চোখে পড়বে একটি গোলাকৃতি ধ্বংসপ্রাপ্ত দূর্গ। তার কিছু উপরে শ্রী শ্রী বজরংবলীজির একচূড়া মন্দির। গর্ভগৃহে রয়েছ অপুর্ব শ্বেতপাথরের নির্মিত গদা ও গন্দমাদন পর্বতধারী ছোট্ট হনুমানজির মুর্তি।তার খানিকটা উপরে শ্রী শ্রী জয়চন্ডী মায়ের পঞ্চরত্ন মন্দির। গর্ভগৃহে রয়েছে শ্বেতপাথরের নির্মিত অষ্টভুজা, সিংহবাহিনী, রক্তবস্ত্র পরিহিতা, সালাংকারা, শ্বেতসুভ্রা মা জয়চন্ডী দেবী।মায়ের আটটি হাতে রয়েছে শঙ্খ, চক্র, গদা, পদ্ম, খড়্গ, ত্রিশূল, অঙ্কুশ, ও অভয়মুদ্রা।মায়ের মাথার ও ময়ূরপুচ্ছ সজ্জিত মুকুট। মায়ের দক্ষিণ দিকে রয়েছে শিবলিঙ্গ ও বাম দিকে রয়েছে শালগ্রাম শিলা। মন্দিরের পাশেই রয়েছে মানতবৃক্ষ। ঠাকুর দেবতা, রক ক্লাইম্বিং, প্রকৃতি, হোটেল, রেসর্ট সবই রয়েছে কিন্তু কোথাও যেন উপেক্ষিত বিশ্ববরেণ্য পরিচালক।