সিদ্ধার্থ মুখোপাধ্যায়: জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ের (জেএনইউ) নাম পরিবর্তন করে নেতাজি সুভাষচন্দ্রের নামে করার দাবি তুললেন বিজেপি নেতা সুব্রহ্মণ্যম স্বামী৷ তিনি জেএনইউ সম্পর্কে মন্তব্যের পাশাপাশি আক্রমণ করেন দেশের প্রথম প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরুর শিক্ষাগত যোগ্যতা নিয়েও৷ স্বামী বলেন, “জেএনইউ নাম পালটে নেতাজির নামে রাখা উচিত।” পাশাপাশি জেএনইউ-র শিক্ষক ও পড়ুয়াদের মাওবাদী বলেও মন্তব্য করেছেন স্বামী। তাঁর অভিমত, “নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু নেহরুর চেয়ে শিক্ষাগত যোগ্যতায় ঢের শিক্ষিত ছিলেন।” স্বাভাবিকভাবেই তার এই মন্তব্যের তীব্র বিরোধিতা করেছে কংগ্রেস নেতৃত্ব।
মুখ খুললেই বিতর্কিত মন্তব্য করাটা জলভাত করে ফেলেছেন সম্প্রতি বিজেপির নেতা সুব্রহ্মণ্যম স্বামী। তাঁকে জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ের (জেএনইউ) উপাচার্যের পদের জন্য মনোনীত করা হতে পারে, সম্প্রতি এই খবর প্রকাশ্যে আসায় এই বিষয়ে তাঁর প্রতিক্রিয়া জানতে চাওয়া হয়৷ তখনই তাঁকে নেহরু এবং জেএনইউ সম্পর্কে এমন মন্তব্য করতে দেখা যায়৷ অন্যদিকে ক্ষোভ প্রকাশ করে কংগ্রেস নেতা সন্দীপ দীক্ষিত বলেন, ‘‘একটা সময় ছিল যখন সুব্রহ্মণ্যম স্বামী একজন উজ্জ্বল নেতা ছিলেন, এখন তিনি রাজনৈতিক ‘জোকার’-এ পরিণত হয়েছেন।” নানান মিডিয়া রিপোর্ট থেকে পাওয়া তথ্যে জানা গিয়েছে, কেন্দ্রীয় মানব সম্পদ উন্নয়ন মন্ত্রকের তরফে স্বামীকে জেএনইউ-র উপাচার্য পদে যোগ দেওয়ার প্রস্তাব দেওয়া হতে পারে। বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্তমান উপাচার্য এস কে সোপোরির আগামী বছরের জানুয়ারি মাসে মেয়াদ ফুরোচ্ছে। নিয়ম অনুযায়ী, তারপর বিশ্ববিদ্যালয়ের কমিটি মানবসম্পদ উন্নয়ন মন্ত্রকের মাধ্যমে নয়া উপাচার্য পদে মনোনীত সদস্যদের নাম পাঠাবে দেশের সমস্ত কেন্দ্রীয় বিশ্ববিদ্যালয়গুলির আচার্য তথা রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখোপাধ্যায়ের কাছে। রাষ্ট্রপতির সম্মতি মেলার পরেই ঠিক হবে নয়া উপাচার্য কে হবেন৷jnu
তবে স্বামী বলে নয়, বিজেপি নেতৃত্বাধীন এই সরকার তো অনেক ক্ষেত্রেই নাম বদল করতে উদ্যোগী হতে দেখা গিয়েছে৷ দিল্লিতে অবস্থিত কোনও বিশ্ববিদ্যালয় বলে নয়, রাস্তার নামেও তো পরিবর্তন আনতে চাইছে এই সরকার৷ যেমন দিল্লিতে আওরঙ্গজেবের নামে রাস্তারটি প্রাক্তন রাষ্ট্রপতি এপিজে আবদুল কালামের নামে রাখতে চেয়ে বিতর্ক কম হচ্ছে না৷ এই বিষয়ে বিজেপির যুক্তি, তারা মুসলমান বিরোধী নয়, তবে জনগণকে জানিয়ে দিতে চায় এখানে কারা ভালো মুসলমান এবং কারা খারাপ৷ অর্থাৎ আওরঙ্গজেব খারাপের দলে আর কালাম ভালোর দলে৷
আসলে মোদী সরকারের আমলে এক উলট পুরাণ শুরু হয়েছে ৷ এটা তো ঠিক, স্বাধীন ভারতে বেশিরভাগ সময়ই দিল্লি দখলে রয়েছে কংগ্রেসের, তার মধ্যে আবার সিংহভাগ সময় রাজত্ব করেছেন নেহরু-গান্ধী পরিবারের সদস্যরাই৷ ফলে কেন্দ্রীয় প্রকল্প তথা বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের নামকরণ হয়ে গিয়েছে জওহরলাল নেহরু, ইন্দিরা গান্ধী এবং রাজীব গান্ধীর নামে৷ কিন্তু মোদী সরকার এবার ওই সব নাম ছেঁটে ফেলে ভিন্ন নামে তা তুলে ধরতে চাইছে৷ এই সরকারের বাজেটে বিভিন্ন প্রকল্পের নামকরণের সময় হিন্দুমহাসভা জনসঙ্ঘের নেতাদের নামকেই প্রাধান্য দিতে দেখা গিয়েছে৷ যেমন ভারতীয় জনসঙ্খের প্রতিষ্ঠাতা সদস্য দিনদয়াল উপাধ্যায়ের নামে গ্রামীণ বিদ্যুৎ প্রকল্প এনেছেন, যা আগে রাজীব গান্ধীর নামে ছিল৷ তেমনই আরবান রিনিউয়াল মিশন যা আগে নেহরুর নামে ছিল, সেটাই আবার আবার জনসঙ্খ নেতা শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের নামে করতে দেখা গিয়েছে৷ তবে শুধু জনসঙ্ঘ বা আরএসএসের লোকের নামেই শুধু নয়, কংগ্রেস-বিরোধী অন্যান্য দলের নেতাদের কথাও মনে রাখার চেষ্টা করেছেন কেন্দ্রের বিজেপি নেতৃত্ব, যাতে এই বিষয়ে অন্তত কংগ্রেস-বিরোধী শিবিরের একাংশের সমর্থন পাওয়া যায়৷ যেমন জরুরি অবস্থার পর তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর নেতৃত্বাধীন কংগ্রেসকে হারানোর প্রধান কারিগর জয়প্রকাশ নারায়ণের নামে মধ্যপ্রদেশে সেন্টার ফর এক্সেলেন্সি করতেও দেখা গিয়েছে ৷
এদিকে নেতাজি সংক্রান্ত গোপন ফাইল বের করার প্রতিশ্রুতি দিয়েও টালবাহানা করেছে মোদী সরকার৷ তার উপর পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী এ রাজ্যের হাতে থাকা নেতাজির গোপন ফাইলগুলি প্রকাশ করে দিল্লির হাতে থাকা গোপন ফাইল প্রকাশের দাবিতে চাপে ফেলেছেন কেন্দ্রকে৷ এই পরিস্থিতিতে স্বামীর জেএনইউ সম্পর্কে এহেন মন্তব্য সেই চাপকে কিছুটা প্রশমিত করার উদ্দেশ্য বলেও মনে করছেন রাজনৈতিক মহলের একাংশ৷ তাছাড়া যাঁরা সুভাষপন্থী তাঁদের মধ্যে অনেকেই ঘোরতর, এমনকী কোনও কোনও ক্ষেত্রে উগ্র নেহরু-বিরোধী মনোভাবাপন্ন বলে লক্ষ করা যায়৷ ফলে এক্ষেত্রে সেইসব মানুষের সমর্থন বিজেপি পাবে বলে মনে করা হচ্ছে ৷ পক্ষান্তরে আবার পশ্চিমবঙ্গে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে হারাতে কংগ্রেস এবং বামেদের জোট বাঁধার ইঙ্গিত রয়েছে৷ সেই পরিস্থিতিতে যখন সুব্রহ্মণ্যম স্বামী জেএনইউ-র শিক্ষক এবং ছাত্রদের নকশালপন্থী অ্যাখ্যা দিলেন তখন কংগ্রেস এবং কমিউনিস্টদের মধ্য নয়া সমীকরণের সম্ভাবনা উড়িয়ে দিচ্ছে না কেউ কেউ৷ জেএনইউতে বরাবরই সিপিআই-সিপিএম তথা তাদের ছাত্র সংগঠন এআইএসএফ-এসএফআইয়ের একটা উপস্থিতি অনুভব করা যায়৷ সিপিএমের বর্তমান সাধারণ সম্পাদকও এক সময় জেএনইউ-রই ছাত্র ছিলেন৷ এই অবস্থায় নেহরুর পাশাপাশি এখানকার শিক্ষক-ছাত্রদের প্রতি বিজেপির নেতার বিদ্বেষমূলক আক্রমণ উভয়কে আরও কাছে নিয়ে আসতে পারে বলে একটা কথা উঠেছে৷ তবে হ্যাঁ, বাম জোটে দীর্ঘদিন ধরেই রয়েছে নেতাজিরই তৈরি ফরওয়ার্ড ব্লক৷ সেক্ষেত্রে তারা কিছুটা ফাঁপরে পড়ে যেতে পারে৷