জগদ্ধাত্রী হলেন দেবী দুর্গার আর এক রূপ। উপনিষদে এঁনারই নাম উমা হৈমবতী। বিভিন্ন তন্ত্র ও পুরাণ গ্রন্থেও এঁর উল্লেখ রয়েছে । তবে এই দেবীর আরাধনা মূলত বঙ্গদেশেই প্রচলিত। তবে কলকাতার তুলনায় হুগলির চন্দননগর ও নদিয়ার কৃষ্ণনগরে জগদ্ধাত্রী পুজো বেশি জনপ্রিয় । জগদ্ধাত্রী শব্দের আভিধানিক অর্থ জগৎ+ধাত্রী। অর্থাৎ জগতের (ত্রিভুবনের) ধাত্রী (ধারণকর্ত্রী, পালিকা)। ব্যাপ্ত অর্থে দুর্গা, কালী সহ অন্যান্য শক্তিদেবীগণও জগদ্ধাত্রী।

তবে শাস্ত্রনির্দিষ্ট জগদ্ধাত্রী রূপের নামকরণের পিছনে রয়েছে সূক্ষ্মতর ধর্মীয় দর্শন। সাধারণত কার্তিক মাসের শুক্লা নবমী তিথিতে দেবী জগদ্ধাত্রীর পুজো হয়ে থাকে। সেক্ষেত্রে নবমীর দিনই তিন বার পুজোর আয়োজন করে সপ্তমী, অষ্টমী ও নবমী পূজা সম্পন্ন করা হয়। অন্যদিকে কেউ কেউ সপ্তমী থেকে নবমী পর্যন্ত দুর্গাপুজোর ধাঁচে জগদ্ধাত্রী পুজো করে থাকেন। কোথাও বা প্রথম বা দ্বিতীয় পুজোর পর কুমারী পুজোর আয়োজন করা হয়। দুর্গাপুজোর ন্যায় জগদ্ধাত্রী পুজোতেও বিসর্জনকৃত্য বিজয়াকৃত্য নামে পরিচিত। এমনকি এই পুজোয় পুষ্পাঞ্জলি ও প্রণামে মন্ত্রের সঙ্গে দুর্গাপুজোর মিল রয়েছে ৷

উপনিষদে একটি উপাখ্যানে বলা হয়েছে – একবার দেবাসুর যুদ্ধে দেবগণ অসুরদের পরাস্ত করলেন। কিন্তু সেই সময় তাঁরা ভুলে গেলেন নিজ শক্তিতে নয়, বরং ব্রহ্মের বলে বলীয়ান হয়েই তাঁদের এই জয়। ফলত তাঁরা হয়ে উঠলেন অহংকারী। তখন ব্রহ্ম যক্ষের বেশ ধারণ করে তাঁদের সামনে আসেন। তিনি একটি তৃণখণ্ড দেবতাদের সামনে পরীক্ষার জন্য রাখলেন। কিন্তু অগ্নি ও বায়ু কেউই তাঁদের সমস্ত শক্তি প্রয়োগ করেও এই তৃণখণ্ডটিকে পোড়াতে বা সরাতে পারলেন না। তখন দেবগণ ইন্দ্রকে যক্ষের পরিচয় জানবার জন্য পাঠালেন । ইন্দ্র অবশ্য অহংকার-প্রমত্ত হয়ে যক্ষের কাছে না এসে, এসেছিলেন জিজ্ঞাসু হয়ে। তাই ব্রহ্মরূপী যক্ষ তাঁর সামনে থেকে সরে গিয়ে আকাশে দিব্য স্ত্রীমূর্তিতে আবির্ভূত হলেন হৈমবতী উমা। আর উমা ব্রহ্মের স্বরূপ ব্যাখ্যা করে ইন্দ্রের জ্ঞানপিপাসা মিটিয়েছিলেন বলেই কথিত। সেই জগদ্ধাত্রী দেবী ত্রিনয়না, চতুর্ভূজা ও সিংহবাহিনী। তাঁর চার হাতে শঙ্খ, চক্র, ধনুক ও বাণ রয়েছে আর গলায় দেখা যায় নাগযজ্ঞোপবীত।

বাহন সিংহ করীন্দ্রাসুর অর্থাৎ হস্তীরূপী অসুরের পিঠের উপর দাড়িয়ে রয়েছেন৷। দেবীর গায়ের রঙ উদিয়মান সূর্যের মতো। উপনিষদে অবশ্য উমার রূপবর্ণনা নেই। সেখানে কেবলমাত্র তাঁকে হৈমবতী অর্থাৎ স্বর্ণালঙ্কারভূষিতা বলা হয়েছে। তবে এই হৈমবতী উমাই যে দেবী জগদ্ধাত্রী সে প্রত্যয় জন্মে কাত্যায়ণী তন্ত্রের ৭৬ তম অধ্যায় উল্লিখিত এক কাহিনিতে রয়েছে ।

সেই কাহিনি অনুসারে : ইন্দ্র, অগ্নি, বায়ু ও চন্দ্র – এই চার দেবতা এমন অহংকারে মত্ত হয়ে ভুলে যান যে তাঁরা দেবতা হলেও তাঁদের স্বতন্ত্র কোনও শক্তি নেই – মহাশক্তির শক্তিতেই তাঁরা বলীয়ান। এই দেবগণের ভ্রান্তি দূর করতে দেবী জগদ্ধাত্রী কোটি সূর্যের তেজ ও কোটি চন্দ্রের প্রভাযুক্ত এক দিব্য মূর্তিতে তাঁদের সম্মুখে উপস্থিত হলেন। এই অ্যাখ্যানের পরের অংশ অবশ্য উপনিষদে দেওয়া তৃণখণ্ডের কাহিনির অনুরূপ। দেবী প্রত্যেকের সম্মুখে একটি করে তৃণখণ্ড রাখলেন; কিন্তু চার দেবতার কেউই তাকে স্থানচ্যুত বা ভষ্মীভূত করতে পারলেন না। তখন দেবগণ নিজেদের ভুল বুঝতে পারলেন। তখন দেবী তাঁর তেজোরাশি স্তিমিত করে এই অনিন্দ্য মূর্তি ধারণ করলেন। সেই মূর্তি ত্রিনয়না, চতুর্ভূজা, রক্তাম্বরা, সালংকারা, নাগযজ্ঞোপবীতধারিনী ও দেব-ঋষিগণ কর্তৃক অভিবন্দিতা এই মঙ্গলময়ী মহাদেবীর মূর্তিকে দেখে দেবগণও তাঁর স্তবে বসেন ৷