বিশ্বজিৎ ঘোষ

সারদাকাণ্ডের জেরেই কলকাতার এক সাংবাদিককেও শেষ পর্যন্ত বেছে নিতে হয়েছে আত্মহত্যার পথ৷ অথচ, তাঁর কথা খোদ কলকাতার সাংবাদিকদের মধ্যেই এখনও পর্যন্ত কত জনের জানা রয়েছে, সেই বিষয়টি নিয়েও কম নেই বিভিন্ন ধরনের প্রশ্ন৷

২০১৫-র জানুয়ারি মাসে আত্মহত্যা করেছেন দীর্ঘ বছরের অভিজ্ঞতা সম্পন্ন কলকাতার ওই সাংবাদিক৷ এবং, ওই সব বিভিন্ন ধরনের প্রশ্নের মধ্যে অন্যতম, সাংবাদিকদের একজোট হওয়ার বিষয়টি৷ কলকাতার সাংবাদিকদের মধ্যে একজোট হওয়ার প্রচেষ্টা অবশ্য দেখা গিয়েছে বিভিন্ন সময়৷ যেমন, ২০১৫-র তিন অক্টোবর বিধাননগর পুরসভার নির্বাচনে যেভাবে শাসকদল তৃণমূল কংগ্রেসের কাছে সংবাদমাধ্যম এবং সাংবাদিকদের আক্রান্ত হতে হয়েছিল, তার জেরেও কার্যত একজোট হওয়ার প্রচেষ্টা দেখা গিয়েছিল৷ কিন্তু, আদৌ কি একজোট হতে পেরেছেন সাংবাদিকরা?

কারণ, বিভিন্ন সময় বিভিন্ন ঘটনায় কলকাতা তথা এ রাজ্যের সাংবাদিকদের মধ্যে একজোট না হওয়ারও যে সব নজির রয়েছে, সে সবও আবার অস্বীকারের নয়৷ তবে, পুরভোটের ওই দিন আক্রান্ত হওয়ার প্রতিবাদে যেভাবে কলকাতার সাংবাদিকদের মধ্যে কার্যত একজোট হওয়ার উদ্যোগ দেখা গিয়েছিল, সেই প্রচেষ্টা জারি থাকলে আখেরে যে সংবাদমাধ্যমের পাশাপাশি সাংবাদিক এবং সংবাদমাধ্যমের অন্য কর্মীরাও উপকৃত হবেন না, তাও কি অস্বীকারের? কিন্তু, অন্যতম প্রশ্ন, আদৌ কি একজোট হতে পারবেন কলকাতা সহ এ রাজ্যের সাংবাদিকরা? গোটা রাজ্যের অথবা সংখ্যাগরিষ্ঠ না হলেও, শুধুমাত্র কলকাতারই বহু সংখ্যক সাংবাদিকও কি হতে পারবেন একজোট? সাংবাদিকদের বিভিন্ন ধরনের সমস্যার মধ্যে শুধুমাত্র এই একজোট হওয়ার ক্ষেত্রেই শেষ পর্যন্ত কত জন শামিল হবেন, সেই বিষয়েও কম নেই প্রশ্ন৷

২০১৩-র এপ্রিলে সারদাকাণ্ড প্রকাশ্যে আসার পরেও সাংবাদিকদের মধ্যে একজোট হওয়ার প্রচেষ্টা দেখা গিয়েছিল৷ সারদাকাণ্ডের জেরে ভুক্তভোগী নন যে সব সাংবাদিক, যুক্তি-তর্কের খাতিরে তাঁদের বিষয়টি না হয় অন্য রকম হিসেবে ধরা হল৷ কিন্তু, ২০১৩-র এপ্রিলে একজোট হওয়ার জন্য সারদাকাণ্ডের জেরে ভুক্তভোগী সব সাংবাদিকের মধ্যেই সেভাবে দেখা যায়নি শামিল হওয়ার মনোভাব৷ তবে, ভাগ্যিস, ২০১৩-র ১৫ এপ্রিল অর্থাৎ, ১৪২০-র পয়লা বৈশাখের সন্ধ্যায় ‘তারা টিভি’-র অনুষ্ঠান দেখেছিলেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়! কেননা, ওই অনুষ্ঠান দেখেছিলেন বলেই না সারদাকাণ্ডের কথা তিনি জানতে পেরেছিলেন (স্বয়ং মুখ্যমন্ত্রীর মন্তব্যেই এমন প্রকাশ পেয়েছে)! এবং, তিনি ওই অনুষ্ঠান দেখেছিলেন বলেও না, ওই টিভি চ্যানেলটি পেয়েছিল রাজ্য সরকারের আর্থিক সহায়তা৷ যদিও, ২০১৩-র এপ্রিলে সারদাকাণ্ড প্রকাশ্যে আসার অনেক আগেই পশ্চিমবঙ্গের ‘পরিবর্তনে’র সরকারকে সারদা সহ অন্যান্য চিটফান্ড সংস্থার বিষয়ে খোঁজখবর নেওয়ার জন্য দিল্লির তরফে চিঠি পাঠানো হয়েছিল৷ এবং, ২০১১-য় ‘পরিবর্তনে’র সরকারের মন্ত্রী হওয়ার পরে মদন মিত্রর নাম সারদা গোষ্ঠী পরিচালিত সংবাদমাধ্যমের কর্মীদের সংগঠনের সভাপতি হিসেবেও প্রকাশ্যে এসেছিল৷ অথচ, ওই সংগঠনের অস্তিত্ব আদৌ ছিল কি না, সেই বিষয়টি কোনওদিন স্পষ্ট হয়নি৷

তবে, সারদাকাণ্ড প্রকাশ্যে আসার পরে, সারদা গোষ্ঠী পরিচালিত বন্ধ হয়ে যাওয়া একটি সংবাদপত্রে কর্মরত দু’-একজন সাংবাদিকও ওই টিভি চ্যানেলে যোগ দিয়েছিলেন৷ সংবাদমাধ্যমের ওই অংশে তৈরি হয়েছিল ‘তারা টিভি এমপ্লয়িজ ওয়েলফেয়ার অ্যাসোসিয়েশন’৷ ওই অ্যাসোসিয়েশনের প্রেসিডেন্ট হয়েছিলেন সেখানকার এক সংবাদপাঠিকা৷ অথচ, এমনও হয়েছে, সারদাকাণ্ডের জেরে সমস্যায় আক্রান্ত দু’-একজন সাংবাদিক ওই প্রেসিডেন্টের সঙ্গে যোগাযোগ করতে চাইলেও, কোনও উত্তরই আসেনি ওই সংবাদপাঠিকার তরফে৷ আর, কলকাতা প্রেস ক্লাব? কলকাতায় সাংবাদিকদের এই ক্লাবের ভূমিকা নিয়েও বিভিন্ন সময় বিভিন্ন ধরনের প্রশ্ন উঠেছে৷ তবে, শুধুমাত্র এই দু’টি বিষয়-ও নয়৷ তার উপর, কেউ এমন বলতেই পারেন যে, এই দু’টি বিষয় বিচ্ছিন্ন ঘটনা৷ কিন্তু, সারদাকাণ্ডের জেরে যেভাবে কলকাতার এক সাংবাদিককেও শেষ পর্যন্ত আত্মহত্যার পথ বেছে নিতে হয়েছে, সেই ঘটনা কীভাবে বিচ্ছিন্ন হতে পারে?

ওই সাংবাদিকের নাম শান্তনু সরকার৷ ২০১৫-র আট জানুয়ারি বছর চল্লিশের ওই সাংবাদিককেও শেষ পর্যন্ত বেছে নিতে হয়েছে আত্মহত্যার পথ৷ অথচ, চিত্রসাংবাদিকতার পেশায় শান্তনু সরকারের প্রায় বছর ২০-র অভিজ্ঞতা ছিল বলে জানিয়েছেন তাঁর বন্ধু এবং প্রাক্তন সহকর্মীরা৷ ২০০৮-এ আমিও ছিলাম তাঁর সহকর্মী৷ কিন্তু, সারদাকাণ্ডের জেরেই শেষ পর্যন্ত তাঁকেও আত্মহত্যার পথ বেছে নিতে হয়েছে৷ কারণ, সারদা গোষ্ঠী পরিচালিত এবং অভিনেত্রী অপর্ণা সেন সম্পাদিত পাক্ষিক এক পত্রিকায় যোগ দিয়েছিলেন শান্তনু সরকার৷ সারদাকাণ্ডের জেরে স্বাভাবিক কারণেই ওই পত্রিকাটিও বন্ধ হয়ে যায়৷ পরে অন্য একটি গোষ্ঠীর পরিচালনায় অপর্ণা সেন সম্পাদিত অন্য এক পাক্ষিক পত্রিকায় যোগ দিয়েছিলেন শান্তনু সরকার৷ কিন্তু, ওই পত্রিকাটিও এক সময় বন্ধ হয়ে যায়৷ তার পরেও বেঁচে থাকার জন্য লড়ায় জারি রেখেছিলেন তিনি৷ কিন্তু, শেষ পর্যন্ত আর…!

শান্তনু সরকারের বছর পাঁচেকের ছেলে, স্ত্রী, মা এবং অসুস্থ বাবা রয়েছেন৷ ঘটনার দু’-একদিন পরে যখন তাঁর আত্মহত্যার খবর পেয়েছিলাম এক সাংবাদিক-বন্ধুর কাছে, তখন বাকরুদ্ধ হয়ে গিয়েছিলাম৷ কারণ, ওই ঘটনার বেশ কয়েক দিন আগেও তাঁর সঙ্গে দেখা হয়েছিল, কথা হয়েছিল৷ কিন্তু, শুধুমাত্র বেঁচে থাকার জন্য লড়াইয়ের ময়দান থেকে এ ভাবে পিছু হটে যাওয়ার কোনও আঁচও সেই সময় টের পাওয়া যায়নি তাঁর কথাবার্তায়৷ কেউ এমন বলতেই পারেন, সারদাকাণ্ডের জেরেই আত্মহত্যা করেছেন শান্তনু সরকার, তার কী প্রমাণ রয়েছে? অবশ্যই রয়েছে প্রমাণ৷ কারণ, চিত্রসাংবাদিকতায় দীর্ঘ বছরের অভিজ্ঞতা সত্ত্বেও তাঁর কর্মহীন হয়ে যাওয়ার বিষয়টি কি সেই প্রমাণ নয়? সারদাকাণ্ডের জেরে যেভাবে বিপর্যস্ত, ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে সাংবাদিকতার পেশাও, এবং, শান্তনু সরকার যেভাবে এই পরিস্থিতির শিকার হয়েছেন, সেই বিষয়টিও কি ওই প্রমাণ নয়? চিত্রসাংবাদিক হিসেবে কর্মহীন হয়ে যাওয়ার পরে ব্যক্তিগত উদ্যোগে তিনি ফোটোগ্রাফি এবং ভিডিয়োগ্রাফির কাজ করছিলেন৷ কিন্তু, ক্রমে তিনি আরও অর্থসংকটের সম্মুখীন হতে থাকেন৷ তবে, শেষ পর্যন্ত আর…!

সারদাকাণ্ডের জেরে এখনও পর্যন্ত শুধুমাত্র পশ্চিমবঙ্গেই ১২৭ জন আত্মহত্যা করেছেন বলে জানিয়েছেন চিটফান্ড সাফারার্স ইউনিটি ফোরামের আহ্বায়ক অসীম চট্টোপাধ্যায়৷ এই সব আত্মহত্যার কারণ সারদা সহ অন্যান্য চিটফান্ড সংস্থার কেলেঙ্কারি৷ তবে, আত্মহত্যার এই সব ঘটনা সারদাকাণ্ডের-ই জের৷ কারণ, সারদা গোষ্ঠীর কেলেঙ্কারি প্রকাশ্যে আসার পরেই অন্য বিভিন্ন চিটফান্ড সংস্থার কেলেঙ্কারিও প্রকাশ্যে এসেছে৷ এই ১২৭ জনের মধ্যে অধিকাংশই সারদা সহ বিভিন্ন চিটফান্ড সংস্থার এজেন্ট৷ এই ১২৭ জনের মধ্যে আমানতকারীরাও রয়েছেন৷ এই ১২৭ জনের আত্মহত্যার ঘটনা নথিভুক্ত অর্থাৎ, প্রকাশ্যে এসেছে৷ তবে, প্রকাশ্যে আসেনি তেমন আরও ঘটনাও যে নেই, তাও নয়৷ যেমন, সাংবাদিক শান্তনু সরকারের ঘটনা৷ বৈদ্যুতিন কোনও সংবাদমাধ্যমে তাঁর খবর প্রকাশ পেয়েছে কি না, কোনও সংবাদপত্রে তাঁর জন্য এক লাইন-ও ছাপা হয়েছে কি না, এই বিষয়টি মনে করতে পারবেন কলকাতার কোনও সাংবাদিক?

সারদাকাণ্ডের জেরে চিত্রসাংবাদিক শান্তনু সরকারের আত্মহত্যার খবর কিন্তু প্রকাশ হয়নি কলকাতার কোনও সংবাদমাধ্যমে৷ কাজেই, এমন কি প্রশ্ন ওঠে না, সব ঘটনা প্রকাশ্যে না আসায় সারদা সহ অন্যান্য চিটফান্ড সংস্থার কেলেঙ্কারির জেরে শুধুমাত্র পশ্চিমবঙ্গেই এখনও পর্যন্ত কত জনকে আত্মহত্যা করতে হয়েছে, সেই তথ্যও স্পষ্ট নয়? তবে, শুধুমাত্র আবার আত্মহত্যার ঘটনাও নয়৷ সারদাকাণ্ডের জেরে আত্মহত্যার চেষ্টা করেছেন, শুধুমাত্র পশ্চিমবঙ্গের এমন বিভিন্ন ঘটনাও প্রকাশ্যে এসেছে৷ তেমনই, সারদাকাণ্ডের জেরে শান্তনু সরকার ছাড়া কলকাতার অন্য কোনও সাংবাদিকের মনকেও যে গ্রাস করেনি আত্মহত্যার হাতছানি, তাও নয়৷ তবে, শেষ পর্যন্ত ওই সব সাংবাদিককে আত্মহত্যার পথ বেছে নিতে হয়নি৷ কিন্তু, তার মানে এই নয় যে ওই সব সাংবাদিক কর্মহীন ছিলেন না৷ তার মানে এই নয় যে, ওই সব সাংবাদিক চরম অর্থসংকটের সম্মুখীন হননি৷ ওই সব সাংবাদিকও কর্মহীন ছিলেন৷ যে কারণে, চরম অর্থসংকটের সম্মুখীন হওয়ায়, ওই সব সাংবাদিকের মধ্যে কাউকে কাউকে যেমন গচ্ছিত সম্পদ বিক্রি করে আত্মহত্যার পথ থেকে দূরে থাকতে হয়েছে৷ কাউকে কাউকে যেমন ঋণগ্রস্ত হয়ে আত্মহত্যার পথ থেকে দূরে থাকতে হয়েছে৷ তেমনই, কাউকে কাউকে আবার ঋণজালে জড়িয়ে পড়েও আত্মহত্যার পথ থেকে দূরে থাকতে হচ্ছে৷ তেমনই, সারদাকাণ্ডের জেরে কর্মহীন সাংবাদিকদের মধ্যে কাউকে কাউকে আবার দীর্ঘ বছরের অভিজ্ঞতা এবং দক্ষতা থাকা সত্ত্বেও বেছে নিতে হয়েছে অন্য কোনও পেশা৷ কেউ কেউ এখনও কর্মহীন হয়ে রয়েছেন৷ এবং, কেউ কেউ নতুন করেও কর্মহীন হয়ে পড়ছেন৷

শুধুমাত্র সারদা সহ অন্যান্য চিটফান্ড সংস্থার ক্ষতিগ্রস্ত এজেন্ট, আমানতকারী এবং তাঁদের পরিজনরা নন৷ সারদা সহ অন্যান্য চিটফান্ড সংস্থার বিভিন্ন স্তরের ক্ষতিগ্রস্ত কর্মী এবং তাঁদের পরিজনরাও নন৷ সারদা সহ অন্যান্য চিটফান্ড সংস্থার কেলেঙ্কারির প্রভাব থেকে যেমন দেশের অর্থনীতিও মুক্ত থাকতে পারেনি৷ তেমনই, সারদাকাণ্ডের জেরে বিপর্যস্ত, ক্ষতিগ্রস্ত কলকাতার সাংবাদিকতার পেশা এখনও ঘুরে দাঁড়াতেও পারেনি৷ কাজেই, শুধুমাত্র বেঁচে থাকার জন্য সারদাকাণ্ডের জেরে বিপর্যস্ত, ক্ষতিগ্রস্ত সাংবাদিক এবং সংবাদমাধ্যমের কর্মীদের মধ্যে কত জন, কীভাবে এখনও লড়াই জারি রেখেছেন, সে সবের খবর-ই-বা কত জন সাংবাদিকের জানা রয়েছে? কিন্তু, সারদাকাণ্ডের জেরে কলকাতার এক সাংবাদিককেও কেন বেছে নিতে হল আত্মহত্যার পথ!! কারণ, সারদা গোষ্ঠীর পাশাপাশি অন্য বিভিন্ন চিটফান্ড সংস্থাও সংবাদমাধ্যম পরিচালনা করতে শুরু করেছিল৷ আকারে ছোট হোক অথবা বড়, বিভিন্ন চিটফান্ড সংস্থার বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম বন্ধ হয়ে গিয়েছে সারদাকাণ্ড প্রকাশ্যে আসার আগে এবং পরে৷

চিটফান্ড সংস্থা পরিচালিত সংবাদমাধ্যম অবশ্য এখনও চালু রয়েছে পশ্চিমবঙ্গে৷ যদিও, সারদা গোষ্ঠী পরিচালিত সংবাদমাধ্যমের কোনও কোনও অংশকে চালু রাখার প্রচেষ্টাও শুরু হয়েছিল৷ ওই প্রচেষ্টায় তৃণমূল কংগ্রেসের তৎকালীন সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক মুকুল রায়কে অন্যতম ভূমিকায় দেখা গিয়েছিল৷ তবে, তার পরে সারদা গোষ্ঠী পরিচালিত সংবাদমাধ্যমের কোন অংশ কীভাবে চলেছে এবং চলছে, সে সবও এখন শুধুমাত্রই ইতিহাস! তেমনই, সারদাকাণ্ডের জেরে বিপর্যস্ত, ক্ষতিগ্রস্ত কলকাতায় সাংবাদিকতার পেশায় এখনও কত জনকে শুধুমাত্র বেঁচে থাকার জন্য কীভাবে লড়াই জারি রাখতে হচ্ছে, সে সবও ক্রমে শুধুমাত্র ইতিহাসই হয়ে চলেছে! তেমনই আবার, সারদাকাণ্ডের জেরেও সংবাদমাধ্যমের বিভিন্ন অংশে চলছে বিভিন্ন ধরনের কর্মকাণ্ড৷ ওই সব কর্মকাণ্ডের সৌজন্যে যেমন দীর্ঘ বছরের অভিজ্ঞতা এবং দক্ষতা থাকা সত্ত্বেও কোনও কোনও সাংবাদিকের মিলছে না যথাযথ কাজ আর বেতনের সুযোগ৷ তেমনই রয়েছে, কাজ করেও বেতন না পাওয়ারও ঘটনা৷ এ ক্ষেত্রে সাংবাদিক হিসেবে নিয়োগ করার পরে কর্তৃপক্ষের তরফে এমনও যুক্তি দেওয়া হয়েছে, সংশ্লিষ্ট সংবাদপত্র যেহেতু নির্ধারিত সময়ে প্রকাশ হতে পারেনি, সেই কারণে বেতন পাবেন না ওই সাংবাদিকরা৷ এমনও হয়েছে, অধিকাংশ সাংবাদিককে বেতন না দিয়ে এবং বিষয়টি সম্পর্কে না জানিয়ে, ওই অর্থের মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট সংবাদপত্রের প্রকাশ জারি রেখেছেন সেখানকার কয়েক জন সাংবাদিক৷ এবং, সংশ্লিষ্ট সংবাদপত্রে ছাপা হয়েছে, সেখানকার সাংবাদিকদের সংগঠন পরিচালনা করছে ওই সংবাদমাধ্যম৷

সারদাকাণ্ডের জেরে যেভাবে বিপর্যস্ত, ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে সাংবাদিকতার পেশা, অতীতে এই পেশায় এমন পরিস্থিতির সম্মুখীন কোনও দিন হতে হয়েছে কি না, সেই বিষয়টি মনে করতে পারেন না প্রবীণ সাংবাদিকরা৷ তবে, অভিজ্ঞতা এবং দক্ষতার নিরিখে কোনও সাংবাদিকের যথাযথ কাজের সুযোগ এবং বেতন না পাওয়ার ঘটনা অবশ্য নতুন কোনও বিষয় নয়৷ এই প্রসঙ্গে প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যর কথা উল্লেখ করা যেতে পারে৷ পশ্চিমবঙ্গে বামফ্রন্ট সরকারের প্রথম পাঁচ বছরের উপর প্রকাশিত প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যর লেখা ‘ফিরে দেখা’-য় তিনি এমন বলেছেন, বিভিন্ন পত্রপত্রিকার ভিন্ন বয়সি মহিলা এবং পুরুষ সাংবাদিকদের মধ্যে তিনি দেখেছেন নিজেদের পেশা সম্পর্কে তাঁদের গর্ব ও দায়িত্ববোধ৷ সামাজিক মানুষ ওই সব সাংবাদিককে যে সম্মানের আসনে বসিয়েছেন, সেখানে তাঁরা কখনোই আপস করতে চান না৷ তিনি জানতেন, ওই সব সাংবাদিকের মধ্যে অনেকে নিয়মিত বেতন পেলেও সবাই পেতেন না৷ নতুন অনেক সাংবাদিক অল্প বেতনে কাজ করতে বাধ্য হতেন৷ কোনও সাংবাদিকের কাজ সাময়িক কালের জন্য বন্ধ হয়ে গিয়েছে৷ কিন্তু, কোনও অবস্থাতেই ওই সব সাংবাদিক নিজেদের আত্মসম্মান বিকিয়ে দিতে রাজি নন৷ মফসসল শহরেও সেই সাংবাদিক বন্ধুদের তিনি দেখেছেন, যাঁদের কাছে পেশার নেশাই তাঁদের মূলধন– দিনের শেষে লাভক্ষতির হিসেবটা বড়ই বেমানান৷

তবে, শুধুমাত্র যেভাবে সারদাকাণ্ডের জেরে বিপর্যস্ত, ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে সাংবাদিকতার পেশা, তার কারণেও নয়৷ সংবাদমাধ্যমের বিভিন্ন অংশে কর্মরত বিভিন্ন সাংবাদিকের বিভিন্ন ধরনের কর্মকাণ্ডের জেরেও কর্মহীন হয়ে পড়তে হচ্ছে কোনও না কোনও সাংবাদিককে৷ কোনও কোনও ক্ষেত্রে আবার কোনও সংবাদমাধ্যম চালু হওয়ার পরে, কোনও না কোনও কারণে সেই সংবাদমাধ্যম বন্ধ হয়ে যায় এবং যাচ্ছে৷ ওই সব কারণের মধ্যে কোনও কোনও ক্ষেত্রে অজ্ঞাত কারণও থাকে৷ তেমনই, সারদাকাণ্ডের জেরে যেভাবে বিপর্যস্ত এবং ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে সাংবাদিকতার পেশা, সেই পরিস্থিতির সুযোগও নিচ্ছে কোনও কোনও সংবাদমাধ্যম কর্তৃপক্ষ৷ এ ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট সংবাদমাধ্যম কর্তৃপক্ষের তরফে যেমন কোনও না কোনও সময় কর্মরত কোনও না কোনও সাংবাদিককে কর্মচ্যুত করার হুঁশিয়ারি দেওয়া হচ্ছে৷ তেমনই, কোনও কোনও ক্ষেত্রে আবার, ওই হুঁশিয়ারির উপর চাপ বৃদ্ধি করতে, অন্যদের বেতন বৃদ্ধি করা হলেও নির্দিষ্ট সংখ্যক সাংবাদিকের বেতন বৃদ্ধি করা হচ্ছে না৷ শুধুমাত্র তাই নয়৷ নিয়োগের সময় অভিজ্ঞতা এবং দক্ষতার ভিত্তিতেও দেওয়া হচ্ছে না বেতন৷ তেমনই আবার, অভিজ্ঞতা এবং দক্ষতা না থাকা সত্ত্বেও, শুধুমাত্র কর্তৃপক্ষ অথবা নিয়োগকারী সাংবাদিকের পছন্দের হওয়ায়, সংশ্লিষ্ট মহিলা অথবা পুরুষ সাংবাদিকের বেতনও অনেক বেশি হচ্ছে৷ কাজেই, পরিস্থিতি এমন যে, এক বছরের অভিজ্ঞ-দক্ষ কোনও সাংবাদিকের সঙ্গে ১০ বছরের অভিজ্ঞ-দক্ষ কোনও সাংবাদিকের বেতনের ক্ষেত্রেও থাকছে না কোনও সামঞ্জস্য (বেতনের এই অসামঞ্জস্যের বিষয়টি পরিকাঠামোগত কারণে আকারে বড় এবং প্রতিষ্ঠিত কোনও সংবাদমাধ্যমের সঙ্গে পরিকাঠামোগত কারণে আকারে ছোট কোনও সংবাদমাধ্যমের তুলনা করে বলা হচ্ছে না)৷

তেমনই আবার, সারদাকাণ্ডের জেরে বিপর্যস্ত, ক্ষতিগ্রস্ত এই পেশার সুযোগ গ্রহণ করতে, কোনও কোনও ক্ষেত্রে নতুন কোনও সংবাদমাধ্যম চালুর সময়ও থাকছে না সম্মানজনক বেতন কাঠামো৷ তার উপর, সংবাদমাধ্যমের বিভিন্ন অংশের কর্তৃপক্ষ এবং সাংবাদিকদের বিভিন্ন অংশের ভূমিকাও কম গুরুত্বপূর্ণ নয়৷ সে সব ভূমিকার মধ্যে রয়েছে কোনও রাজনৈতিক দল অথবা পক্ষের হয়ে তাঁবেদারির বিষয়টিও৷ এ ক্ষেত্রে, কোনও রাজনৈতিক দল অথবা পক্ষের হয়ে তাঁবেদারির জন্য কোনও সংবাদমাধ্যম কর্তৃপক্ষের তরফে সিদ্ধান্ত যেমন রয়েছে, তেমনই রয়েছে, সাংবাদিকদের একাংশের ব্যক্তি-তাঁবেদারির বিষয়টিও৷ কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্তে কোনও সংবাদমাধ্যমে তাঁবেদারি চলতে থাকলে, সেখানে কর্মরত প্রকৃত কোনও সাংবাদিকের ক্ষেত্রে হতাশ হওয়া ছাড়া কার্যত কোনও উপায় থাকে না৷ তবে, কোনও রাজনৈতিক দল অথবা পক্ষের হয়ে তাঁবেদারির জন্য যখন কোনও সংবাদমাধ্যম কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্ত থাকে না, অথচ, সেখানে সাংবাদিকদের একাংশের ব্যক্তি-তাঁবেদারি প্রকাশ পায়, তখন সেই বিষয়টিও কম গুরুত্বপূর্ণ নয়৷ কোনও সাংবাদিক, কোনও রাজনৈতিক দল অথবা পক্ষের নীতি-আদর্শের প্রতি বিশ্বাস রাখতেই পারেন৷ এমনকী, সংশ্লিষ্ট রাজনৈতিক দল অথবা পক্ষের সমর্থক কিংবা সদস্যও হতে পারেন৷

কিন্তু, সাংবাদিকতা কোনও রাজনৈতিক দল অথবা পক্ষের হয়ে তাঁবেদারির কেন হবে!! যেমন, কোনও কবি, শিল্পী অথবা সাহিত্যিক কিংবা চিন্তাবিদ অর্থাৎ, কোনও বুদ্ধিজীবীর কোনও রাজনৈতিক পরিচয় থাকা উচিত নয়৷ যে কারণে, প্রকৃত কোনও কবি, শিল্পী অথবা সাহিত্যিক কিংবা চিন্তাবিদ কখনোই পক্ষপাতদুষ্ট হন না৷ যে কারণে, এই ধরনের কোনও মানুষের কাছ থেকে বিভিন্ন সময় সত্যের দিশা পেয়েছেন, পাচ্ছেন এবং আগামী দিনেও পাবেন সাধারণ মানুষ৷ কাজেই, এমন প্রশ্নও উঠতে পারে, গণতন্ত্রের চতুর্থ স্তম্ভের প্রতিনিধি হিসেবে যদি কোনও সাংবাদিক পক্ষপাতদুষ্ট হন, তা হলে, ওই সাংবাদিক কেন সংশ্লিষ্ট রাজনৈতিক দল অথবা পক্ষের মুখপত্রে কিংবা টিভি চ্যানেল থাকলে সেখানে সাংবাদিকতা করেন না? অথচ, সাধারণত তেমন না হওয়ায়, ওই ব্যক্তি-তাঁবেদারি এবং তার সঙ্গে সংবাদমাধ্যম কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী তাঁবেদারির জেরে একদিকে যেমন ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে গণতন্ত্রেরই চতুর্থ স্তম্ভ৷ তেমনই অন্যদিকে আবার প্রশ্নের মুখে পড়ছে সত্যের প্রতি দায়বদ্ধতার বিষয়টিও৷ যে কারণেও প্রশ্ন উঠছে, এমন বিভিন্ন কাণ্ডের সৌজন্যেও কি সারদাকাণ্ডের জেরে বিপর্যস্ত, ক্ষতিগ্রস্ত সাংবাদিকতার পেশায় কর্মহীন হয়ে পড়া শান্তনু সরকারের আত্মহত্যার দায় এড়িয়ে যেতে পারেন প্রতিষ্ঠিত সাংবাদিক এবং ‘সাংবাদিকরা’? এবং, ওই কারণেও প্রশ্নটি ফের উঠছে, আদৌ কি একজোট হতে পারবেন সাংবাদিকরা?

তেমনই, এই প্রশ্নও ফের উঠতে পারে, ফের কেউ এমন বলতেই পারেন, শান্তনু সরকারের আত্মহত্যা সারদাকাণ্ডের জেরে নয়৷ কেউ এমন বলতেই পারেন৷ যেমন, আলুচাষিদের আত্মহত্যার ঘটনায় পশ্চিমবঙ্গের ‘পরিবর্তনে’র সরকারের তরফে বিভিন্ন সময় এমন বলা হয়েছে, সাংসারিক অশান্তির কারণে সংশ্লিষ্ট আলুচাষি আত্মহত্যা করেছেন৷ কিন্তু, সাংসারিক অশান্তি যদি হয়েও থাকে, তা হলে, সেই অশান্তির পিছনে কারণ কী? আলুচাষে সংশ্লিষ্ট চাষি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিলেন বলেই না তাঁকে সাংসারিক অশান্তির সম্মুখীন হতে হয়েছিল৷ কাজেই, আত্মহত্যার কারণটা কীভাবে সাংসারিক অশান্তি হয়? এ ক্ষেত্রে আত্মহত্যার কারণ তো আলুচাষে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার বিষয়টি৷ আর, ওই ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার কারণেই তো দেখা দিয়েছিল সাংসারিক অশান্তি৷ সহকর্মী হিসেবে বিভিন্ন সময় সাংবাদিক শান্তনু সরকারের আত্মমর্যাদাবোধ, সংবেদনশীল মনের পরিচয় পেয়েছি৷ সারদাকাণ্ডের জেরে বিপর্যস্ত, ক্ষতিগ্রস্ত সাংবাদিকতার পেশায় কর্মহীন হয়ে পড়ার পরেও তিনি জারি রেখেছিলেন বেঁচে থাকার লড়াই৷ কিন্তু, শেষ পর্যন্ত তিনি আর জারি রাখতে পারেননি ওই লড়াই৷ যতটা জানি, ওই আত্মমর্যাদাবোধই শেষ পর্যন্ত তাঁকে আর…!

কিন্তু, সারদাকাণ্ডের কী হবে! সারদাকাণ্ডে সিবিআই তদন্ত চেয়ে সুপ্রিম কোর্টে দু’টি জনস্বার্থ মামলা দায়ের হয়েছিল ২০১৩-র ২০ মে৷ শেষ পর্যন্ত, ২০১৪-র নয় মে সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি টি এস ঠাকুর এবং বিচারপতি সি নাগাপ্পনের ডিভিশন বেঞ্চের রায়ে সারদাকাণ্ডে তদন্তের ভার পেয়েছে সিবিআই৷ রাজ্য সরকারের তরফে সারদাকাণ্ডে তদন্তের সময় বিভিন্ন প্রামাণ্য নথি নষ্ট করে দেওয়া হয়েছিল বলে অভিযোগ উঠেছিল৷ পশ্চিমবঙ্গে নির্বাচনী প্রচারে এসে সম্প্রতি কলকাতায় একই অভিযোগ করেছেন বিজেপির সর্বভারতীয় সভাপতি অমিত শাহ৷ তবে, সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশে সারদাকাণ্ডের তদন্ত করছে সিবিআই৷ এবং, বিচার ব্যবস্থার প্রতি আস্থা রয়েছে৷ যে কারণে, এই প্রত্যাশাও রয়েছে, সারদা সহ অন্যান্য চিটফান্ড সংস্থার কেলেঙ্কারির বিষয়টি একদিন স্পষ্ট হবে৷

____________________________________________________________

আরও পোস্ট এডিট এবং খবর:
(০১) সারদা ভিত্তি হলে বাংলার ভবিষ্যৎ তবে এখন নারদ!
(০২) রাজ-‘কুৎসা’য় যায় যদি যাক প্রাণ হীরকের রাজা…!
(০৩) বিপর্যয় মোকাবিলায় নিধিরাম মমতার ‘উন্নত’ দফতর
(০৪) নিখোঁজ ছেলের সন্ধানে আইনের বদলে ভরসা ফেসবুক
(০৫) বিবিধের মাঝে দ্বেষ-প্রেমের উগ্র জাতীয়তাবাদের মিলন মহান!
(০৬) দুর্বারকে অচ্ছুৎ রেখে সোনাগাছিতে স্বাবলম্বন স্পেশাল
(০৭) সরকারি অর্থ মেলেনি বলে গরিব-বাড়ির ভরসা ক্লাব!
(০৮) দাভোলকর-পথে কুসংস্কারের ক্রম মুক্তি হবে বাংলায়!
(০৯) সংবিধানের মর্যাদা অক্ষুণ্ণ রাখতে বন্ধ সরস্বতী পুজো!
(১০) বঙ্গ-জোট জল্পনায় স্বরাজ অভিযানের বিকল্প রাজনীতি

____________________________________________________________