বিবেক দেবরায় প্রখ্যাত অর্থনীতিবিদ এবং বর্তমানে নীতি আয়োগের সদস্য৷ সাম্প্রতিক অসহিষ্ণুতা ও হিংসার বিভিন্ন ঘটনা এবং তা নিয়ে নানা ধরনের প্রতিক্রিয়া সম্পর্কে টাইমস অব ইন্ডিয়া-কে একটি সাক্ষাৎকার দিয়েছেন তিনি৷ প্রকাশিত সেই সাক্ষাৎকারের বাংলা ভাষান্তর Kolkata24x7-এ তুলে দেওয়া হল৷

প্রশ্ন: অসহিষ্ণুতার ইস্যুতে দেশজুড়ে এক বিতর্ক দেখা দিয়েছে৷এ ব্যাপারে আপনার অভিজ্ঞতা কী?

বিবেক দেবরায়: অনেকেরই হয়তো জানা নেই, স্বনামধন্য অর্থনীতিবিদ, প্রফেসর ‘পদ্মবিভূষণ’ জগদীশ ভগবতীকে (অধুনা আমেরিকার সহজাত নাগরিক) কেন দিল্লি স্কুল অব ইকনমিক্স (ডিএসই) ছেড়ে বিদেশে চলে যেতে হয়েছে৷তার কারণ এখানে তাঁর জীবনযাপন যারপরনাই অস্বস্তিদায়ক করে তোলা হয়েছিল৷ তাঁকে ডিএসই ছাড়তে হয়েছিল এ কারণেই যে, সেখানে এক ধরনের মতামতের আবহাওয়া বিরাজ করে এবং আপনি যদি তাতে সায় না দেন, তাহলে আপনার জীবন মোটেই সুখকর হবে না৷

দ্বিতীয় পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনার সময় তা খতিয়ে দেখার জন্য অর্থনীতিবিদদের একটি কমিটি তৈরি হয়৷ডঃ বিআর শেনয় তার বিরোধিতা করেন৷রাষ্ট্রীয় পরিকল্পনার কোথাও আপনারা শেনয়ের নামোল্লেখ দেখতে পান? শেনয়কে পুরোপুরি ছেঁটে ফেলা হয়৷ তার পর ভারতে তিনি আর কোনও কাজই পাননি৷ তাঁকে শ্রীলঙ্কায় চলে যেতে হয়৷

তৃতীয় উদাহরণ হিসাবে বলতে পারি একটি বইয়ের কথা৷ বইটির নাম ‘হার্ট অব ইন্ডিয়া’, লেখক আলেকজান্ডার ক্যাম্পবেল৷আলেক্জান্ডার ক্যাম্পবেল ছিলেন একজন সাংবাদিক৷

সেই সময়কার প্রতিফলন হিসাবে পড়ার মতো বই৷ কিন্তু ভারতে এখনও এই বই নিষিদ্ধ৷কারণ ওই বইতে জওহরলাল নেহরু, ভারতে সমাজতন্ত্র এবং পরিকল্পনা কমিশন নিয়ে কিছু হালকা চটুল কথা লেখা হয়েছিল৷যাঁরা বলছেন কোনও রকম নিষেধাজ্ঞা জারি করা উচিত নয়, তাঁরা ‘হার্ট অব ইন্ডিয়া’র কথা একবারও উল্লেখ করছেন না কেন?

এই তিনটি নজির তুলে আমি এটাই দেখাতে চাইছি যে, অসহিষ্ণুতা বরাবরই ছিল এবং সেটা যদি আমরা স্বীকার না করি তাহলে আমরা আহাম্মক৷

(ভারতকে পাকিস্তানের প্রতিবিম্বে পরিণত করছে সংঘ: ইরফান হাবিব)

প্রশ্ন: আপনি নিজে কি কখনও ব্যক্তিগতভাবে অ্যাকাডেমিক ক্ষেত্রে কোনও রকম অসহিষ্ণুতার শিকার হয়েছেন?

বিবেক দেবরায়: আমি কলকাতার প্রেসিডেন্সি কলেজে শিক্ষালাভ করেছি এবং খাতায়-কলমে আমার প্রথম কাজের সুযোগ বলতে গেলে সেখানকারই সেন্টার ফর রিসার্চে৷এর পর একটা সময় এল যখন আমি প্রকৃত কাজের জন্য অ্যাপ্লাই করলাম৷অর্থাৎ, কলেজের অর্থনীতি বিভাগে৷

তখন বিভাগীয় প্রধান ছিলেন দীপক বন্দ্যোপাধ্যায়৷তিনি আমাকে বললেন, তুমি চাকরি পাচ্ছ না, ও কথা ভুলে যাও৷ মনে রাখবেন তখন বাম জমানা৷ সব বিশেষজ্ঞই বাম শিবিরের৷ অতএব আমি পুণে চলে গেলাম৷

প্রশ্ন: রাজীব গান্ধী ইনস্টিটিউট অসহিষ্ণুতার ইস্যুতে সম্মেলনের আয়োজন করেছে৷আপনি এক সময় এই ইনস্টিটিউটের কর্ণধার ছিলেন৷এ বিষয়ে আপনার মতামত কী?

বিবেক দেবরায়: আমি আট বছর ওখানে ছিলাম এবং ওই সময় আমরা সচেতনভাবে কংগ্রেসের থেকে দূরত্ব বজায় রাখতাম৷

ভারতের কী রকম হয়ে ওঠা প্রয়োজন, আগামী দিনে ভারতীয় সমাজেরই বা কোন খাতে বওয়া দরকার, এ নিয়ে ২০০২ সালে আমি একটা সম্মেলনের আয়োজন করব বলে স্থির করি৷ সেই সময় ‘অর্গানাইজারে’র সম্পাদক ছিলেন শেষাদ্রি চারি৷আমি তাঁকে আমন্ত্রণ জানাই৷অনেকে বামপন্থীও সাড়া দেন৷

যেদিন সেমিনার, সেদিন একটি সংবাদপত্রের প্রথম পাতায় বের হল ‘কংগ্রেস থিংকট্যাঙ্ক ইনভাইটস এডিটর অব অর্গানাইজার’৷ ১০ জনপথ থেকে একটি ফোন এল৷ তবে তা মিসেস সোনিয়া গান্ধীর নয়৷

‘‘ম্যাডাম আপনার সঙ্গে আমাকে কথা বলতে বলেছেন৷ প্লিজ, শেষাদ্রি চারিকে আমন্ত্রণ উইথড্র করে নিন৷’’ আমি বললাম, আমন্ত্রণ জানানো হয়ে গিয়েছে৷ম্যাডাম যদি কথা বলতে চান, তাঁকে বলুন আমার সঙ্গে কথা বলতে৷

দশ মিনিট পরে আবার ফোন৷ ‘‘আপনি কি দয়া করে শেষাদ্রি চারিকে বলবেন তাঁর বক্তব্য লিখিতভাবে দিতে?’’ আমি জানালাম, তা আমি করব না৷ ‘‘না, ম্যাডাম একটু দেখতে চাইছেন৷’’

কিছুক্ষণ বাদে ফের ফোন৷ ‘‘শেষাদ্রি চারি যদি এর সুযোগ নেয় এবং গোধরা নিয়ে কিছু বলে বসে?’’ এর মধ্যে যা হওয়ার তা হয়ে গিয়েছে এবং বেশ কিছু কংগ্রেসি ব্যক্তিত্ব শেষ পর্যন্ত আর সেমিনারে এলেনই না৷ যেহেতু শেষাদ্রি চারিকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে৷

আমি কিন্তু সেই সম্মেলন করেছিলাম৷

২০০৪ সালে আমি আর লবীশ ভাণ্ডারি মিলে অর্থনৈতিক স্বাধীনতার উপর একটি সমীক্ষা চালাই এবং তাতে বিভিন্ন রাজ্যের স্থান নির্ধারণ করি৷ গুজরাত তাতে প্রথম স্থান পায়৷ ২০০৫ সালে গুজরাতে পুর নির্বাচন হল এবং সেই সময় একটি সংবাদপত্রের প্রথম পাতায় বড় বড় করে ছাপা হল: কংগ্রেস থিংকট্যাঙ্ক র‌্যাংকস মোদী’জ গুজরাত অ্যাজ নাম্বার ওয়ান’’৷আর তার পরেই একেবারে হই হই রই রই কাণ্ড৷

আমার কাছে মিসেস সোনিয়া গান্ধীর একটা নোট এল৷ এর পর থেকে রাজীব গান্ধী ইনস্টিটিউট যা ছাপবে, তাতে যেন রাজনৈতিক ছাড়পত্র থাকে৷ আমি জানালাম এটা আমার অনভিপ্রেত৷ অতঃপর আমি পদত্যাগ করলাম৷

ফলস্বরূপ, পরদিন অর্জুন সেনগুপ্ত কমিশন থেকে আমাকে ছেঁটে ফেলা হল৷পরিকল্পনা কমিশনের দুটি টাস্ক ফোর্সেও আমাকে রাখা হয়েছিল৷সেখান থেকেও বিতাড়িত হলাম৷

কেউ তা নিয়ে মুখ খুলেছিল? আমার খালি দুজনের কথা মনে পড়ছে৷ একজন ছিল লবীশ৷ সে না হয় সহ-গবেষক ছিল, তাই তাকে বায়াসড বলেই ধরে নিচ্ছি৷আর একজন ছিলেন সাংবাদিক সীতা পার্থসারথি৷ এঁরা দুজনেই কেবল বলেছিলেন, কোনও বিষয়ে কারও ভিন্ন মত থাকতেই পারে৷আর কেউ টুঁ শব্দটিও করেনি৷

চিন্তাশীল জগতের মতবিনিময় এখন এক শ্রেণির ব্যক্তির কুক্ষিগত হয়েছে, দৃষ্টিভঙ্গিও তাই বাঁধাধরা কিছু গতে ঘুরপাক খাচ্ছে৷

এ হচ্ছে এক ধরনের একচেটিয়াতন্ত্র৷এবং, একচেটিয়াতন্ত্র কখনই বহিরাগতদের পছন্দ করে না৷ আর একচেটিয়াতন্ত্র বেঁচে থাকে একাধিক নেটওয়ার্কের ভিত্তিতে৷

(গো-মাংস ‘জীবনদায়ী’ নয়, তবে মরতেই বা হচ্ছে কেন?)

প্রশ্ন: বিদ্বজ্জনদের একটি অংশ ক্রমবর্ধমান অসহিষ্ণুতা নিয়ে সরব হয়েছেন৷আপনি কি মনে করেন না এর পিছনে তাঁদেরও একটি যুক্তি আছে? নাকি তাঁরা রাজনীতিগতভাবে সহমত পোষণ করেন বলেই এটা করছেন?

বিবেক দেবরায়: আপনি যদি আমাকে বলেন যে, অসহিষ্ণুতা বাড়ছে তাহলে বলব, এই অভিমত কষ্টকল্পিত এবং নির্ভেজাল ব্যক্তিনির্ভর ধারণা৷ এ নিয়ে তর্ক করা বৃথা৷ কারণ আপনি বলবেন এটা বাড়ছে আর আমি বলেই যাব এটা বাড়ছে না৷আমি যখন কোনও পরিমাপক সূচক পাই, তখন তার ভিত্তিতেই আমি কোনও কিছুর বাড়া-কমা মাপতে পারি৷

আমি যখন এই ধরনের সূচকের দিকে তাকাচ্ছি, যেমন সাম্প্রদায়িক হিংসার ঘটনা, ইন্টারনেটের স্বাধীনতার মতো ব্যক্তিনিরপেক্ষ মাপকাঠির দিকে যখন চোখ রাখছি তখন এটা বাড়ছে বলে আমার মনে হচ্ছে না৷

আমি বরং বলব, মননশীল পরিমণ্ডলেই বরাবর একটা অসহিষ্ণুতা লক্ষ করা গিয়েছে৷সুতরাং আসুন, ভান করার চেষ্টাটা ছাড়া যাক।

(যাদের পুরস্কার নেই, তারা প্রতিবাদে কী ফেরাবে?)