বাঙালির সংসকৃতি চর্চায় জোড়াসাঁকোর ঠাকুরবাড়ির অবদান অনেকখানি৷ লেখলেখি থেকে পত্রিকা প্রকাশে যেমন, যেমন সংগীতে, তেমনই বাংলা নাটকের বিবর্তনে বড় ভূমিকা নিয়েছে এই ঠাকুরবাড়ির মঞ্চ৷ সেই মঞ্চের বিবর্তনের কথা গানের সূত্রে তুলে ধরলেন দেবজিৎ বন্দ্যোপাধ্যায় ও ঋদ্ধি বন্দ্যোপাধ্যায়৷ তাঁদের উপস্থাপনা ‘জোড়াসাঁকো মঞ্চগাথা’য় উঠে এল জোড়াসাঁকোর ঠাকুর পরিবারে কৃতী সদস্যদের নাট্যভাবনার নানাদিক৷

‘পারিবারিক এসব নাটক করা নিয়ে মহর্ষি কিন্তু কোনও বাধা দেননি৷ সে যুগে যখন চারিদিকে ধনীর ছেলেরা বাগানাবাড়ি ও বাঈজির নাচগান ও আনুষাঙ্গিক মদ্যপান নিয়ে ব্যস্ত, সে সময় তাঁর বাড়ির ছেলেরা নির্দোষ আমোদ প্রমোদ নিয়ে আছে, এটা তো শ্লাঘার বিষয়’- ঠাকুরবাড়ির নাট্যচর্চা সম্পর্কে এমনটাই বলেছিলেন অমিতা ঠাকুর৷ দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুরের সংস্কৃতি চর্চার এই উৎসাহতেই ঠাকুরবাড়ির নাটক চর্চা নিজস্ব ঘরানা তৈরি করতে পেরেছিল৷ রবীন্দ্রনাথের নাট্যচর্চাকে যদি তিনভাগে ভাগ করা যায়, তবে প্রথমটিই হবে এই ঠাকুরবাড়ি প্রভাব৷ ঔপনিবেশিক প্রভাব কাটিয়ে  যাত্রা থেকে নাটকে বিবর্তনের নানা দিক নিয়ে এই মঞ্চেই পরীক্ষা করেছিলেন তরুণ রবীন্দ্রনাথ৷ তবে শুধু তিনি একা নন, তাঁর আগেthakurbari-1 থেকেই নাট্যচর্চা নির্দিষ্ট খাতে বয়েছিল ঠাকুরবাড়ির অঙ্গনে৷ ১৮৭৭ সালে জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘অলীকবাবু’ নাটকেই প্রথম অভিনয় করেন কিশোর রবীন্দ্রনাথ৷ সে নাটকে অভিনয় করেছিলেন কাদম্বরী দেবীও৷ ‘রাজা ও রানি’ থেকে শুরু করে ‘বাল্মিকী প্রতিভা’ থেকে ‘তপতী’ অবধি তাঁর নাট্যভাবনার নানা বিবর্তন ধরা আছে এই ঠাকুরবাড়ির মঞ্চে৷ বাংলা নাটক তথা ভারতীয় নাটককে তিনি যে রূপ দিতে চেয়েছিলেন, মঞ্চসজ্জা থেকে নাটকের অভিনয়, নাটকে গানের ব্যবহার এবং পরবর্তীকালে গীতিনাট্যের ফর্মে রূপান্তর-সবকিছুতে যে আধুনিকতা আনতে চেয়েছিলেন তারও সাক্ষী আছে এই মঞ্চই৷ তাছাড়া সে যুগের তাবড় নাট্যকারদের নাটকের অভিনয়ও হয়েছে এই মঞ্চে৷ বলা যায় নবজাগরণপর্বে ভারতীয় নাটকের স্বরূপ সন্ধানের পরীক্ষাগার ছিল এই জোঁড়াসাঁকোর মঞ্চই৷ গানে গানে সেই বিবর্তনের চালচিত্রই তুলেধরলেন দুই শিল্পী৷ তাঁদের সংগীতের সঙ্গে প্রাসঙ্গিক কথনে ছিলেন দেবাশিস বসু৷পুরো অনুষ্ঠানের ভাবনা ও গ্রন্থনায় ছিলেন দেবজিৎ বন্দ্যোপাধ্যায়৷ 

রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয়,  অ্যাকাডেমি থিয়েটার ও ওয়েস্ট বেঙ্গল স্টেট অ্যাকাডেমি অফ ডান্স, ড্রামা, থিয়েটার অ্যান্ড ভিজুয়াল আর্টসের যৌথ উদ্যোগে হল এই উপস্থাপনা৷পাশাপাশি এদিন প্রকাশিত হল ‘জ্যোতিরিন্দ্রনাথের জীবনস্মৃতি’৷ দেজ পাবলিকেশন থেকে প্রকাশিত বইটির উদ্বোধন করলেন অধ্যাপক সব্যসাচী বসু রায়চৌধুরী৷

‘জোড়াসাঁকো মঞ্চগাথা’র উপস্থাপনা বাংলার নাট্যপ্রেমীদের আরও একবার মনে করিয়ে দিল ঠাকুরবাড়ির নাট্যভাবনা, নাট্যদর্শনের কথা৷ বাংলা নাটকের বিবর্তনের ঐতিহ্যের ইতিহাসও মূর্ত হয়ে ওঠল৷ সেইসঙ্গে এই বইও জ্যোতিরিন্দ্রনাথের জীবন ও সেই সময়ের সংস্কৃতিচর্চা বুঝতে সহায়ক হবে৷  সেদিন সংস্কৃতির যে বীজ এই বাড়িতে পত্রে-পুষ্পে পল্লবিত হয়ে উঠেছিল, এদিনের অনুষ্ঠানে যেন সেই অতীতেই খেলিয়ে দিল একচিলতে হাওয়া৷ সংস্কৃতির সূত্রে আরও একবার মুখোমুখি হল অতীত ও বর্তমান৷ 

 

পচামড়াজাত পণ্যের ফ্যাশনের দুনিয়ায় উজ্জ্বল তাঁর নাম, মুখোমুখি দশভূজা তাসলিমা মিজি।