তিনি যখন দল থেকে বহিষ্কৃত হয়েছিলেন, তখনও এত প্রশ্নে ওঠেনি৷ ১৩ অক্টোবর লোকসভার প্রাক্তন অধ্যক্ষ সোমনাথ চট্টোপাধ্যায়ের জীবনাবসানের পর আলিমুদ্দিন স্ট্রিটের চার দেওযালের মাঝে উঠেছে হাজারও প্রশ্ন৷ কেউ বলছেন, রাজ্য কমিটি অন্তত শোকসভার আয়োজন করুক৷ আবার এও শোনা গিয়েছে, কেন্দ্রীয় কমিটির কিছু সদস্য নাকি সাধারণ সম্পাদক সীতারাম ইয়েচুরিকে চিঠি লিখে জানিয়েছেন, ঠিক সময় কেন্দ্রীয় কমিটিতে সোমনাথ চট্টোপাধ্যায়কে ফেরাতে পারলে সারা দেশের পার্টিকে এতটা ‘ছোট’ হতে হতো না৷ সোমনাথের মৃত্যুর পর পলিটব্যুরো যে শোকবার্তা প্রকাশ করেছে তাতেই পরিষ্কার তাঁকে নিয়ে প্রকাশ কারাটের একগুঁয়েমিকে আর প্রশ্রয় দিতে নারাজ সিপিএমের সাধারণ সম্পাদক সীতারাম ইয়েচুরি৷ সাংসদ এবং অধ্যক্ষ হিসেবে সোমনাথের অবদানকে শোকবার্তায় স্বীকার করতে বাধ্য হয় সিপিএম৷ পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য কমিটিও পরে শোকবার্তায় সোমনাথের নামের আগে কমরেড শব্দটি বসিয়ে তাঁকে শেষ শ্রদ্ধা জানিয়েছে৷ শেষযাত্রায় কমরেড সোমনাথকে সীতারামের হাত তুলে স্যালুটের দৃশ্য দেখে অনেক কমরেডেরই বেশ ভালো লাগেছে৷ অনেকেই বলেছেন, মরে অন্তত সম্মান ফিরে পেল সোমনাথদা৷ ——

দেবময় ঘোষ, কলকাতা: কেমন আছেন কমরেড জিজ্ঞাসা করার সুযোগ ছিল না৷ সংসদে অধ্যক্ষের চেয়ারে বসে সরকার-বিরোধীদের বাক্যবাণ, তর্কযুদ্ধ সামলেছেন যে ব্যক্তি, তাঁকে ২০০৮ সালে সিপিএম বহিষ্কার করার পর পার্টির কেন্দ্রীয় কমিটি ঠিক সিদ্ধান্ত নিয়েছিল, না ভুল সে বিতর্ক চলবে আরও কয়েক দশক৷ তবে জীবনাবসানের পর সব তর্কের উর্ধে গিয়েছেন যাঁরা, সোমনাথ চট্টোপাধ্যায় তাঁদের মধ্যে অন্যতম৷ ১৩ অগস্ট, ২০১৮, সোমবার রাজা বসন্ত রায় রোডের বাড়িতে জনারণ্য বারবার জানাচ্ছিল, সোমনাথবাবুর সঙ্গে সিপিএমের সম্পর্ক ছিন্ন হয়েছিল মাত্র খাতায় কলমেই৷ পার্টির কর্মী-সমর্থকদের মনে থেকে গিয়েছেন ‘কমরেড’ সোমনাথ চট্টোপাধ্যায়৷

রাজা বসন্ত রায় রোডের বাড়িতে একটু আগেই তুমুল ঝগড়া বেধেছিল৷ সোমনাথ পুত্র প্রতাপ চট্টোপাধ্যায় বাড়িতে ঢুকতেই দিতে চাননি সিপিএমের রাজ্য সম্পাদক সূর্যকান্ত মিশ্র এবং বামফ্রন্টের চেয়ারম্যান বিমান বসুকে৷ চিৎকার করে বলছিলেন, ‘‘বাবাকে সারাজীবন আপনারা শুষে খেয়েছেন৷ মৃত্যুর পর ন্যাকামি করতে …৷’’ কিছুটা সামলে নিয়েছিলেন সিপিএমের সাধারণ সম্পাদক সীতারাম ইয়েচুরি৷ মালা দিয়ে হাত তুলে কাঁচের কফিনের শয্যায় শায়িত ‘কমরেড’-কে যখন ‘সেলাম’ জানালেন সীতারাম-সূর্য-বিমান, মনে হল যেন গঠনতন্ত্রের ফাঁস থেকে মুক্ত হতে চাইছেন তাঁরা৷ একবার বলতে চাইছেন, ‘‘Sorry Comrade! আপনার প্রতি Justice করতে পারলাম না …’’

সোমনাথবাবু অবশ্য বারবার বলতেন, তিনি সবসময় সঠিক এটা ভাবার কারণ নেই৷ কখনও কেউ এভাবে ভাবতে পারেন না৷ পদত্যাগ করার অর্থ নিজের ভুল স্বীকার করে দায় এড়িয়ে যাওয়া৷ তা দায়িত্বজ্ঞানহীনতা৷ লোকসভার অধ্যক্ষের পদ না ছেড়ে তিনি যে ভুল করেছিলেন, তা প্রমাণ করতে উঠে পড়ে লেগেছিলেন যে কমরেডরা, সোমবার রাত পর্যন্ত চক্ষুলজ্জার খাতিরে তাঁরা কোনও বার্তা দিয়ে উঠতে পারেননি৷ ট্যুইটার খুঁজেও সিপিএমের তৎকালীন সাধারণ সম্পাদক প্রকাশ কারাট বা আজকের পলিটব্যুরো সদস্য বৃন্দা কারাটের শোকবার্তা চোখে পড়েনি৷ ট্যুইটারে পলিটব্যুরোর দায় সারা শোকবার্তায় সোমনাথ চট্টোপাধ্যায়ের নামের আগে কমরেডের বদলে জায়গা পেয়েছে ‘Hasgtag’ ৷ সোমনাথ চট্টোপাধ্যায় শুধুমাত্রই নাকি ১০ বারের সাংসদ, তবে তিনি যে শুধু সিপিএম থেকেই নির্বাচিত হয়েছিলেন, তা উল্লেখ করতে কী ভুলে গিয়েছিল পলিটব্যুরো? প্রশ্নের উত্তর দিতে পারেননি সূর্যকান্ত মিশ্র৷

তবে ২০০৮ সালে যদি ভুল করে থাকে সিপিএম কেন্দ্রীয় কমিটি, সেই ভুলের প্রায়শ্চিত্ত করতে আবার ভুল করেননি সূর্য মিশ্রের রাজ্য কমিটি৷ সোমবার, কমরেডের বদলে ‘Hasgtag’ জুড়ে দায়িত্ব সেরেছিল কেন্দ্রীয় কমিটি৷ আর, রাজ্য কমিটির শোক বার্তার প্রতিটি লাইনেই যেন সেই আক্ষেপ ঝরে পড়ছিল,- ‘‘ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি (মার্কসবাদী), পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য কমিটির সভা থেকে পার্টির কেন্দ্রীয় কমিটির প্রাক্তন সদস্য, বিশিষ্ট সাংসদ কমরেড সোমনাথ চ্যাটার্জির জীবনাবসানে শোক জ্ঞাপন করা হয়েছে৷’’

অসামান্য বক্তা, আকর্ষণীয় ব্যক্তিত্ব সোমনাথ চট্টোপাধ্যায়কে বলা হয় সুযোগ্য সাংসদ৷ দেশের সাধারণ জনতার প্রতি সংসদের দায়িত্ব কী? জনতা-সংসদের সম্পর্কই বা কীরূপ হওয়া উচিত তা হাতে কলমে বুঝিয়ে দিয়েছেন এই ‘কমিউনিস্ট’ স্পিকার৷ স্মৃতিচারণ করছিলেন তাঁর এক সময়ের ভাতৃপ্রতীম সাংসদ বাসুদেব আচারিয়া- ‘‘সংসদের স্থায়ী কমিটি ১৯৯৩ সালে তৈরি হলেও তা কার্যকর করা হতো না৷ সোমনাথদাই প্রতি ৬ মাস অন্তর মন্ত্রীদের বক্তব্যের ব্যবস্থা করেছেন৷ মন্ত্রীরা সংসদে কী বলছেন, তা প্রচারের ব্যবস্থা হয় লোকসভা টিভির মাধ্যমে৷ দেশের প্রতি সংসদের দায়বদ্ধতা কতটা, তা দেখতে পায় দেশের জনতা৷’’

আমেরিকার সঙ্গে পরমাণু চুক্তি পছন্দ নয়, তাই সেই সময় ইউপিএ সরকারের ওপর থেকে সমর্থন প্রত্যাহার করার ক্ষেত্র প্রস্তুত করছিল সিপিএম৷ ‘কমিউনিস্ট’ স্পিকারের সংসদের ভিতরে non-partisan ভূমিকার কথা ভুলে গিয়ে সোমনাথকে আস্থা ভোটে কংগ্রেসের বিরুদ্ধে ভোট দিতে বলা হয়৷ পার্টি চাইছিল, আস্থা ভোটের আগেই পদ ছাড়ুন স্পিকার সোমনাথ৷ পদ ছাড়েননি তিনি৷ তাই স্পিকার হিসেবে তাঁর ভোট দেওয়ার কোনও প্রশ্নই ছিল না৷ ইউপিএ সরকারের পতন হয়নি৷ তবে পার্টি থেকে একটি নক্ষত্র পতন হয়েছিল৷ লাল-জনতার কাছের মানুষ সোমনাথের বহিষ্কারের পর কন্যা অনুশীলা তাঁকে বলেছিলেন, এখন তো তুমি মুক্তপাখি বাবা৷ অনুশীলা ভুল বলেছিলেন৷ ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি (মার্কসবাদী)- দের ওই এ কে গোপালন ভবনে প্রাণটাই গচ্ছিত রেখে আবার স্পিকারের চেয়ারে দেশের দায়িত্ব পালন করতে ফিরে গিয়েছিলেন বোলপুরের সোমনাথ চট্টোপাধ্যায়৷ কমরেডরা কাঁদেন না৷ বাবার চোখে অনুশীলা যে অশ্রু দেখেছিলেন, তা যন্ত্রণার বারিধারা৷