সিদ্ধার্থ মুখোপাধ্যায়: ১৯৭৭ সালের মার্চ মাসে লোকসভা নির্বাচনে জনতা পার্টি জয় লাভ করলে দেশে মোরারজি দেশাইয়ের নেতৃত্বে প্রথম অ-কংগ্রেসি কেন্দ্রীয় সরকার গঠিত হয়৷ তখন এই সরকার চায় ৯টি রাজ্যে বিধানসভা ভেঙে দিয়ে নতুন করে নির্বাচন করতে ৷ কারণ ওই রাজ্যগুলিতে ইন্দিরা গান্ধীর নেতৃত্বাধীন ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস (আর) লোকসভা ভোটে পরাজিত হয়েছিল। পশ্চিমবঙ্গ ছিল ওই নয়টি রাজ্যের অন্যতম। কিন্তু কংগ্রেস(আর) কেন্দ্রের এভাবে বিধানসভা ভেঙে দেওয়ার সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করে৷

শুধু তাই নয় কেন্দ্রের সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করে পশ্চিমবঙ্গের তৎকালীন কংগ্রেস(আর) সরকার সুপ্রিম কোর্টে মামলার আবেদন জানায়। কিন্তু ১৯৭৭ সালের ৩০ এপ্রিল সুপ্রিম কোর্ট সেই আবেদন খারিজ করে দিলে উপ রাষ্ট্রপতি বি. ডি. জাত্তির (যিনি তখন ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি) আদেশে পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা ভেঙে দিয়ে রাষ্ট্রপতি শাসন জারি করা হয়৷

পড়ুন: ‘জয় বাংলা’য় তথাগতর আপত্তি দেখে কটাক্ষ তৃণমূলের

১৯৭৭ সালের ১৬মার্চ লোকসভা ভোট হয়েছিল৷ ১৯৭১ সালে ইন্দিরা গান্ধীর জনপ্রিয়তা তুঙ্গে থাকায় নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়েছিল কংগ্রেস (আর)৷ পরবর্তীকালে বেশ কিছু কাজের জন্য তিনি জনপ্রিয়তা হারাতে থাকেন৷ বিশেষত ১৯৭৫ সালে ২৫ জুন জরুরি অবস্থা জারি করা তার অন্যতম৷ সেই সময় বিরোধী রাজনৈতিক নেতাদেরকে জেলে ভরা, বলপূর্বক বন্ধ্যাত্বকরণ, খবরের কাগজ সেনসরশিপ ইত্যাদির করার জেরে ইন্দিরার সেই জনপ্রিয়তা বলা চলে তলানিতে এসে পৌঁছয়৷

তবে জরুরি অবস্থা তুলে নিয়ে ১৯৭৭ সালের জানুয়ারিতে লোকসভা নির্বাচনের কথা ঘোষণা করা হয়৷ এরপর আস্তে আস্তে জেল থেকে ছাড়া পান বিরোধী দলের নেতারা৷ তখন চারটি মুখ্য রাজনৈতিক দল- কংগ্রেস (ও), ভারতীয় জনসংঘ, ভারতীয় লোকদল ও সোশ্য়ালিস্ট পার্টি মিলিতভাবে জনতা পার্টি গঠন করে এবং ‘চক্র হলধর’এর প্রতীক চিহ্ন নিয়ে নির্বাচনে অবতীর্ণ হয়। ইন্দিরা গান্ধী, তাঁর ছেলে সঞ্জয় গান্ধীর পরাজয়ের পাশাপাশি কংগ্রেস (আর) খুব খারাপ ফল করে দিল্লির ক্ষমতা হারায়৷

১৯৭৭ সালে লোকসভা ভোটের আগে গোটা দেশে যেমন জয়প্রকাশ নারায়ণ নেতৃত্ব দেন তেমনই আবার পশ্চিমবঙ্গে ইন্দিরা কংগ্রেসের বিরোধীদের নেতৃত্ব দেন রাজ্যের প্রাক্তন কংগ্রেসি মুখ্যমন্ত্রী প্রফুল্ল সেন৷ পুরনো বিরোধিতা ভুলে সিপিএম এবং অন্যান্য বামদলগুলিও (ব্যতিক্রম শুধু সিপিআই কারণ তখন ওই দলটি ইন্দিরার কংগ্রেসের সঙ্গে জোটে ছিল) তাঁর নেতৃত্ব মেনে নেন৷ আরামবাগ লোকসভা কেন্দ্র থেকে প্রফুল্লবাবু বিপুল ভোটে জয়ী হন৷

কয়েক মাসের মধ্যেই পশ্চিমবঙ্গে বিধানসভা ভোট এসে পড়ে ৷ নির্বাচনী প্রস্তুতিতে ছটি বাম দল জোট করে নাম নেয় বামফ্রন্ট ৷ ১৯৭৭ এর লোকসভা ভোটে জনতা পার্টি ১৬টি , সিপিএম ১৮টি, আরএসপি ২টি, ফরওয়ার্ড ব্লক ৩টি এবং কংগ্রেস ৩টি আসনে জিতেছিল ৷ সেই বছরের রাজ্যের বিধানসভা নির্বাচনে কংগ্রেসকে কোণঠাসা করতে তখন সিপিএমও চায় বামেদের সঙ্গে জনতা পার্টির জোট করে ভোটে লড়ুক ৷ কিন্তু আসন ভাগাভাগি নিয়ে মতবিরোধ দেখা দেয় ৷ সিপিএমের প্রস্তাব ছিল প্রফুল্ল সেনকে মুখ্যমন্ত্রী পদপ্রার্থী করে কোয়ালিশন সরকার গড়া হোক ৷ এজন্য তারা মোট ২৯৪টি আসনের মধ্যে ১০০টি আসন চেয়েছিল৷ কিন্তু জনতা পার্টি ৮০ বেশি আসন দিতে রাজি হয়নি৷ আর প্রফুল্লবাবুও সিপিএমের প্রস্তাবে রাজি হননি৷ ফলে বিধানসভা ভোটের আগে আলোচনা স্তরেই জোট ভেঙে যায় ৷

ওই সময় জনতা পার্টির নেতারা মনে করেছিলেন, কংগ্রেস মুছে গিয়েছে এবং তাদের দলের জনপ্রিয়তা তুঙ্গে৷ তখন কংগ্রেস বিরোধী হাওয়া ছিল ঠিকই তবে এ রাজ্যে জনতা পার্টির সংগঠন বলে কিছু ছিল না, অভাব ছিল দলীয় নেতারও ৷ বরং সিপিএম তথা বামেদের সংগঠন ও নেতা দুই ছিল ফলে কংগ্রেস বিরোধী হাওয়াটাকে বামেরা নিজেদের অনুকূলে টানতে সক্ষম হন৷

১৯৭৭ সালের জুন মাসে রাজ্যর বিধানসভা ভোটে বামফ্রন্ট বিরাট জয় পায় ৷ সেবার সিপিএম একাই পায় ১৭৭টি আসন আর বামফ্রন্টের ঝুলিতে ছিল ২৩১টি আসন৷ অন্যদিকে সব আসনে প্রার্থী দিলেও কংগ্রেস পায় ২০টি আসন এবং জনতা পার্টির ঝুলিতে আসে ২৯টি আসন৷

এরপরে ২১জুন জ্যোতি বসুর নেতৃত্বে প্রথম বামফ্রন্ট সরকারের মন্ত্রীরা শপথ নেন৷ ২৪ জুন বিধানসভার অধিবেশন বসে এবং স্পিকার হন সৈয়দ মনসুর হাবিবুল্লা ৷ এই রাজ্যে এক নতুন ইতিহাসের অধ্যায় শুরু হল৷ তারপরে ৩৪ বছর ধরে রাজ্যে শাসন করেছে বামফ্রন্ট৷ ২০১১ সালে হয় আরও এক ঐতিহাসিক পরিবর্তন৷

তথ্যঋণ :
১) ভারতের নির্বাচন ও রাজনীতি ( নেহেরু থেকে নরসীমা): নিশীথ দে
২) উইকিপিডিয়া