মানব গুহ, কলকাতা: একে মুকুলে রক্ষে নেই, সিবিআই দোসর৷ ঠিক এই প্রবাদের সাহায্যেই কি তৃণমূল ভাঙতে চায় বিজেপি? পঞ্চায়েত ভোট যত এগিয়ে আসছে, মুকুল রায় আর সিবিআইয়ের তৎপরতা তত বাড়ছে৷ সারদা ও নারদ মামলায় জড়িত প্রায় সব বড় তৃণমূল নেতা৷ তাদের ক্রমাগত চাপ দিয়েই কি মুকুলের হাত ধরে দলে টানতে চায় বিজেপি? অভিযোগ ও প্রশ্ন দুটোই কিন্তু উঠছে৷

ক্ষমতা দখল করতে গেলে তৃণমূলকে ভাঙতেই হবে৷ বিজেপির কাছে এখন এটাই মূলমন্ত্র৷ রাজ্যে সেই রকম নেতার অভাব, অনেক আগেই বুঝে গেছেন বিজেপির কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব৷ মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় একসময় যেমন কংগ্রেস আর সিপিএম ভাঙানোর খেলায় মেতেছিলেন তৃণমূলকে একচেটিয়া ক্ষমতায় রাখতে, ঠিক তেমনই মুকুল রায়কে কেন্দ্র করেই কি তৃণমূল ভাঙতে চায় বিজেপি? সারদা আর নারদ মামলাকে হাতিয়ার করে? তৃণমূলের অভিযোগ কিন্তু তাই৷ সাধারণ মানুষের মুখেও সেই একই প্রশ্ন৷

পুজোর পর সিবিআই তদন্ত শুরু হল নারদ কাণ্ডে অভিযুক্ত তৃণমূল সাংসদ অপরূপা পোদ্দারকে দিয়ে৷ পঞ্চায়েত উপপ্রধান মহম্মদ ইলিয়াস চৌধুরির বাড়িতেও হাজির হয় সিবিআই অফিসাররা৷ নারদ স্টিং কান্ডে দেখা গেছে, কলকাতা পুরসভার ডেপুটি মেয়র ইকবাল আহমেদকে সঙ্গে নিয়ে এই মহম্মদ ইলিয়াস চৌধুরির বাড়িতেই হাজির হয়েছিলেন ম্যাথু স্যামুয়েল৷ সেখানেই অপরূপা পোদ্দারকে টাকা দেন তিনি৷ সেই ঘরের ছবি তোলেন সিবিআই অফিসাররা৷ ইতিমধ্যেই তলবও করা হয় অপরূপা পোদ্দারকে৷

তারপরই, প্রাক্তন পরিবহণমন্ত্রী মদন মিত্রের দক্ষিণেশ্বরের বাড়িতে যায় সিবিআইয়ের একটি তদন্তকারী দল৷ সিবিআই সূত্রে খবর, মদন ওই বাড়িতে বসেই নারদাকর্তা ম্যাথু স্যামুয়েলের থেকে পাঁচ লক্ষ টাকা ‘ঘুষ’ নিয়েছিলেন বলে অভিযোগ৷ সেই বাড়িতে বসেই স্টিং অপারেশন করেছিলেন ম্যাথু৷ সেজন্যই ঘটনার পুনর্নিমাণ করতে মদনের দক্ষিণেশ্বরের বাড়িতে যায় সিবিআই৷ প্রায় ঘণ্টাখানেক সেখানে ছিলেন তদন্তকারীরা৷ ওই বাড়িতে কোথায় বসে মদন টাকা নিয়েছিলেন তা জানতে চায় সিবিআই৷ সেই জায়গার ছবি তোলা হয়৷ গোটা বাড়ির বিভিন্ন অংশের ছবি তোলা হয়৷

এরপর, সোমবার প্রাক্তন সাংসদ ও বর্তমানে রাজ্য পরিবহন মন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর হলদিয়ার একটি অফিসে যায় সিবিআই এর তদন্তকারী দল৷ সোমবার বেলা সাড়ে ১২টা নাগাদ হলদিয়ায় শুভেন্দুর পুরনো কার্যালয়ে নারদ-কাণ্ডের পুনর্নিমাণের জন্য যায় সিবিআই তদন্তকারীদের একটি দল৷ ২০১৪ সালের ১৪ এপ্রিল ওই অফিসে বসেই নারদাকর্তা ম্যাথু স্যামুয়েলের থেকে পাঁচ লক্ষ টাকা ঘুষ নিয়েছিলেন বলে অভিযোগ৷ সেখানে বসেই স্টিং অপারেশন করেছিলেন ম্যাথু৷

কেন মদন ও শুভেন্দুকেই প্রাথমিক টার্গেট করা হচ্ছে? চাপ সৃষ্টি করে মুকুলের মতই শুভেন্দুকে ভাঙিয়ে আনা গেলে তৃণমূল যে অনেকটাই দূর্বল হয়ে পড়বে তা জানে বিজেপির কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব৷ তাই সিবিআইকে দিয়েই চাপ সৃষ্টির এই খেলাটা খেলছে বিজেপি, এমনই অভিযোগ তৃণমূল কংগ্রেসের৷ ঠিক একইভাবে মদন মিত্রকেও ভাঙিয়ে আনতে চায় বিজেপি৷ মুখ্যমন্ত্রী নিজেই অভিযোগ করেছিলেন, শুভেন্দু ও মদনকে চাপ দিচ্ছে সিবিআই৷
এদিকে, মৃত সুলতান আহমেদ ছাড়া বাকি ১২ জন তৃণমূল নেতাকেই যে দফায় দফায় জেরা করা হবে তা পরিস্কার করে দিয়েছে সিবিআই৷ প্রশ্ন এটাই উঠছে, তাহলে কি তৃণমূলের বড় নেতাদের চাপ দিয়ে দল ছাড়াতেই কি সিবিআইকে ব্যবহার করছে বিজেপি? তৃণমূলের তরফ থেকে কিন্তু বারবার সেই অভিযোগই করা হয়েছে৷

সোমবারই দিল্লীতে পশ্চিমবঙ্গের বিজেপি পর্যবেক্ষক কৈলাশ বিজয়বর্গীয়র সঙ্গে বৈঠক করলেন মুকুল রায়৷ রাজনৈতিক মহলের খবর, সেখানে মুকুলের বিজেপিতে যোগদানের পাশাপাশি কিভাবে তিনি তৃণমূল ভেঙে বড় নেতাদের বিজেপিতে নিয়ে আসবেন তা নিয়েও আলোচনা হয়েছে৷ তৃণমূলের আশঙ্কা, এবার সারদা-নারদ মামলায় সিবিআই ফের দলের মাথাদের জোরদার টানাটানি শুরু করবে৷ আর সেই ভয়েই ঠিক সৃঞ্জয় বসু বা মুকুল রায়ের মতই দল ছাড়তে পারেন অনেক তাবড় তাবড় নেতা৷

তবে, বিজেপি নেতৃত্বের তরফ থেকে পরিষ্কার জানিয়ে দেওয়া হয়েছে যে, সিবিআই নিজের কাজ করছে, তার সঙ্গে রাজ্যে ক্ষমতা দখলের রাজনাতির কোন সম্পর্ক নেই৷ তবে, মুকুলকে দলে নেবার পরও তৃণমূলের অন্যান্য হেভিওয়েটদের দিকেও যে বিজেপির লক্ষ্য থাকবে তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না৷ আর মুকুলের দল ভাঙাবার রাজনীতির পাশাপাশি এই ক্ষেত্রে সিবিআইকেও যে সমান তালে ব্যবহার করবে কেন্দ্রীয় বিজেপি নেতারা তা জলের মত পরিস্কার তৃণমূলের কাছেও৷

এখন দেখার এটাই, মুকুল রায় কতটা ভাঙতে পারেন তৃণমূলকে৷ তার উপরেই নির্ভর করবে বাংলায় বিজেপির চটজলদি সাফল্যের রাজনীতি৷ তবে, ক্ষমতায় থাকা তৃণমূলকে ভাঙা যে কঠিন, তা জানেন বাংলার রাজনীতির চাণক্যও৷ চাণক্য এবার কুটবুদ্ধির জেরে চন্দ্রগুপ্ত হয়ে বাংলার রাজপাটে বসতে পারেন কিনা সেই লড়াইটাই এখন দেখার৷

পপ্রশ্ন অনেক: চতুর্থ পর্ব

বর্ণ বৈষম্য নিয়ে যে প্রশ্ন, তার সমাধান কী শুধুই মাঝে মাঝে কিছু প্রতিবাদ