- Advertisement -

ছেলেবেলা কেটেছে এই বাংলার এক অখ্যাত গ্রামে। উত্তরবঙ্গের এক অনামী স্কুলে পড়াশোনা শুরু।  উত্তর দিনাজপুরে ইসলামপুর স্টেট ফার্ম কলোনি হাই স্কুলে৷ লন্ডন-আমেরিকা নয়, বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রি মিলেছে রবি ঠাকুরের শান্তিনিকেতন থেকে। আর বাকিটা? সম্প্রতি, পৃথিবীর থেকে ৮০০০ গুণ বড় একটি গ্রহ আবিস্কার করায় শিরোনামে এসেছে তাঁর নাম।  মহকাশ বিজ্ঞানের এক নতুন দিগন্ত খুলে দিয়েছেন তিনি।  সেখানেই শেষ নয়। ISRO-র একটি প্রজেক্টের প্রধান তিনি।  তাঁর হাত ধরেই NASA-কে হারিয়ে দেবে ISRO.
এই প্রথম কোন বাংলা সংবাদমাধ্যমে কথা বললেন তিনি৷ Kolkata24x7-এর মুখোমুখি হলেন বিশিষ্ট মহাকাশ বিজ্ঞানী ড. বিশ্বজিৎ পাল।   প্রশ্ন করলেন তন্নিষ্ঠা ভাণ্ডারী

1. নতুন যে গ্রহ আবিষ্কার হয়েছে, তা মহাকাশ গবেষণায় কোন নতুন দিগন্তের সন্ধান দেবে?
অনেক দিক থেকেই এই আবিষ্কার অন্যান্য গ্রহ আবিষ্কারের থেকে আলাদা। এটি এমন একটি গ্রহ যা, দুটি নক্ষত্রের চারিদিকে ঘোরে। যে নক্ষত্রগুলি নিজেদের ভর কেন্দ্রের চারিদিকে ৭ঘণ্টায় ঘুরে আসে। আর গ্রহটি দুটি নক্ষত্রকে পাক খায় দু’বছরে। সুতরাং, এছাড়া এটি সবথেকে কমপ্যাক্ট বায়োনারি সিস্টেম।

- Advertisement -

এটিই প্রথম আবিষ্কৃত গ্রহ যেটি X-ray binary stellar system-এর চারপাশে ঘুরছে, অর্থাৎ একটু নিউট্রন স্টার বা একটি ব্ল্যাক হোল যা থেকে X-রশ্মি নির্গত হয় তার চারপাশে ঘুরছে এই গ্রহ। দুটি নক্ষত্রের চারপাশে ঘোরা বা বায়োনারি সিস্টেমে থাকা যেসব গ্রহ এখনও পর্যন্ত আবিষ্কৃত হয়েছে, তার মধ্যে এটি বৃহত্তম এবং সবথেকে ভারি। এটি পৃথিবীর থেকে ৮০০০ গুন ভারি। এটি সবথেকে কমপ্যাক্ট এটা বায়োনারি সিস্টেম, যার গ্রহ রয়েছে।

2. এই গ্রহ আবিষ্কারের ক্ষেত্রে কোন নতুন পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়েছে?
এই প্রথম X-ray অবজারভেশনের মাধ্যমে কোনও গ্রহ আবিষ্কার করা হল। এর আগে এই পদ্ধতি ব্যবহার করেননি কেউ। সম্পূর্ণ নতুন এই পদ্ধতিকে বিজ্ঞানের ভাষায় বলা হচ্ছে ”periodic delay in X-ray eclipses.” আমরা দেখি X-Ray এক্লিপ্স একটা নির্দিষ্ট সময়ের তফাৎ দৃশ্যমান, অর্থাৎ, একটি স্পন্দনশীল গতি রয়েছে। তখন বোঝা যায় এই সিস্টেমে কোনও তৃতীয় বস্তু রয়েছে। সেখান থেকেই এই গ্রহের আবিস্কার।

3. এই গ্রহের চরিত্রের সঙ্গে পৃথিবীর তফাৎ কি?
এই গ্রহের আকাশে দুটো সূর্যকে দেখা যাবে, এটাই সবথেকে বড় তফাৎ। এর মধ্যে একটি নক্ষত্র আকারে ছোট অনেকটা জলের ফোঁটার মত দেখতে। এছাড়া যে নক্ষত্র থেকে X-Ray রশ্মি নির্গত হয় সেটি অন্য নক্ষত্র থেকে গ্যাস টানতে থাকে। আর সেটা একটা চাকতির আকার নেয়। সেটিই আকাশে দৃশ্যমান।

4. বায়োনারি সিস্টেমে থাকা কতগুলি গ্রহ আবিষ্কার হয়েছে?
মোট ২০টি এমন গ্রহ আবিষ্কার হয়েছে, তার মধ্যে এটিই বয়সে সবথেকে পুরনো।

5. কতদিন সময় লেগেছে এই গ্রহ আবিষ্কার করতে?
আমি আর আমার কিছু সহকর্মী মিলে কাজটা ৫-৬ বছর আগে শুরু করেছিলাম। এরপর বেশ কিছুদিন বন্ধ ছিল। বাকি কাজটা হয় গত ৩-৪ মাসে।

৬. ইসরোর কোন প্রজেক্টের সঙ্গে যুক্ত আপনি?
Mission Polix. আমরা একটি বিশেষ ইনস্ট্রুমেন্টস তৈরি করে ইসরোর স্যাটেলাইটের মাধ্যমে মহাকাশে পাঠাবো।

৭. এই প্রজেক্টের উদ্দেশ্য কি?
এই ইনস্ট্রুমেন্টের মাধ্যমে আমরা নিউট্রন স্টারের চৌম্বক ক্ষেত্রের আকার জানতে পারব। এই টেলিস্কোপের মত যন্ত্রেই ধরা পড়বে ব্ল্যাক হোলের চরিত্র। এর ফলে অ্যাস্ট্রোনমির অনেক নতুন দিক খুলে যাবে। ব্ল্যাক হোলের প্রভাব তার চারপাশে কিভাবে পড়ে সেটা জানা যাবে। এমন অনেক থিয়োরি আছে যা কেবলমাত্র ধারণার উপরে ভিত্তি করেই তৈরি হয়েছে। সেগুলোর প্রমাণও মিলবে এই ইনস্ট্রুমেন্টে।

৮. ইসরো কিভাবে সাহায্য করছে এই প্রজেক্টে?
যন্ত্রটি তৈরি হচ্ছে ‘রমণ রিসার্চ ইন্সটিটিউট’-এই। কিন্তু যেহেতু ইসরোর স্যাটেলাইট ব্যবহার করে এটি মহাকাশে পাঠানো হবে তাই ইসরো সবরকমভাবে আমাদের সাহায্য করছে। প্রতিনিয়ত ইসরোর সহযোগিতা পাই।

৯. এই ধরনের ইনস্ট্রুমেন্টস কি আগে কখনও তৈরি হয়েছে?
না, এটাই প্রথম। আমেরিকাও একই রকম একটা যন্ত্র তৈরি করছে। নাসার স্যাটেলাইটে সেই ইনস্ট্রুমেন্ট মহাকাশে পাঠানো হচ্ছে ২০২০ সালে। কিন্তু সব ঠিক থাকলে ২০১৯-এই আমরা এটা মহাকাশে পাঠাচ্ছি। নাসার আগেই এই মিশন সম্পূর্ণ করতে চলেছি আমরা।

১০. মহাকাশ গবেষণায় বিশ্বের নিরিখে ভারত এখন কোথায় দাঁড়িয়ে আছে?
আগে আমেরিকা কিংবা ইউরোপ অনেকটাই এগিয়ে ছিল ভারতের থেকে। ওদের তৈরি যন্ত্রের হাত ধরেই এগোতে হত আমাদের। কিন্তু এখন পরিস্থিতি অনেকটাই বদলেছে। এখন ভারতের মহাকাশ গবেষণা সংস্থা ইসরোর স্যাটেলাইটের উপর অনেক দেশই ভরসা করেছে। বেশ কিছু ক্ষেত্রে মহাকাশ গবেষণায় নেতৃত্ব দিচ্ছে ভারত। অনেক অবদানও রাখছে।

১১. ভারতে মহাকাশ গবেষণার পরিকাঠামোয় কি কোনও খামতি আছে? আপনার কি মনে হয়।
অন্যান্য দেশের সঙ্গে ভারতের একটা বড় তফাৎ হল, এখানকার কলেজ বা বিশ্ববিদ্যালয়ে হাতে-কলমে পরীক্ষামূলক গবেষণার জায়গাটা অনেক কম। এখানে থিয়োরিতেই বেশি জোর দেওয়া হয়। গবেষণা হাতে-কলমে করা গেলে আরও বেশি করে আবিষ্কারের সুযোগ তৈরি হত এদেশে। কিন্তু ইউরোপ-আমেরিকার মত দেশে ইউনিভার্সিটি স্তর থেকেই এমন গবেষণার জায়গা রয়েছে।

১২. মহাকাশ গবেষণায় বাঙালির কতটা উৎসাহ?
আলাদা করে কখনও ভাবিনি। তবু কাজ করতে গিয়ে বহু জায়গায় অনেক বাঙালির সঙ্গে আলাপ হয়েছে যারা এই মহাকাশ গবেষণার ক্ষেত্রে কাজ করছে। তাছাড়া কলকাতায় অনেক বড় বড় ইন্সটিটিউট রয়েছে যা দেশের অন্যতম গবেষণার জায়গা। S.N. Bose National Centre for Basic Sciences, Saha Institute of Nuclear Physics এগুলো দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ রিসার্চ ইন্সটিটিউট, যেখানে অ্যাস্ট্রোফিজিক্স নিয়ে পড়াশোনা করার সুযোগ রয়েছে। এছাড়া প্রেসিডেন্সি বিশ্ববিদ্যালয়েও এই ক্ষেত্র নিয়ে পড়াশোনার সুযোগ আছে।

১৩. আপনার কি প্রথম থেকে এই বিষয়ে গবেষণা করার ইচ্ছা ছিল?
অ্যাস্ট্রোনমি নিয়ে, একটা ভালোলাগার জায়গা তো ছিলই। তবে ফিজিক্স পড়তে পড়তে আরও বেশি করে উৎসাহ পাই ও আগ্রহের জায়গা তৈরি হয়।

১৪. আপনার পড়াশোনা কি এদেশেই?
হ্যাঁ, স্কুল ছিল উত্তরবঙ্গেই। ফিজিক্স অনার্স পাশ করি রায়গঞ্জ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে। পরে মাস্টার ডিগ্রি পাস করি শান্তিনিকেতনে। এরপর মুম্বই চলে যাই। সেখানে পড়াশোনা শেষে চাকরি করি। এরপর কাজ শুরু করি বেঙ্গালুরুর ‘রমণ রিসার্চ ইন্সটিটিউট’-এ।