সৌপ্তিক বন্দ্যোপাধ্যায় : তিনি শিকারি। তাঁর বন্দুকের নলের সামনে এক সে এক ভয়ঙ্কর হয়ে ওঠা পশু হার মেনেছে। কিন্তু বাস্তব হল, তাঁর মিতকথন ও অরণ্যের প্রতি, অরণ্যসংলগ্ন সকল প্রাণীর প্রতি একশো শতাংশ প্রেম চেনায় আসল তাঁকে। তিনি জিম করবেট। মাইলের পর মাইল দৌড় করানো রুদ্রপ্রয়াগের চিতা যে দিন তাঁর রাইফেলের গুলিতে মারা পড়ল তখন তাঁর লেখায় কোথাও নেই জয়ীর গর্ব। নেই সাফল্যের উল্লাস। শুধু তাঁর মনে হয়েছিল, নিরীহ দরিদ্র পাহাড়ি মানুষগুলিকে নরখাদকের আতঙ্ক থেকে তিনি মুক্তি দিতে পেরেছেন। এটা ছিল তাঁর ‘কর্তব্য’।

করবেট একাধিক বাঘ শিকার করলেও মানুষখেকো চিতা মেরেছিলেন মাত্র দুটি। ১৯১০ সালে পানারের চিতা বাঘ এবং ১৯২৬-এ রুদ্রপ্রয়াগের চিতা। পানারের চিতাবাঘটি প্রায় ৪০০ জন মানুষ মেরেছিল এবং রুদ্রপ্রয়াগের চিতার খপ্পরে পড়ে প্রাণ হারিয়েছিলেন ১২৬ জন মানুষ। দীর্ঘ আট বছর ধরে বহু গ্রামের মানুষকে আতঙ্কিত করে রেখেছিল এই চিতাটি। ১৯০৭ থেকে ১৯৩৮ দীর্ঘ তিন দশক ধরে রাতের পর রাত হিংস্র শ্বাপদের সন্ধানে কেটেছে জিম করবেটের। একাধিকবার প্রায় অলৌকিক ভাবে রক্ষা পেয়েছেন তিনি। কিন্তু তাঁর যুক্তিতে শিকার তখনই মান্যতা পায় তা যখন সাধারণ নিরীহ মানু‌ষের প্রাণরক্ষার স্বার্থে। বাঘকে ‘নিষ্ঠুর ও রক্তপিয়াসী’ বলতে ঘোরতর আপত্তি তাঁর। জিমের কথায়, ‘বাঘ উদারহৃদয় ভদ্রলোক। সীমাহীন তার সাহস। যে দিন বাঘকে বিলোপ করে দেওয়া হবে, যদি বাঘের সপক্ষে জনমত গড়ে না ওঠে বাঘ লোপ পাবেই, তা হলে ভারতের শ্রেষ্ঠতম প্রাণীর বিলোপে ভারত দরিদ্রতরই হবে।’

শিকারি হিসাবে করবেট সাহেব পরিচিত হলেও বন্য পশুকে হত্যা করা তিনি কিন্তু পছন্দ করতেন না। তাঁকে শিকার করতে হয়েছে অনেকটা পরিস্থিতির চাপে পড়ে, বাধ্য হয়ে। কুমায়ুন ও গাড়োয়ালের বিস্তীর্ণ পাহাড়ি অঞ্চলে যারা বাস করত তাদের দৈনন্দিন প্রয়োজনে বাড়ির বাইরে বেরিয়ে জঙ্গলের পথে যেতেই হত। পাহাড়ের আঁকাবাঁকা উঁচু নিচু রাস্তা দিয়ে তাদের গৃহপালিত ছাগল বা গরু চড়াতে, জ্বালানীর জন্য গাছের শুকনো ডাল যোগাড় করতে, গ্রামের স্কুলে পড়তে যেতে, অন্য গ্রামের পরিচিত জন বা আত্মীয়দের সঙ্গে দেখা করতে অথবা বাজার হাট করবার জন্য জঙ্গলের পথে না গিয়ে উপায় ছিল না।

তখন সে সব গ্রামে পাকা বা চওড়া রাস্তা কোথাও ছিলনা, গাড়ি ঘোড়া তো দূরের কথা। হিমালয়ের জঙ্গলে বিভিন্ন ধরণের বৈচিত্র্যময় পাখীর কূজন, দূর থেকে ভেসে আসা বন্য প্রাণীর ডাক বা কাছাকাছি বয়ে যাওয়া কোন নদীর স্রোতের শব্দ ছাড়া নৈঃশব্দ্য ভঙ্গের অন্য কোনো কারণ ছিল না। যাদের এরকম গ্রাম দেখার সুযোগ হয় নি এবং শহরাঞ্চলেই জীবন কেটেছে, তারা এই পরিবেশকে স্বপ্ন বলেই মনে করবেন। দারিদ্রে জীর্ণ এইসব মানুষেরা ছিল ধর্মভীরু এবং সহজ সরল জীবন যাত্রায় অভ্যস্ত। কিন্তু এই শান্ত ও নিস্তরঙ্গ পরিবেশ মাঝে মাঝে অশান্ত হয়ে উঠত মানুষখেকো বাঘের অত্যাচারে। সাধারণভাবে বাঘ মানুষকে নিজে থেকে আক্রমণ করে না, হঠাৎ সামনা সামনি পড়ে গিয়ে ভয় না পেলে। কিন্তু মানুষখেকো বাঘের কথা আলাদা। মানুষ শিকার করাই তাদের মূল লক্ষ্য।

নৈনিতালে তাঁর বন্ধুর ছোট্ট প্রেসে ছাপা প্রথম বই ‘জাঙ্গল স্টোরিজ’-এর কথা বাদ দিলে জিমের গ্রন্থের সংখ্যা মাত্র ছ’টি। কিন্তু তাঁর মৃত্যুর ষাট বছর পরেও জিমের শিকার-কাহিনিগুলি এখনও বেস্ট সেলার। যা ছাপা হয়েছিল মাত্র ১০০ কপি, তাও বিক্রিই মুখ্য উদ্দেশ্য ছিল না। আসলে পেশাদার লেখক হয়ে ওঠার তেমন কোনও বাসনাই ছিল না জিমের।

অধিকাংশ রচনাই ঘটনার কুড়ি, তিরিশ বা চল্লিশ বছর পর লেখা। জিম করবেটের লেখা উল্লেখযোগ্য বই গুলি হল – ‘ম্যান ইটারস অফ কুমায়ুন’ (১৯৪৪), ‘দি ম্যান ইটিং লেপার্ড অফ রুদ্রপ্রয়াগ’ (১৯৪৭), ‘মাই ইন্ডিয়া’ (১৯৫২), ‘জাঙ্গল লোর’ (১৯৫৩), ‘দি টেম্পল টাইগার অ্যান্ড মোর ম্যান ইটারস অফ কুমায়ুন’ (১৯৫৪)। এর মধ্যে প্রথম বইটির প্রথম সংস্করণ মোট আড়াই লক্ষ কপি বিক্রি হয়েছে এবং ২৭টি ভাষায় অনূদিত হয়েছে।

পপ্রশ্ন অনেক: চতুর্থ পর্ব

বর্ণ বৈষম্য নিয়ে যে প্রশ্ন, তার সমাধান কী শুধুই মাঝে মাঝে কিছু প্রতিবাদ