সৌপ্তিক বন্দ্যোপাধ্যায়: তিনি জাপানেও থাকেন আবার বঙ্গেও রয়েছেন৷ হাঁসে চড়ে যাতায়াত করেন কিনা তা নিয়ে বিস্তর চর্চা হতে পারে৷ তবে বঙ্গ-জাপানি সরস্বতীকেো চাক্ষুষ করতে হলে একটি কানা গলিতে ঢুকতে হবে আপনাকে৷ হাওড়ার পঞ্চাননতলা রোডের কাছেই এই জাপানি সরস্বতী থাকেন৷

প্রশ্ন উঠবে মিল কোথায় ? আর অমিলটাই বা কোথায়? ঘেঁটে ‘ঘ’ হচ্ছেন!

ঘটনা হল, জাপানের সবচেয়ে জনপ্রিয় দেবী সরস্বতী। সেখানে তিনি পূজিতা হন ‘বেঞ্জাইতেন’নামে। জাপানে অনেক জায়গাতেই জলাশয়ের মাঝে একটি মন্দির থাকে৷ সেখানে কোনও বিগ্রহ থাকে না। জলই সেখানে বেঞ্জাইতেন দেবী৷ তবে বেঞ্জাইতেন দেবীর ছবি থেকে জানা যায়, তিনি দ্বিভুজা৷ হাতে থাকে ঐতিহ্যবাহী জাপানী বাদ্যযন্ত্র বিওয়া। এখানেই সরস্বতীর সঙ্গে মিল। তবে অমিল পূজার সময়ে। দেবী সরস্বতী পূজিতা হন কেবলমাত্র শুক্লা পঞ্চমীতে কিন্তু জাপানে সারাবছর বেঞ্জাইতেন ‘সরস্বতী’র আরাধনা হয়।

হাওড়া জেলার পঞ্চাননতলার ১ নম্বর উমেশ চন্দ্র দাস লেনে। সরুগলির এক সরস্বতীর মন্দির বছরভর অত্যন্ত নিষ্ঠাসহকারে পূজিতা হন বাগদেবী। তাঁর সঙ্গে অদ্ভুতভাবে মিল রয়েছে জাপানি বেঞ্জাইতেন দেবীর৷ দোতলায় একটি মন্দির। চারফুট লম্বা শ্বেতপাথরের সরস্বতী প্রতিমা হাঁসের উপরে দাঁড়িয়ে।বাম হস্তে ধরা বীণা। এখানেই সরস্বতী পূজিতা হন প্রত্যেক দিন৷ যেমনটা হয় জাপানে। আনুমানিক ১৯১৯ সালে তৈরি হয় এই মন্দির। তার মানে শতবর্ষের চৌকাঠ ছুঁয়ে ফেলেছে বঙ্গ-জাপানি দেবীমূর্তি৷

মূর্তিটিতে চার ফুট লম্বা শ্বেতপাথরের প্রতিমা হাঁসের উপরে দাঁড়িয়ে। বাঁ হাতে ধরা বীণা। সরস্বতী পুজোর দিন বাসন্তী রঙের শাড়িতে নতুন করে সাজানো হয় প্রতিমাটিকে। বছরভর মন্দিরে পুজো হলেও সরস্বতী পুজোর দিন থাকে বিশেষ আয়োজন। আগের দিন থেকে মন্দিরকে ফুল, মালা, আলোয় সাজানো হয়। শ’য়ে শ’য়ে মন্দিরে পুজো দিতে হাজির হন।

হাওড়া জেলা স্কুলের প্রধান শিক্ষক ছিলেন উমেশচন্দ্র দাস। সেই সূত্রেই হাওড়ার পঞ্চাননতলা রোডের ওই বাড়িতে তাঁর বসবাস শুরু। তাঁর নামানুসারে পঞ্চাননতলা রোডের বঙ্কিম পার্ক সংলগ্ন ওই সরু গলির নাম রাখা হয়েছে উমেশচন্দ্র দাস লেন। ইচ্ছে থাকলেও উমেশচন্দ্র ওই মন্দির প্রতিষ্ঠা করে যেতে পারেননি। ১৯১৩-র ১৬ ডিসেম্বর তাঁর মৃত্যু হয়। উমেশের মেজো ছেলে রণেশচন্দ্র শিবপুর বি.ই কলেজ থেকে ইঞ্জিনিয়ারিং পাশ করে কর্মসূত্রে রাজস্থান চলে যান। সেখান থেকেই‌ আনা হয়েছিল দেবীর মূর্তি।

১৯১৯ সালে মূর্তি জয়পুর থেকে আনার পরে বাড়িতেই তার পূজা শুরু হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু মন্দিরটি তখন প্রতিষ্ঠা করা যায়নি। ১৯২৩ সালে মন্দিরটি প্রতিষ্ঠা হয়। একচালা মন্দিরের গর্ভগৃহে শ্বেতপাথরের বেদিতে ছোট সিংহাসনে রয়েছে শালগ্রাম শিলা। গর্ভগৃহের মাথায় গম্বুজাকৃতির চূড়াঘর, শীর্ষে পদ্মের উপর কলস ও এিশূল। খিলানের মাথায় চারকোনে চারটি হাঁস।খিলানগুলি বীণা,পদ্ম প্রভৃতি দিয়ে অলংকৃত। সেই সময়ে এই‌ পরিবারে শিক্ষার অনুকূল আবহাওয়া।

উমেশচন্দ্রর চার ছেলে এবং তাঁদের পরবর্তী প্রজন্মের অনেকে ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার হয়েছেন। সেই সূত্রেই উমেশচন্দ্র বাড়িতে শিক্ষার আবহ বজায় রাখতে প্রত্যেক দিন বিদ্যার দেবীর পুজোর কথা ভাবনায় আসে। সেই রীতি মেনে আজও হচ্ছে পুজো।

বছরভর মন্দিরে পুজো হলেও সরস্বতী পুজোর দিন থাকে বিশেষ আয়োজন। আগের দিন থেকে মন্দিরকে ফুল, মালা, আলোয় সাজানো হয়। বাসন্তী রঙের শাড়িতে মা কে সাজানো হয়।ফলমূল, মিষ্টি ছাড়াও ১১০টি ছোট মাটির খুরিতে বড় বাতাসা,ফল ও মিষ্টি দেবীকে নিবেদন করা হয়।

বলা হয় এটাই রাজ্যের একমাত্র সরস্বতী মন্দির। তবে সম্প্রতি উদয়নারায়ণপুরের খেমপুর গ্রামে আর একটি সরস্বতী মন্দির তৈরি হয়েছে। তবে এ নিয়ে অন্য দাবীও রয়েছে। পূর্ব বর্ধমানের গোপীণাথবাটী এবং নদীয়া জেলার বাঁগআঁচড়া গ্রামে বাগদেবী মাতার মন্দির রয়েছে। এবার এই মন্দিরগুলির স্থাপনকাল সম্বন্ধে বিশেষ তথ্য মেলে না।

Image result for benzaiten

ইতিহাসবিদ অসিত কুমার বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁর হাওড়া শহরের ইতিবৃত্ত গ্রন্থে এই মন্দিরের কথা লিখেছিলেন। সেখানে তিনি উল্লেখ করেছেন – উমেশ চন্দ্র দাস রাজস্থানের জয়পুর থেকে শ্বেত পাথরের সরস্বতী মূর্তি এনে বাড়িতে প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নিয়েছিলেন।

রণেশ চন্দ্রর ছেলের নাতি সোমেশ জানান, পুজোর জাঁকজমক এবং আড়ম্বরে কোনও ঘাটতি রাখেন না তাঁরা। বরাবরের রীতি মেনেই পুজো হচ্ছে। হাওড়ার ইতিহাসবিদ অনুপম মুখোপাধ্যায় বলেন, ‘সরস্বতী দেবী যে নিত্যদিন পূজিতা হতে পারেন, এই ধারণাটা আমাদের সামাজিক জীবনে আগে ছিল না। তাই মধ্য হাওড়ায় এরকম একটি প্রাচীন মন্দির প্রতিষ্ঠিত হওয়া সত্ত্বেও তার তেমন প্রচার বা পরিচিতি ঘটেনি।’