সংসারে নিজের নাক কেটে পরের যাত্রাভঙ্গ করার মতো লোকের অভাব নেই৷ তবে কেউ কেউ নাকি নাক কেটে যাত্রা শুরুও করতে পারে৷ অন্তত সংঘ পরিবার ও বিজেপির ছোট-মাঝারি নেতারা যেভাবে কোমর বেঁধে অসহিষ্ণুতার প্রশ্নে শাহরুখ খানকে আক্রমণ করতে নেমেছেন, তাতে এমনটাই মনে হচ্ছে৷ ইতোমধ্যেই শাহরুখকে নিয়ে এঁদের অসহিষ্ণুতা যেভাবে মাথাচাড়া দিয়েছে, তাতে অচিরেই শাহরুখ যদি সহিষ্ণুতার প্রতীক হয়ে ওঠেন, তবে আশ্চর্য হওয়ার কিছু থাকবে না৷

বলিউডের খানদানি পরিবারে শাহরুখ খান খানিকটা আলাদাই৷  প্রথমত জন্মসূত্রে তিনি গ্ল্যামার দুনিয়ার শৌখিন পরিবারের সদস্য নন৷ সলমন খান বা আমির খান ফিল্মি পরিবারের সন্তান হওয়ার যে সুবিধা পেয়েছেন তা তাঁর ক্ষেত্রে গোড়াতেই খারিজ হয়ে যায়৷ একেবারে ‘জিরো’ থেকে তিনি তাঁর কেরিয়ার শুরু করে আজ সাফল্যের শীর্ষে পৌঁছেছেন৷ ফলত নায়ক হিসেবে তিনি পরদায় স্বপ্ন দেখান তো বটেই, কিন্তু তাঁর জীবনেও তিনি একটা বাস্তবসম্মত স্বপ্নই দেখান৷ফলত তিনি রুপোলি স্বপ্নের ফেরিওয়ালা ঠিকই, কিন্তু অনেক বিশ্বাসযোগ্য এবং গ্রহণযোগ্যতার সঙ্গে তিনি তাঁর স্বপ্ন ফেরি করেন৷ দ্বিতীয়ত, ব্যক্তিজীবনে শাহরুখ বিয়ে করেছেন এক হিন্দু রমণীকেই৷ বলিউডের অপরাপর নায়কদের মতো একাধিকবার বিয়ের ইতিহাস তাঁর নেই৷ এমনকী বলিউডের অতিবড় নায়কের নামেও প্রেমের গুঞ্জন আছে, কিন্তু শাহরুখ একেবারেই নিপাট বিবাহিত একজন অভিনেতা, যিনি রোম্যান্টিক হিরো হিসেবে প্রতিষ্ঠা পেয়েছেন৷ কোনও কোনও নায়কের মতো নায়িকাদের সঙ্গে ঘুরে কৃষ্ণসার হরিণ মারা কিংবা বেআইনি অস্ত্র রাখার hqdefaultমতো দুর্নামও তাঁর নামের সঙ্গে কখনও জোড়েনি৷ এমনকী পানশালায় বসে মাথাগরম করার মতো ঘটনাও তাঁর কেরিয়ারে নেই৷ বলিপাড়ার গ্ল্যামার দুনিয়ার প্রায় শীর্ষে বসেও, শীর্ষ বাসিন্দাদের এই রকম রোগ-ব্যাধির আক্রমণ থেকে মোটামুটি নিজেকে মুক্তই রাখতে পেরেছেন তিনি৷ এই সবকিছুই স্বাধীনতা সংগ্রামী পরিবারের এই সন্তানকে এক অন্য রকমের গ্রহণযোগ্যতা দিয়েছে তাঁর ফ্যানদের এবং দেশবাসীর কাছেও৷ সিনেমার ইতিহাসে এক-একটি দশক এক-একজনের শাসনে যায় ঠিকই, কিন্তু রুপোলি পর্দার বাইরের ব্যক্তিকে নিয়ে সব সময় ততখানি গ্রহণযোগ্যতার বাতাবরণ তৈরি হয় না৷ সলমন খান বা সঞ্জয় দত্ত বা সইফ আলি খানরা ‘মিঞা’, ‘বাবা’ বা ‘নবাব’ যাই হোন না কেন, জনতা তাঁদের কাউকেই তাই ‘কিং’ বানায়নি৷ মনে হতে পারে যে, এ একান্তই শাহরুখ প্রশস্তি, কিন্তু আমজনতার দরবারে তাঁর এই স্বীকৃতি কখনই অস্বীকার করা যেতে পারে না৷ আর তাই অসহিষ্ণুতা নিয়ে তিনি যখন মুখ খোলেন, তখন তাঁর নিরাপত্তা বাড়ানোর ভার নিয়ে সরকারকেই বাড়তি পুলিশ মোতায়েন করতে হয়৷

নায়ক হিসেবে নিজেকে ভালো বা খারাপ যে জায়গাতেই নিয়ে যান না কেন, ব্যবসায়ী হিসেবে প্রচারের যত রকম পন্থাই অবলম্বন করুন না কেন, ব্যক্তি মানুষ হিসেবে শাহরুখ কখনই হিপোক্রেসিকে প্রশ্রয় দেননি৷ যখন মনে করেছেন , আইপিএলে পাকিস্তানি ক্রিকেটারদের অন্তর্ভুক্তি প্রয়োজন, তখন তা বলেছেন৷ শাহরুখ কি জানতেন না, এ নিয়ে বিতর্ক হতে পারে? জানতেন না কি যে, তাঁকে কাঠগড়ায় তোলা হতে পারে? হয়েওছিল৷ শিবসেনা তো আক্রমণই করেছিল৷ তখনও তাঁকে বলা হয়েছিল পাকিস্তানের চর৷ বছর পাঁচেক আগে ‘‘আউটলুক’’ পত্রিকায় খেদ জানিয়ে লিখেছিলেন, ‘I sometimes become the inadvertent object of political leaders who choose to make me a symbol of all that they think is wrong and unpatriotic about Muslims in India. There have been occasions when I have been accused of bearing allegiance to our neighbouring nation rather than my own country—this even though I am an Indian whose father fought for the freedom of India. Rallies have been held where leaders have exhorted me to leave my home and return to what they refer to as my “original homeland”. Of course, I politely decline each time, citing such pressing reasons as sanitation works at my house preventing me from taking the good shower that’s needed before undertaking such an extensive journey. I don’t know how long this excuse will hold though.’’ ২০১৫-তে দাঁড়িয়ে শাহরুখ নিশ্চয়ই বুঝতে পারছেন কত দিনের কোনও শেষ নেই, অন্তত দেশটার নাম যখন ভারতবর্ষ৷


পাবলিসিটি নায়কদের দরকার হয় ঠিকই, কিন্তু প্রচারের হাজারো ফন্দিফিকির তাঁর জানা আছে৷ অন্তত অসহিষ্ণুতা নিয়ে মন্তব্য করে শাহরুখের মতো নায়ককে যে প্রচার কুড়াতে হবে না, তা ভালোই জানে গোটা দেশের মানুষ৷তাই বলিউডি নায়িকদের মতো স্রেফ সেলফিসর্বস্ব না হয়ে অসহিষ্ণুতা নিয়ে মুখ খুলে তিনি যে সামাজিকতার পরিচয় দিয়েছেন, তাতে তাঁর সেই গ্রহণযোগ্যতা আরও বেড়েছে বই কমেনি৷


কিন্তু এত অভিযোগের পরও তাঁর জনপ্রিয়তায় কিন্তু ভাটা পড়েনি৷ যাঁরা তাঁর বিরুদ্ধে আক্রমণের তির শানিয়েছেন, তাঁরা বরং বিভিন্ন সময়ে অস্তিত্বসংকটে ভুগেছেন৷ তাঁর ২৫ বছরের কেরিয়ারে সরকারও এসেছে, গিয়েছে৷ এর নামে স্ক্যামের অভিযোগ তো ওর নামে দাঙ্গার অভিযোগ৷ আর এসবের মধ্যেই শাহরুখ থেকে গিয়েছেন একই রকমভাবে৷ টুইটারে তাঁর অনুগামীর সংখ্যা কবেই বেড়ে হয়েছে ১৫ মিলিয়ন৷ তাঁর সাম্প্রতিক ছবি নিয়ে অনেক ভক্তের মনেই অসন্তোষ জন্মেছে, কিন্তু কখনও তাঁর ব্যক্তিজীবন নিয়ে কোনও প্রশ্ন ওঠেনি৷ তাঁর ধর্মাচরণ নিয়ে কখনও এমন কিছু হয়নি যা জনমানসে তাঁর সম্পর্কে বিরূপ প্রতিক্রিয়া তৈরি করে৷ কখনও সিনেমা সংক্রান্ত বা বিজ্ঞাপনের কাজে2015110554L তিনি এমন কিছু করেছেন, যাতে হয়তো তাঁর ভক্তরা ক্ষুণ্ণ হয়েছেন৷ কিন্তু সে তো আলাদা প্রসঙ্গ৷ পেশাদার অভিনেতা ও ব্যবসায়ী হিসেবে এথিকসের সীমা-পরিসীমা কতটা তা নির্ধারণের তথাকথিত কোনও মাপকাঠি নেই৷ কিন্তু গড়পড়তা সমাজজীবনে শাহরুখ যে জীবনযাপনের নমুনা তুলে ধরেন তা ছাপোষা যে কোনও সাধারণ নাগরিকেরই৷ মধ্যবিত্ত মূল্যবোধের একটা খোঁজ এখনও তাঁর কাজে পাওয়া যায়৷ এমনকী নিরাপত্তাকর্মীদের সঙ্গে আঙুল তুলেও যদি তিনি কথা বলেন, তবে তা করেন নিজের সন্তানদের জন্য৷ নিজের স্ত্রীকে তাঁর ধর্মাচরণে স্বাধীনতা দেন৷ গোঁড়া ইসলামপন্থীদের মধ্যেও তিনি নেই, কেননা তিনি বলেন, তাঁর ইসলাম ধর্ম তাঁকে সবার আগে ভালোবাসার কথা ও নারীদের সম্মান দেওয়ার শিক্ষা দিয়েছে৷ তিনি সেই ধর্মই পালন করেন৷ নিজের সন্তানসন্ততিকেও মানুষ করছেন সেই সংস্কৃতি মেনেই৷ সিনেমার খাতিরে তাঁকে অনেক সময়ই ‘ডায়াস্পোরা ডার্লিং’ বলা হয়৷ ব্যক্তিজীবনেও সেই প্যান ইন্ডিয়া সংস্কৃতিকেই জীবনযাপনের মডেল হিসেবে তুলে ধরেছেন তিনি৷ আর সর্বোপরি, গত দু’দশকে বেশ কয়েক অর্থনৈতিক বছর ধরেই ভারতীয় করদাতাদের মধ্যে প্রথম পাঁচজনের মধ্যেই থাকেন তিনি৷

তো এই শাহরুখ খান যখন অসহিষ্ণুতার প্রশ্নে মুখ খুলেছেন, রে রে করে তেড়ে উঠেছেন সংঘ পরিবারের সদস্যরা৷ কে আগে তাঁকে পাকিস্তানি এজেন্ট বলবেন, আর কে তাঁকে দেশদ্রোহী বলবেন তার যেন হিড়িক পড়ে গিয়েছে৷ রাঘববোয়ালরা চুপ থাকলেও মাঝারি রুই-কাতলারাই ঘাই দিচ্ছেন বেশি৷ সম্ভবত ধর্মের ঠুলি চোখে পরে ওঁরা ভুলে গিয়েছেন শাহরুখ এদেশের জনপ্রিয়তম নায়ক৷ রুপোলি পরদার নায়ক হিসেবে তাঁর জনপ্রিয়তা আর ব্যক্তিমানুষ হিসেবে সাধারণের চোখে তাঁর গ্রহণযোগ্যতা তাঁকে এমন এক ব্যাপ্তি দিয়েছে, যার ধারকাছ দিয়ে যান না তথাকথিত জননেতারা৷ তিনি এমন একজন মানুষ, যাঁর ভাবনায় অনেককেই প্রভাবিত করতে পারেন৷ এবং করছেনও৷ পাবলিসিটি নায়কদের দরকার হয় ঠিকই, কিন্তু প্রচারের হাজারো ফন্দিফিকির তাঁর জানা আছে৷ অন্তত অসহিষ্ণুতা নিয়ে মন্তব্য করে শাহরুখের মতো নায়ককে যে প্রচার কুড়াতে হবে না, তা ভালোই জানে গোটা দেশের মানুষ৷তাই বলিউডি নায়িকদের মতো স্রেফ সেলফিসর্বস্ব না হয়ে অসহিষ্ণুতা নিয়ে মুখ খুলে তিনি যে সামাজিকতার পরিচয় দিয়েছেন, তাতে তাঁর সেই গ্রহণযোগ্যতা আরও বেড়েছে বই কমেনি৷ নানা কারণে যাঁরা তাঁর উপর বিরূপ ছিলেন, তাঁরাও তাঁদের সমর্থনটুকু তুলে দিচ্ছেন এই নায়কের হাতে৷ কেননা তথাকথিত গণতান্ত্রিক এই দেশে তাঁকেই যে আক্রমণের মুখে পড়তে হচ্ছে, তাতে সাধারণ মানুষের দশা যে কী হবে তা সহজেই অনুমেয়৷ সহিষ্ণু ও অসহিষ্ণুতার প্রশ্নে আরএসএস ও বিজেপির বদহজম এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, তাদের প্রতিআক্রমণই শাহরুখকে অসহিষ্ণুতার উলটোপিঠে প্রতিনিধিস্বরূপ করে তুলছে ধীরে ধীরে৷ এই ভূমিকা অমিতাভ বচ্চন থেকে রণবীর কাপুর কেউই নিতে পারেননি, মনে হয় না পারবেনও৷ ঘোষিতভাবে না হলেও তিনিই ক্রমশ হয়ে উঠছেন সহিষ্ণুতার অ্যাম্বাসাডার৷ আদিত্যনাথ যোগী বলছেন, লোকে সিনেমা না দেখলে শাহরুখ পথে বসবেন৷ খাঁটি কথা৷ কিন্তু শাহরুখের অসংখ্য ফ্যানেরা যদি তাঁর মতাদর্শে চালিত হয়ে ভোটবাক্সে তার প্রতিফলন দেখায়, তবে আদিত্যনাথরা বসার মতো পথ পাবেন তো! শাহরুখকে নিয়ে রাজনীতি করতে গিয়ে কারবারীরা হয়তো সাময়িক লাভটুকুই দেখছেন৷ সুদূরপ্রসারী ফলাফল খেয়াল করার মতো ধৈর্য তাঁদের নেই৷ নেই বলেই বোধহয় সাধ্বী প্রাচী, আদিত্যনাথরা নিজের নাক কেটে যেন সহিষ্ণুতার অ্যাম্বাসাডার শাহরুখের যাত্রাপথটাই তড়িঘড়ি খুলে দিচ্ছেন৷

সরোজ দরবার