নিখিলেশ রায়চৌধুরী বিশিষ্ট সাংবাদিক
নিখিলেশ রায়চৌধুরী
বিশিষ্ট সাংবাদিক

দিন যত যাচ্ছে, ইসলামিক স্টেটের তাণ্ডব ততই সাংঘাতিক আকার নিচ্ছে৷শুধু তাই নয়, এবার এই ঘাতক বাহিনী হুবহু আল-কায়েদার পন্থায় একযোগে একাধিক মহাদেশে হামলা চালাচ্ছে৷ শুক্রবার পবিত্র রমজানের মধ্যে তাদের হামলার বলি হয়েছেন শ তিনেক মানুষ৷ ইউরোপে ফ্রান্স, আফ্রিকায় তিউনিশিয়া এবং পশ্চিম এশিয়ায় সিরিয়া ও কুয়েত, সর্বত্র তাদের হিংস্র নখের আঘাতে ছিন্নবিচ্ছিন্ন ও রক্তাক্ত হয়েছে জনজীবন৷

১৯৯৮ সালের ৭ আগস্ট অনেকটা এই ভাবেই কেনিয়া ও তানজানিয়ার মার্কিন দূতাবাসে ফিদায়েঁ হামলা চালিয়ে প্রায় আড়াইশ মানুষকে হত্যা করেছিল ওসামা বিন লাদেন ও আয়মান আল-জাওয়াহিরির আল-কায়েদা৷ওই ঘটনার পরেই আমেরিকা প্রথম তাদের বিরুদ্ধে নড়েচড়ে বসে৷ তালিবান-শাসিত আফগানিস্তানে তাদের ক্ষেপণাস্ত্র হানা থেকে অল্পের জন্য রক্ষা পায় ওসামা বিন লাদেন৷

এক সময় আল-কায়েদার রণকৌশলের একটি অঙ্গ ছিল, যখন তারা আক্রমণ হানত তখন তারা একযোগে একাধিক জায়গায় আঘাত করত৷এমনকী, ২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বর তারা আমেরিকার মাটিতে শুধু ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টারের জোড়া টাওয়ারকেই নিশানা করেনি, পেন্টাগন ও হোয়াইট হাউসও তাদের লক্ষ্য ছিল৷ যে প্লেনটি নিয়ে ফিদায়েঁ জঙ্গিরা হোয়াইট হাউসে আছড়ে পড়বে ভেবেছিল, সেই বিমানের যাত্রীরাই তাদের সেই মারাত্মক প্রয়াসের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ান৷ ফলস্বরূপ প্লেনটি মাঝপথে ভেঙে পড়ে৷একই দিনে আল-কায়েদা আরও একটি হামলা চালায়৷এবং, তা সুদূর আফগানিস্তানে৷তাদের পাঠানো ফিদায়েঁদের টেপ রেকর্ডার বোমায় উড়ে যান এক সময়কার আফগান যুদ্ধের কিংবদন্তি নেতা, ‘পাঞ্জশিরের সিংহ’ আহমেদ শা মাসুদ৷আল-কায়েদার এহেন মোডাস অপারেন্ডি পরেও দেখা গিয়েছে৷শুধু তাই নয়, বিভিন্ন মহাদেশে একযোগে আঘাত হানার জন্য আল-কায়েদাও বহুবার বেছে নিয়েছে এই রকম পবিত্র রমজানের সময়কেই৷

১৯৮৯ সালে রুশবিরোধী আফগান যুদ্ধের শেষে বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে পড়া জেহাদিদের বিভিন্ন সংগঠন ক্রমে যে আল-কায়েদার ছাতার তলায় জড়ো হয়েছিল, আজকের আইএস সেই আল-কায়েদার কাঠামোর চাইতে আরও বেশি মজবুত এবং ধারাল৷ যে কোনও আন্তর্জাতিক স্তরের সন্ত্রাসবাদী প্যাটার্নের এটাই স্বাভাবিক ঝোঁক৷সন্ত্রাসের মিউটেশন এবং ক্রমবিবর্তন যখন ঘটে, তখন তা আগের প্রবণতার চাইতেও মারাত্মক হয়৷ আইএস যে আল-কায়েদার চাইতেও বিষাক্ত আর বিপজ্জনক হবে তাতে আর আশ্চর্য কী? এতবড় বিপদের মুখেও হাসি পায় এই ভেবে যে, এখন আল-কায়েদাও আইএসকে ডরায়৷তারা আইএসকে ঠান্ডা করতে অধিকৃত ইরাকে দূত পাঠিয়েছিল৷আইএসের ঘাতকেরা তাদের কোতল করে দিয়েছে৷

তবে আল-কায়েদাও যেমন স্বতঃস্ফূর্তভাবে গড়ে ওঠা কোনও সন্ত্রাসবাদী নেটওয়ার্ক নয়, ঠিক তেমনই আইএসও নয়৷ তাদের পিছনে খুব জোরদার কোনও মাথা কিংবা রাষ্ট্রীয় শক্তি না থাকলে তাদের এ রকম বাড়বাড়ন্ত কোনও দিনই ঘটত না৷

আসলে, একদিকে হাফিজ আল-আসাদ এবং তাঁর জীবনাবসানের পর বাশর আল-আসাদের সিরিয়াকে এবং অন্যদিকে শাহ-পরবর্তী ইরানকে টাইট দিতে মূলত সিআইএ এবং ইজরায়েলের গুপ্তচর বাহিনী মোসাদের মদতে সৌদি রাজপরিবার-তুরস্ক সরকার এবং আরবের বিভিন্ন শেখশাহিকে নিয়ে পশ্চিম এশিয়ার বুকে যে নয়া অক্ষশক্তি গড়ে উঠেছে, আইএসআইএস ফলত তাদেরই গর্ভস্রাব৷ আর সে কারণেই অনেক তর্জন-গর্জন করলেও আইএসের বিরুদ্ধে আমেরিকার প্রশাসন আদৌ কোনও যুৎসই সামরিক পদক্ষেপ নিচ্ছে না৷উলটে, আইএসের আক্রমণের অভিমুখ তারা মার্কিন-পোষিত ইরাকি সরকারের দিক থেকে ফের বাশর আল-আসাদের দিকে ঘুরিয়ে দিয়েছে৷

অথচ, চাইলে কীভাবে কাঁটা দিয়ে আইএসের মতো কাঁটাকে উপড়ে ফেলতে হয়, তার রাস্তা দেখিয়ে গিয়েছে আলজেরিয়া সামরিক শক্তি৷ নয়ের দশকে আফগানিস্তান ফেরত সন্ত্রাসবাদীরা যখন আলজেরিয়ায় ফিরে অবিরাম গণহত্যালীলা চালিয়ে রক্তের বান ডাকিয়েছিল, তখন সেখানকার সামরিক সরকার তাদের প্রতি এতটুকুও সহানুভূতি দেখায়নি৷সেই সময়কার বিভিন্ন ‘হিউম্যান ওয়াচ’ সংস্থা আলজেরিয়ার সামরিক শক্তির নির্মমতা নিয়ে বিলেত-আমেরিকায় অনেক কুমিরের কান্না কেঁদেছিল৷তা সত্ত্বেও আলজেরিয়ার সামরিক কর্তারা এতটুকু বিচলিত হননি৷ট্যাঙ্কের নীচে নিরীহ মানুষের গলা কাটায় দড় সন্ত্রাসবাদীদের তাঁরা পিষে দিয়েছিলেন৷আলজেরিয়া সন্ত্রাসমুক্ত হয়েছিল৷

ভূরাজনীতির কূটকচালিকে আপাতত পাশে সরিয়ে রেখে, সিরিয়ার সরকারের সঙ্গে হাতে হাত মিলিয়ে আমেরিকা তথা ন্যাটোও যদি না একইভাবে আইএসের বিরুদ্ধে আসরে অবতীর্ণ হয়, তাহলে আগামী দিনে আরও ভয়ংকর অবস্থার সম্মুখীন হতে হবে গোটা বিশ্বকে৷ প্রেসিডেন্ট ওবামা কি দেখতে চান যে, এর পর তাঁর প্রিয় আমেরিকারই বিভিন্ন শহরে আইএসের ঘাতকবাহিনী ফেথফুল সিটিজেনদের লিনচ করে বেড়াচ্ছে?