বারাসত: যশোহর রোডে গাছ কাটার প্রতিবাদে আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছেন পরিবেশ কর্মীরা৷ কলকাতা হাইকোর্টের প্রধান বিচারপতির এজলাসে চলছে জনস্বার্থ মামলা শুনানি৷ নির্বিচারে গাছ কেটে ফেলার প্রতিবাদে সরব হয়েছেন বিশিষ্টরা৷ গান-কবিতা-নাটক-পথ সভা-মোমবাতি মিছিল-পদযাত্রাও হয়েছে৷ কিন্তু, গাছ কাটার পেছনে ঠিক কী উদ্দেশ্য রয়েছে? উন্নয়নের আড়ালে ‘তরুহত্যা’য় কাদের মদত? গাছ কাটার পরিণতিই বা কী? কোথায় যাচ্ছে কাঠ? গাছ বিক্রির টাকাটাই বা কি হচ্ছে? এবার সরাসরি প্রশ্ন তুললেন সাহিত্যিক তিলোত্তমা মজুমদার৷

ভারত-বাংলাদেশের মধ্যে সড়ক পথে যোগাযোগ ব্যবস্থা আরও সুগম করার লক্ষ্যে যশোহর রোড সম্প্রসারণের কাজে হাত লাগিয়ে কেন্দ্র-রাজ্য৷ রাস্তা সম্প্রসারণের সৌজন্যে যশোহর রোডের দু’ধারে চার হাজার ৩৬টি গাছ কাটা পড়ার কথা৷ ইতিমধ্যেই ২০-২৫টি গাছ কেটে সাফ করে দিয়েছে জাতিয় সড়ক নির্মাণ কর্তৃপক্ষ নিয়োজিত ঠিকা সংস্থা৷ রীতিমত জাতীয় সড়ক আটকে অবৈজ্ঞানিক ভাবে কাটা হয়েছে একের পর এক প্রাচীন গাছ৷ নির্বিচারে ‘তরুহত্যা’ রুখতে জোট বেধেছেন পরিবেশ কর্মীরা৷ গড়ে উঠেছে প্রতিবাদ৷ গাছ বাঁচাতে সবর হয়েছেন সমাজের বুদ্ধিজীবী মহল৷ প্রতিবাদে গলা মিলিয়েছেন সৃজিত মুখোপাধ্যায়, পল্লব কীর্তনিয়া, রূপম ইসলামের মতো শিল্পীরা৷ গাছ কাটার বিরুদ্ধে মন্তব্য করছেন শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়৷ নিজের অভিমতও প্রকাশ করেছেন সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়, রবীন্দ্রসঙ্গীত শিল্পী সাহানা বাজপেয়ি, সমাজকর্মী তথা লেখিকা জয়া মিত্র৷ প্রতিবাদ জানিয়েছেন কবির সুমন৷ এবার আরও এক ধাপ এগিয়ে গাছ কাটার আড়ালে সরাসরি কাঠ মাফিয়াদের মদতের প্রসঙ্গ তুলে বেশ কিছু প্রশ্ন ছুঁড়ে দিলেন সাহিত্যিক তিলোত্তমা মজুমদার৷

সম্প্রতি, বনগাঁর কবি তথা শিক্ষক পার্থসারথি দে’র সঙ্গে তিলোত্তমা মজুমদারের একটি ভিডিও সাক্ষাৎকার সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে পড়ে৷ দু’মিটিন ৫০ সেকেন্ডের ওই ভিডিওটিতে গাছ কাটার বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিবাদ জানান তিলোত্তমা মজুমদার৷ মন্তব্য করেন, ‘‘আমি সব সময় গাছ কাটার বিপক্ষে৷ সেটা যে প্রয়োজনেই হোক না কেন৷ আমি দেখেছি, উত্তরবঙ্গে মাইলের পর মাইল জঙ্গল একেবারে পরিস্কার হয়ে গিয়েছে৷ ২০ বছর আগে যে উত্তরবঙ্গ দেখেছি, যে সবুজ, যে ঘনত্ব দেখেছি৷ এখন সেখানে গেলে দেখি, একেবারে ধূধূ জায়গা৷ সেখানে কোনও উন্নয়নমূলক ক্রিয়াকলাপের জন্য জঙ্গল সাফ হয়নি৷ পুরোটাই হচ্ছে গাছ চুরি৷ প্রতিদিন শত শত গাছ চুরি যাচ্ছে৷ গত ২৫ বছরে আমার চোখে আমি চারটি জঙ্গল উধাও হয়ে যেতে দেখেছি৷ এখন সেখানে আর জঙ্গল বলে কিছু নেই৷ আগে ছিল৷ এখন ইতিহাস৷’’

গাছ কাটার পরিবর্তে প্রতিস্থাপনের উপর গুরুত্ব দেওয়ার কথা বলে তিলোত্তমা বলেন, ‘‘রাস্তা সম্প্রসারণই হোক বা কোনও কারখানা তৈরি, এখন টেকনোলজিটা কিন্তু এসে গিয়েছে৷ আমরা জানি, একটা গোটা গাছকে উপড়ে নতুন করে তাকে প্রতিস্থাপন করা যায়৷ সেই কথাটা কেউ ভাবছে না৷’’  গাছ বাঁচিয়ে উন্নয়নের পক্ষে জোরাল সওয়াল করে তিলোত্তমার মন্তব্য, ‘‘সত্যিই তো উন্নয়নের দরকার আছে৷ আবার এমন ভাবেই তো পরিকল্পনাটা করা যেতে পারে, ধরা যাক একটা রাস্তা দু’বা চার লেনের ছিল৷ এখন চার বা ছ’লেনের করা হবে৷ পরিকল্পনাটা এমন ভাবেই তো করা যায়, গাছগুলি থাকা সত্ত্বেও আরও দু’টি বাড়ানো যায়৷’’

বনগাঁ সীমান্ত থেকে জয়ন্তীপুর পর্যন্ত যশোহর রোড সম্প্রসারিত হয়েছে ওই অঞ্চলের গাছ না কেটেই৷ গাছগুলিকে রোড ডিভাইডার হিসাবে ব্যবহার করা হয়েছে৷ ‘‘তাহলে আমাদের চোখের সামনেই এমন উদাহরণ রয়েছে৷ সেটা প্রয়োগ করা কেন হচ্ছে না?’’ প্রশ্ন তোলেন তিলোত্তমা৷ জঙ্গল ধ্বংস থেকে যশোহর রোড সম্প্রসারণে নির্বিচারে ‘তরুহত্যা’র প্রসঙ্গ তুলে তিলোত্তমার সাফ মন্তব্য, ‘‘প্রথমেই আমার উত্তরবঙ্গের কথা এই কারণেই মনে পড়ল, এই সমস্ত প্রাচীন গাছ উত্তরবঙ্গেও আমি এই একই দুর্দশা দেখেছি৷ সেখানেও রাস্তার ধারে প্রাচীন শিরীষ, বিশাল বড় গুঁড়ি৷ এই একটা গাছও যদি কেউ কাটে, সে অন্তত ২৫ লক্ষ টাকার মালিক৷ এই যে অর্থ লোভ, এটাও আমি এই গাছ কাটার পেছনে দেখতে পারছি৷ প্রাচীন গাছ, এগুলি সব কাটা হচ্ছে, এবং তার পেছনে সেই গাছের কী পরিণতি হচ্ছে, সেই কাঠের কী পরিণতি হচ্ছে, তারা কোথায় যাচ্ছে? তাদের বিক্রির টাকাটাই বা কি হচ্ছে? কিছুই জানা যাচ্ছে না৷’’