সৌপ্তিক বন্দ্যোপাধ্যায়, কলকাতা: কলকাতা যখন জাঁকিয়ে শীতের দিকে চেয়ে থাকে। তখন ওরা চায় না বেশী ঠাণ্ডা। অল্পেতেই খুশি ওরা। আসলে অল্পেতেই খুশি থাকতে হয় ওদের। ওরা মহানগর ও তার সংলগ্ন অঞ্চলের বস্তি এবং ফুটপাথবাসী। শহরের তাপমাত্রা স্বাভাবিকে ফেরায় ওদের মুখে খুশির হাসি।

হাওড়ার টিকিয়াপাড়া রেল বস্তির রাজুকে সকাল হলেই প্লাস্টিকের বোতল কুড়োতে যেতে হয় রেললাইন ষ্টেশন থেকে। গত এক মাস ধরে প্রথমে বৃষ্টি আর তারপর থেকে হুরমুরিয়ে ঠাণ্ডা পড়েছে রাজ্যে। তখন থেকেই ওর কাজ করতে খুব অসুবিধা হচ্ছিল। মঙ্গলবার সকালে ঠাণ্ডাটা একটু যেন একটু কম। এতেই খুশি ও। বেশি চাহিদা নেই তো। অল্পেতেই খুশি।

উল্টোডাঙার সাব্বির আহমেদ, সকালে ভ্যান নিয়ে বেরোতে হয়। কারখানায় লোহা লক্কর গাড়ি করে নিয়ে পৌঁছে দিতে হয় এক মানিকতলার লোহা পট্টিতে। এই ক’দিন সকালে ভ্যানের হাতলে হাত রাখা যাচ্ছিল না। একটু জোরে প্যাডেল করলেই কাঁপিয়ে দিচ্ছিল ঠাণ্ডা হাওয়া। মঙ্গলবার সকালটা একটু যেন অন্যরকম। তুলনায় ঠাণ্ডা কম। এই বেশ ভালো। বেশী চাহিদা নেই সাব্বিরের, খুশি অল্পেতেই।

সল্টলেক-বাগমারি লাগোয়া ফুটপাথে থাকে মিনা। ওখানেই ছেঁদা হয়ে যাওয়া প্লাস্টিকের ত্রিপল দিয়ে ঘর বেঁধেছে। কিন্তু যা ঠাণ্ডা পড়েছিল! ওই একটা ছেঁড়া প্লাস্টিকে কি করে ঘুমিয়েছে ওই জানে। কম্বলটার অবস্থাও ভালো নয়। এসবের মাঝে পেটের টান। সকালবেলা ঠাণ্ডা কনকনে ট্যাঙ্কের জল দিয়ে বাসনা মাজা, ঘর পরিস্কার করা সঙ্গে আবার কাপড় কেচে দেওয়া। ঠাণ্ডায় এক এক সময় সার থাকছে না হাতের। কিন্তু কিচ্ছু করার নেই। সকালে পরের বাড়ির কাজই তো ওঁকে আর ওর পরিবারকে বাঁচিয়ে রেখেছে।

এদিন সকালে জলে হাত দিতেই আর অসার হয়ে গেল না। ঠাণ্ডাটা বোধ হয় একটু কম। এই বেশ। অল্পেতেই খুশি। চাহিদা অনেক কিন্তু না পেয়ে পেয়ে সেটা আপনা থেকেই কমে গিয়েছে। সন্তু যেমন গড়িয়াহাট এলাকায় কাগজ দেয়। উফ সেকি ঠাণ্ডা! মাফলার, উইন্ডচিটার জড়িয়েও শীত যায় না। সাইকেল চালাতে চালাতে ঠাণ্ডা হাওয়ায় বারবার চোখে জল চলে আসছে। ওদের আবার ওই সকালটাই কাজের আসল টাইম। স্টেশন লাগোয়া বসতিতে থাকে। মঙ্গলবার সকালে সাইকেল চালিয়ে যথারীতি কাগজ দিতে বেড়িয়েছিল। ঠাণ্ডা একটু কম লাগছে মনে হল। বেলা গড়াতেই উইন্ডচিটারের চেন খুলে দিতে হল। মোটের ওপর এই ঠাণ্ডাটা ঠিক আছে ওর কাছে। অল্পেতেই খুশিও।

১৬ ডিসেম্বর ২০১৮ থেকে ফেতাইয়ের জেরে বৃষ্টি হয়েছে শহরে। ১৮ তারিখ থেকে ঝড়ের প্রভাব কমে। ১৯ ডিসেম্বর এক ধাক্কায় দুই ডিগ্রি নেমে যায় শহরের পারদ। ১৯ ডিসেম্বর বুধবার সকাল থেকে আকাশ পরিস্কার হয়েছ। সঙ্গে সঙ্গেই নেমে যায় পারদ। সেদিন সকালে কলকাতার সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ছিল ১৪.১ ডিগ্রি সেলসিয়াস৷ যা স্বাভাবিকের চেয়ে ১ ডিগ্রি বেশি৷ তারপর থেকে ২০ দিন পর আবার তাপমাত্রার পারদ সর্বনিম্ন ১৩.৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস অর্থাৎ ১৪-এর আশপাশে ফিরেছে।

অপরদিকে বৃষ্টির জেরে সর্বোচ্চ তাপমাত্রা স্বাবাবিকের থেকে ৮ ডিগ্রি কমে ১৮.৯ ডিগ্রি সেলসিয়াস হয়ে গিয়েছিল। দিন কুড়ি পর সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ২৭.৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস, এটাও স্বাভাবিকের চেয়ে তিন ডিগ্রি বেশী। এটাই খুশির হাওয়া বয়ে এনেছে কলকাতার রাজপথের বাসিন্দাদের। ওরা খুশি এভাবেই। জাঁকিয়ে নয় অল্প শীতেই খুশি ওরা।

মাঝে ২৫ ডিসেম্বর ২০১৮ কলকাতার সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ১২.৯ ডিগ্রি সেলসিয়াস৷ যা স্বাভাবিকের চেয়ে ১ ডিগ্রি কম৷ সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ২৫.২ডিগ্রি সেলসিয়াস, যা আবার স্বাভাবিকের থেকে ১ ডিগ্রি কম৷ ২৬ ডিসেম্বর সর্বনিম্ন তাপমাত্রা আরও কমে ১২.০ ডিগ্রি সেলসিয়াসে, যা স্বাভাবিকের চেয়ে দুই ডিগ্রি কম। ২৭ ডিসেম্বর পারদ নেমেছে ১১.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসে, যা স্বাভাবিকের চেয়ে দুই ডিগ্রি কম।

কমেছে সর্বোচ্চ তাপমাত্রাও। সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ২৪.১ ডিগ্রি সেলসিয়াস, যা স্বাভাবিকের চেয়ে এক ডিগ্রি কম। বিকালে সর্বোচ্চ ২৩.৬ ডিগ্রি সেলসিয়াসে। এবং ২৮ ডিসেম্বর সকালের পারদ মাত্রা ১১.২ ডিগ্রি সেলসিয়াস। এবং ২৯ ডিসেম্বর ১০.৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস স্বাভাবিকের চেয়ে তিন ডিগ্রি কম ছিল। সর্বোচ্চ ২৩.২ ডিগ্রি সেলসিয়াস। ৩০ ডিসেম্বর ফের তাপমাত্রা ফেরে ১২-র ঘরে। মঙ্গলবারের সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ১২.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস, যা স্বাভাবিকের এক ডিগ্রি কম। সেই থেকেই পারদ চড়ছে শহরের। আজ যা স্বাভাবিকে এসে পৌঁছেছে।