সংকল্প সরকার: আজ তিনি এসেছেন। বৈকুণ্ঠ নগর ছেড়ে, স্বামীটিকেও ছেড়ে। আশ্বিনের এই হিম হিম সন্ধ্যায়, শারদ পূর্ণিমার চাঁদের আলোয় যখন ভেসে যাবে চরাচর তখন পেঁচাকে বাহন করে ধীরে ধীরে নেমে আসবেন ধরিত্রীর বুকে। তারপর এগিয়ে যাবেন গৃহস্থের দাওয়ার নকশি-কাঁথার মতো আলপনার দিকে। পা রাখবেন সেখানে।অনুসরণ করবেন পিটুলি দিয়ে আঁকা ধানের শিষের পাশে পাশে ছোট্ট ছোট্ট পায়ের ছাপকে। সবার অলক্ষ্যে প্রবেশ করবেন গৃহস্থের ঘরে ঘরে।

আজকের রাত কোজাগরী রাত। নিদ্রা নিষিদ্ধ এ রাতে। কেননা, পৃথিবী পরিক্রমায় বেরবেন দেবী। হাঁক দেবেন, কে জাগে রাত্রি?’ নিশীথে বরদা লক্ষ্মীঃজাগরত্তীতিভাষিণী’। যে জাগে এই রাত ধনসম্পদ তার, বাকিদের হাহাকার! ‘তস্মৈ বিত্তং প্রযচ্ছামি অক্ষৈঃ ক্রীড়াং করোতি যঃ’। অর্থাৎ আজ রাতে যে পাশা খেলবে দেবী তাকেই বিত্ত দেবেন। কিন্তু অনেকের মতে, শ্লোকে যে অক্ষের কথা বলা হয়েছে তা একার্থ বাচক নয়।এর অনেক অর্থ। এক, পাশা খেলা; দুই, ক্রয়-বিক্রয়ের চিন্তা; তিন, রুদ্রাক্ষ। তাই এই রাতে জুয়াড়িরা দেবেন জুয়ার দান, ব্যবসায়ীরা ভাববেন ব্যবসার কথা আর যোগীরা জপমালা জপতে জপতে রাত কাটিয়ে দেবেন।

‘শ্রী শ্রী লক্ষ্মীদেবীর ব্রতকথা ও পাঁচালী’তে পাই যে, দেবী চঞ্চলা, চপলা। তাঁর স্থিতি নেই। সন্ধ্যাবেলায় যারা নিদ্রা যায়, ধূপদীপ জ্বালে না; যারা বাসি বস্ত্র পরিধান করে, যারা পরশ্রীকাতর, মন যাদের কুটিলতাময় তাদের ঘরে লক্ষ্মী বসত করে না। এইসব দোষমুক্ত হলে লক্ষ্মী অচলা হয়ে থাকতে পারেন। আজ এই প্রদোষকালে কোজাগরী লক্ষ্মীদেবীর রূপভেদ ও তাঁর বাহন পেঁচককে নিয়ে দু’চার কথা বলি।

নানারূপে পূজিতা হন কোজাগরী লক্ষ্মী। মাটির তৈরি মূর্তিতেই পূজিতা হন অধিকাংশ ঘরে। আর এক ধরণের লক্ষ্মী ছিল– ‘আড়ি লক্ষ্মী’। বেতের তৈরি ঝুড়িতে ধান ভর্তি করে তার উপর দুটো কাঠের লম্বা সিঁদুর কৌটো লাল চেলিতে মুড়িয়ে লক্ষ্মীদেবীর রূপ দেওয়া হত।

কলার বাকল চোঙাকৃতি করে নারকেলের শলা দিয়ে আটকে দিয়ে ‘বের’ তৈরি করা হয়। তাতে সিঁদুর দিয়ে এঁকে দেওয়া হয় স্বস্তিকা চিহ্ন। কাঠের আসনের উপর আলপনা দিয়ে লক্ষ্মীর পা অঙ্কিত করে ন’টি কলার বের রাখা হয়ে। ‘কলার বের’-গুলো পঞ্চশস্যে পূর্ণ করা হয়। সর্বশেষে সশীষ ডাব রেখে লাল চেলি মুড়িয়ে বউ সাজিয়ে লক্ষ্মীরূপে পুজো করা হয়।

কোনও কোনও গৃহস্থের গৃহে নবপত্রিকা বা কলার পেটোয় তৈরি তরী এই পুজোর অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। একে বলা হয় ‘সপ্ততরী’। একে বাণিজ্যের নৌকো হিসেবে বিবেচনা করা হয়। চাল, ডাল, পয়সা, কড়ি, হলুদ, হরিতকী প্রভৃতি উপকরণে সাজিয়ে তোলা হয় নৌকোটিকে।

সরার পটচিত্রে লক্ষ্মীপুজো পূর্ববঙ্গীয় রীতি। সরার বৈচিত্র‍ে রয়েছে রকম ফের। একলক্ষ্মী সরায় দেবীর দু’পাশে দুটো পদ্ম, নীচে পেঁচা। আবার সরায় তিন, পাঁচ, সাত পুতুলও আঁকা হয় অঞ্চলভেদে। সুরেশ্বরী সরায় দুটো অংশ থাকে। উপরের ভাগে সপরিবারে মহিষমর্দিনী দুর্গা; আর নীচের ভাগে সবাহন লক্ষ্মী।

আবার কোনও কোনও স্থানে পোড়ামাটির ঘটে লক্ষ্মীর মুখ অঙ্কন করে চাল অথবা জল ভরে কোজাগরী লক্ষ্মীরূপে পুজো করা হয়। গোড়ায় লক্ষ্মীর বাহন হিসেবে হরিণ, ময়ূর, কখনও হাঁস পরিলক্ষিত হয়। বাহন হিসেবে পেঁচার আবির্ভাব অনেক পরে।আধুনিককালে।

লক্ষ্মী শস্যের দেবী। রাতেই শস্য ও সম্পদ পাহারায় থাকা অত্যন্ত জরুরি। আর এই কাজে পেঁচার জুড়ি মেলা ভার। কেননা, পেঁচা রাতে দেখতে পায়, ঘাড়টি সবদিকে ঘোরাতে সক্ষম, তদুপরি তার রয়েছে তীক্ষ্ণ নখ ও চঞ্চু। ফলে, অনায়াসেই শস্য অনিষ্টকারী ইঁদুরকে ছিঁড়েখুঁড়ে দিতে পারে। তাই শস্য ও সম্পদের রক্ষাকারী হিসেবে, মনে হয়, পেঁচাকে লক্ষ্মীর এত পছন্দ!