ধর্নামঞ্চে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। ছবি-মিতুল দাস

গৌতম রায়: ছয়ের দশকে পশ্চিমবঙ্গে প্রথম অকংগ্রেসী সরকারের মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে নিজের সরকারেরই বিরুদ্ধে কার্জন পার্কে অনশনে বসেছিলেন যুক্তফ্রন্টের অজয় মুখোপাধ্যায়। সেই অনশন ছিল মন্ত্রীসভার শরিকদল গুলির সঙ্গে মুখ্যমন্ত্রীর মনোমালিন্যকে ঘিরে। নিজের সরকারকেই মুখ্যমন্ত্রী অজয়

গৌতম রায়

বাবু ‘ অসভ্য বর্বর মন্ত্রীসভা ‘ বলে প্রকাশ্যে মন্তব্য করেছিলেন। শরিক দলের সঙ্গে মতবিরোধের জেরে সেদিনের মুখ্যমন্ত্রী অজয়বাবুর কার্জন পার্কে ধর্নায় বসেন৷

এদিকে এবার কলকাতার পুলিশ কমিশনার রাজীবকুমার সারদা তদন্তে সিবিআই কে সঠিক ভাবে সহযোগিতা করছেন না– এই অভিযোগ বার বার ওঠার পর রাজীবকুমারের বাড়িতে কিছু সিবিআই অফিসার যাওয়ার প্রেক্ষিতে বর্তমান মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের মেট্রো চ্যানেলে ধর্নার প্রেক্ষিত কিন্তু সম্পূর্ণ আলাদা।

প্রথম প্রশ্ন হলো; মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় মেট্রো চ্যানেলে কোনো রকম রাজনৈতিক অবস্থান, ধর্না নিষিদ্ধ করেছেন।নিজের নিষেধাজ্ঞা ভেঙে তিনি নিজে কি করে মেট্রো চ্যানেলে অবস্থানে বসেন?

দ্বিতীয় প্রশ্ন, পুলিশ কমিশনার রাজীবকুমারের বাড়িতে সিবিআই অফিসার যাওয়ার প্রেক্ষিতে রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী কি করে দুর্নীতির মতো একটি ইস্যুর পরিপ্রেক্ষিত থাকা স্বত্ত্বেও তাঁর অধস্থন একজন সরকারী কর্মচারীর বাড়িতে ছুটে যান? মুখ্যমন্ত্রীর সিবিআই র তৎপরতা নিয়ে যদি কোনো প্রশ্ন থাকে , তাহলে তিনি পুলিশ কমিশনারকে ডেকে পাঠাতে পারতেন।কিংবা পুলিশ কমিশনারের যদি মুখ্যমন্ত্রীর সঙ্গে কোনো আলোচনা থাকতো( যে আলোচনা মুখ্যমন্ত্রী পৌঁছানোর পর পুলিশ কমিশনারের বাড়িতে হয়েছে বলে সংবাদ মাধ্যমের খবর) ,তাহলে পুলিশ কমিশনার নিজে ছুটে যেতে পারতেন মুখ্যমন্ত্রীর কাছে।

এসব না হয়ে মুখ্যমন্ত্রী নিজে যাবতীয় প্রটোকল ভেঙে ছুটে গেছেন এক অধস্তন পুলিশ অফিসারের বাড়ি।মুখ্যমন্ত্রীর এই অতি তৎপরতা সাধারণ মানুষকে মুখ্যমন্ত্রী সম্পর্কে সন্দিহান করে তোলার সুযোগ এনে দিয়েছে।

সংবাদমাধ্যমে যে সন্দেহ অনেক দিন ধরেই দানা বাঁধছে, সারদা কলেঙ্কারীর প্রমাণ লোপাটের যে অভিযোগ তৎকালীন সিট প্রধান রাজীবকুমারের বিরুদ্ধে রয়েছে, সেই রাজীবকুমার কে এ রাজ্যের প্রশাসনিক প্রধান স্বয়ং আড়াল করতে চাইছেন– মুখ্যমন্ত্রীর এই অতি তৎপরতা সেই অভিযোগ, সন্দেহ, সংশয়কেই কি মান্যতা দিল না?

তৃতীয়ত, রাজীবকুমারের বাড়ির সামনেই মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ঘোষণা করেন , সি বি আই এর এই অতি তৎপরতার বিরুদ্ধে তিনি মেট্রো চ্যানেলে অবস্থানে বসবেন।যথারীতি তিনি অবস্থানে বসেন।অবস্থানের প্রথম রাতেই দেখা যায় মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের এই রাজনৈতিক অবস্থান, ধর্না মঞ্চে আলো করে বসে আছেন স্বয়ং রাজীবকুমার ।তাছাড়াও ছিলেন সুরজিৎ করপুরকায়স্থ সহ এক ঝাঁক প্রথম সারির পুলিশ অফিসার।এই মঞ্চে সি বি আই ঘিরে নিজের বর্তমান অবস্থান নিয়ে মুখ্যমন্ত্রী মমতা রাজনৈতিক আক্রমণ করতে থাকেন দেশের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে। প্রশ্ন হলো; রাজীবকুমার বা সুরজিৎ করপুরকায়স্থ সহ অন্যান্য আই পি এস অফিসারেরা কিভাবে মুখ্যমন্ত্রী তথা তৃণমূল কংগ্রেসের সুপ্রিমো মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের রাজনৈতিক ধর্না মঞ্চে মমতার সঙ্গে ধর্ণাতে বসেন?

আই পি এস অফিসারেরা কি কোনো রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বের সঙ্গে প্রকাশ্যে রাজনৈতিক আন্দোলনে অংশগ্রহণ করতে পারেন? এই আই পি এস অফিসারেদের প্রতি শাসক ছাড়া অন্যান্য বিরোধী রাজনৈতিক দলের নেতা, কর্মী, সমর্থকেরা ভরসা রাখবেন কি ভাবে? এইসব আই পি এস অফিসারেরা আগামী নির্বাচনে কিভাবে নিরপেক্ষ প্রশাসকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হতে পারবেন? এঁরা এবং এঁদের যিনি ওই রাজনৈতিক মঞ্চে নিয়ে এসেছিলেন, সেই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় , কেবলমাত্র এইসব অফিসারদেরই বিশ্বাসযোগ্যতা নষ্ট করলেন না, তাঁরা গোটা আইপিএস পরিমন্ডলটির ই কেবল রাজ্যের সামনে নয়, দেশের মানুষদের সামনে বিশ্বাসযোগ্যতা নষ্ট করলেন।

বিরোধী নেত্রী থাকাকালীন এই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় কথায় কথায় সি বি আই তদন্ত চাইতেন।মুখ্যমন্ত্রী হয়ে সেই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ই নারদা তদন্ত আটকাতে সাধারণ মানুষের করের টাকায় সুপ্রিম কোর্টের দ্বারস্থ হয়েছিলেন। রাজীবকুমারকে জেরা করলে কি ব্যক্তি মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় কোনো সমস্যায় পড়ে যেতে পারেন?- সাধারণ মানুষের এই গুঞ্জন ই যেন মান্যতা পাচ্ছে রাজীবকুমারের জেরা আটকাতে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের অতি সক্রিয়তা ঘিরে।অতীতে মমতার দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক সহকর্মী তথা ক্যাবিনেট সতীর্থ মদন মিত্র কে দীর্ঘদিন সি বি আই আটক করে রেখেছিল এই সারদা কেলেঙ্কারীর জেরেই।আজ রাজীবকুমারকে জেরা করার উদ্যোগ সিবিআই নিতেই মমতা যে সিবিআই বিরোধী রাজনৈতিক পদক্ষেপ নিয়েছেন, মদন মিত্রর ক্ষেত্রে কেন তা তিনি নেন নি?

এই সারদা ইস্যুতেই মমতার দলের তৎকালীন রাজ্যসভার সাংসদ কুনাল ঘোষকে গ্রেফতার করে মমতার ই সি আই ডি।জেলে এবং আদালতের পথে একজন সাংসদের সঙ্গে চূড়ান্ত অসভ্যতা করে এই মমতার ই পুলিশ।একটি শব্দ ও শোনা যায় নি সেদিন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের কাছ থেকে।নিজের দলের সাংসদ সৃঞ্জয় বসু, তাপস পাল, সুদীপ বন্দ্যোপাধ্যায় আটক হয়েছেন এই সারদা ইস্যুতেই সিবিআই র হাতে।ধর্ণা , অবস্থান তো দূরের কথা , নীরবতাই পালন করে গিয়েছিলেন সেই সময়ে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়।আজ সিবিআই জেরার উদ্যোগ করতেই মমতা ছুটে গেছেন আইপিএস রাজীবকুমারের বাড়িতে অথচ নিজের দলের মন্ত্রী , সাংসদ কে যখন এই সারদা ইস্যুতে সিবিআই আটক করেছিল, তখন তাঁদের বাড়িতে একবার ও ছুটে যাওয়ার প্রয়োজন অনুভব করলেন না মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়?

পুলিশ, সি বি আই, ই ডি , সি আই ডি ইত্যাদি প্রশাসনিক সংস্থা গুলো গ্রেফতার করলে বা জেরা করলেই কেউ অপরাধী প্রমাণ হয়ে যান না। আদালত যতোদিন না কাউকে অপরাধী বলে ঘোষণা করছে, আইনের চোখে তিনি ‘ অপরাধী ‘ হন না।গুজরাট গণহত্যার পর সি বি আই গুজরাটের তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী তথা আজকের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে টানা নয় ঘন্টা জেরা করেছিল।মোদি সম্পর্কে একাংশের মানুষের যতো ই আপত্তি থাক না কেন, একটা কথা বলতেই হয় , তিনি আজকের মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের মতো সিবিআই এর বিরুদ্ধে জেহাদ ঘোষণা করে সিবিআই কে এড়িয়ে যাননি। জেরার মুখোমুখি হয়েছিলেন। ক্ষমতায় এসে এই মমতাই প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যকে ফাঁসাতে বিচার বিভাগীয় তদন্ত কমিশন বসান।

বুদ্ধবাবু কিন্তু সেই তদন্ত কমিশনের সামনে হাজির হয়ে সাক্ষী দিয়েছিলেন, কমিশনকে এড়িয়ে যাননি। রাজনৈতিক প্রতিহিংসা চরিতার্থ করতে এই সারদা তদন্তে সিপিআই( এম) নেতা রবীন দেবকে জড়ানোর কম চেষ্টা মুখ্যমন্ত্রী মমতা করেন নি।রবীন দেব কিন্তু জেরা এড়িয়ে যাননি। জেরার মুখোমুখি হয়ে বীরদর্পে বেরিয়ে এসেছিলেন।তাহলে রাজীবকুমারকে ঘিরে কেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এই রাজনৈতিক অবস্থানে এলেন যাতে আইপিএস অফিসারদের পর্যন্ত তাঁর সঙ্গে রাজনৈতিক ধর্ণা মঞ্চে অংশ নিতে হলো?

মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় কলকাতার পুলিশ কমিশনার রাজীবকুমারের জেরা আটকানোর জন্যে যতোই রাজনৈতিক চাপ সৃষ্টি করুন না কেন শেষ পর্যন্ত দেশের সর্বোচ্চ আদালত সুপ্রিম কোর্টের আদেশে রাজীবকুমারকে সিবিআই-র জেরার সন্মুখীন হতেই হবে।সুপ্রিম কোর্টের এই রায় রাজনীতিক মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের অন্যতম বড়ো রাজনৈতিক পরাজয়। সুপ্রিম কোর্টের রায়ে মমতার আরো একটি রাজনৈতিক পরাজয় ধ্বনিত হয়েছে।সুপ্রিম কোর্ট আদেশ দিয়েছেন; কলকাতা বা দিল্লিতে রাজীবকুমারকে জেরা করা যাবে না।তৃতীয় জায়গাতে তাঁকে জেরা করতে হবে।এক্ষেত্র শিলং য়ের কথা মহামান্য সুপ্রিম কোর্ট বলেছেন।মমতার রাজনৈতিক পরিমন্ডলের ভৌগলিক অবস্থানের ভিতরে যে রাজীবকুমারকে সিবিআই জেরা করাটাতে দেশের সর্বোচ্চ আদালত ভরসা রাখতে পারছেন না– তাঁদের আজকের এই রায়ের ভিতর দিয়ে সেটা দিনের আলোর মতো পরিস্কার।তাই এটি মমতার আরো একটি বড়ো রাজনৈতিক এবং নৈতিক পরাজয়।সেই কারনেই হয়তো এখন রাজ্যের শাসক পন্থী বুদ্ধিজীবীরা সিবিআই এর আইনি অবস্থান ঘিরে সুপ্রিম কোর্টে ঝুলে থাকা মামলা স্বত্ত্বে ও এই প্রচার করতে শুরু করেছেন যে,সি বি আই এর কোনো সাংবিধানিক স্বীকৃতি নেই।সাধারণ মানুষের বিনীত জিজ্ঞাসা; সিবিআই এর যদি কোনও আইনি স্বীকৃতি নাই থেকে থাকে , তাহলে বিরোধী নেত্রী থাকাকালীন এই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় কেন বাম আমলে ছুতোয় নাতায় সি বি আই চাইতেন?

  • মতামত লেখকের ব্যক্তিগত।