সৌপ্তিক বন্দ্যোপাধ্যায়, কলকাতা: মনে পড়ে জয় বাবা ফেলুনাথের বিখ্যাত ছুড়ি খেলার দৃশ্য। একদিকে টান টান উত্তেজনা , অপরদিকে লালমোহনবাবুর কমেডি। বাংলা ছবির অন্যতম আইকনিক দৃশ্য। আজও ওই দৃশ্যের অনেক ডায়লগের অংশ হাস্যরসের জন্য ব্যবহার করা হয় বিভিন্ন ছবির স্ক্রিপ্টে। সারা ছবিতে এই দৃশ্যে একা নজর কেড়েছিলেন, লালমোহন, মোহন লাল … যা বলবেন আপনারা , ওই একই বেপার আছে। অর্থাৎ সন্তোষ দত্ত। কিভাবে নেওয়া হয়েছিল এই আইকনিক দৃশ্য তা সত্যজিৎ রায় নিজে লিখেছেন তাঁর , ‘একেই বলে স্যুটিং’ বইতে। আজ ২ ডিসেম্বর, বিখ্যাত অভিনেতার জন্মদিনে আমাদের সন্তোষ স্মৃতি রোমন্থন।

বিশ্ববরেণ্য চিত্র পরিচালকের বর্ণনা অনুযায়ী, ১৬ই মে ১৯৭৮ সালে, কলকাতার ইন্দ্রপুরী স্টুডিওতে নেওয়া হয়েছিল ওই দৃশ্যটি। স্টুডিওর ফ্লোরে তৈরি করা হয়েছিল মগনলালের বৈঠকখানা। অর্জুনের ছুরি যেখানে গিয়ে বিঁধবে একটার পর একটা, সেটা কাঠের তৈরি। কিছুক্ষণ বাদেই মগনলালের এক কর্মী নিয়ে আসেন রাক্ষসের ছবি আঁকা সেই বোর্ড। ছবিতে আমরা যা দেখি তার ঠিক উল্টোটা ঘটানো হয়েছিল ইন্দ্রপুরী স্টুডিয়োতে। লালমোহনবাবু সরবত খেয়ে নিজেকে চাঙ্গা দেখানোর চেষ্টা করলেন।

সরবতের তারিফ করে অর্জুনকে জিজ্ঞাসা করলেন তাঁকে কোথায় দাঁড়াতে হবে। ভাবখানা এমন যেন ভিতরে যে ভয়ের জুজু ঘুরে বেড়াচ্ছে তা তিনি বুঝতেই দিচ্ছেন না কাউকে। দু’বার অর্জুনকে বাধা দিলেন। তারপর ‘ঠাকুর ঠাকুর’ করে দাঁড়িয়ে গেলেন বোর্ডের সামনে। শুরু হল ছুড়ি খেলা। একের পর এক ছুড়ি এসে গিঁথে যাচ্ছে বোর্ডে। মগনলাল চেঁচিয়ে উঠছেন ‘নাজুক’ ‘তনখা বরা দুঙ্গা’ , ”সাব্বাস’ এমন সব অভিব্যক্তিতে। দর্শকের মনের ভিতরেও অদ্ভুত টেনশন।

অথচ শট নেবার সময় কোনও টেনশন ছিল। সবই ছিল রায়বাবুর মগজাস্ত্র। প্রথমে লং শটে বিভিন্ন অ্যাঙ্গেল থেকে ছুরি ছোঁড়ার দৃশ্য নিয়ে নেওয়া হয়। বেশ কয়েকটা শটে জটায়ু ও ছিলেন, তবে সেগুলো ছুরি ছোঁড়ার ঠিক আগের মুহূর্ত পর্যন্ত। আর যে শটগুলোতে অর্জুন বা অভিনেতা কামু মুখোপাধ্যায় ছুরি ছুঁড়ে দিচ্ছেন সেখানে উল্টোদিকে জটায়ু নেই। কাট শটে পুরো ব্যপারটা করা হয়েছিল। একবার ছুড়ি ছোঁড়ার কাট শট। পরেরটা ছুড়ি গিঁথে যাওয়ার কাট শট। এটা আমরা পর্দায় দেখছি। আসলে কোনও ছুড়িই বোর্ডে এসে গিঁথে যায়নি। বরং বোর্ড থেকে টেনে টেনে নেওয়া হয়েছিল ছুড়ি। আরও খুলে বলা যাক,

সন্তোষ দত্তের শরীর থেকে এক বা দেড় ইঞ্চি দূরে ছুড়িগুলিকে বোর্ডের গায়ে পরপর গেঁথে দেওয়া হল। আসলে প্রতিটা ছুড়ির পেছনে বাঁধা চিকন নাইলনের তার, যা ক্যামেরায় ধরা পড়বে না। ক্যামেরার চোখের বাইরে থেকে সেই তারগুলোকে টানটান করে ধরেছিলাম আমি আর কয়েকজন। এবার ক্যামেরা চালু হল। কিন্তু রিভার্স মোশনে। অর্থাৎ এক একটা করে নাইলনের দড়ি ধরে হ্যাঁচকা টান দেওয়া হল আর একটা করে ছুরি বোর্ড থেকে খুলে বেরিয়ে আসছে। আর সেই ছবি তোলা হল ক্লোজ ফ্রেমে। এই ছবি যখন প্রোজেক্টরে সাধারণ গতিতে চলবে, তখন দেখা যাবে একটার পর একটা ছুরি বিদ্যুৎগতিতে সন্তোষ দত্তের চারপাশে গিঁথে যাচ্ছে। এই পরিকল্পনা পর্দায় কি চেহারা নিয়েছিল সেটা সবার জানা।

আরও একটা দিক দেখতে হবে। রিভার্স মোশনে সিনেমার ছবি তুললে সেটা দেখার সময় অভিনেতার অভিব্যক্তিও উল্টো হয়ে যায়। সত্যজিৎ রায় সন্তোষ দত্তকে বলে দিয়েছিলেন, প্রতিবার ছুড়ি খুলে বেরিয়ে আসার সময় উল্টো অভিব্যক্তি দিতে হবে। যতটা সহজে বলা হচ্ছে বিষয়টা ততটা সহজ নয়। কিন্তু মানুষটি সন্তোষ দত্ত। ডিরেক্টরের ভাবনা, অভিনেতার অভিনয়। যুগলবন্দির ফল, আজও জানে আপামর সিনেমাপ্রেমী।

পপ্রশ্ন অনেক: চতুর্থ পর্ব

বর্ণ বৈষম্য নিয়ে যে প্রশ্ন, তার সমাধান কী শুধুই মাঝে মাঝে কিছু প্রতিবাদ