‘‘দেশজুড়ে এখন বিষাক্ত আবহাওয়ার ঘনঘটা, আর তার বহিঃপ্রকাশ ফুটে বের হচ্ছে অসহিষ্ণুতার বিচিত্র নজিরের মধ্যে দিয়ে’’, এই মর্মে ডি এন ঝা, বিডি চট্টোপাধ্যায়, রোমিলা থাপার, উপিন্দর সিং, এমজিএস নারায়ণন সহ দেশের ৫০ জনেরও বেশি ঐতিহাসিক একটি বিবৃতি দিয়েছেন৷এই বিবৃতিতে স্বাক্ষর করেছেন স্বনামধন্য ঐতিহাসিক ইরফান হাবিব-ও৷এই বিবৃতির প্রেক্ষিতেই টাইমস অব ইন্ডিয়ার তরফ থেকে তাঁর একটি সাক্ষাৎকার নেন উদয় সিং রানা৷Kolkata24x7-এ সেই সাক্ষাৎকারের বাংলা তর্জমা তুলে দেওয়া হল৷

প্রশ্ন: ইতিহাসবিদরা তাঁদের যৌথ বিবৃতি বলেছেন, এই সরকার একটি আইনসিদ্ধ ইতিহাস খাড়া করতে চাইছে৷ইতিহাস বিকৃতির পিছনে সরকারের কী উদ্দেশ্য থাকতে পারে?

ইরফান হাবিব: এই সরকারকে নিয়ন্ত্রণ করছে রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘ (আরএসএস)৷এটা আদৌ কোনও গোপন ব্যাপার নয় যে, আরএসএসের মতাদর্শগত প্রবক্তা এমএস গোলওয়ালকর অ্যাডলফ হিটলার এবং নাৎসি পার্টির ভক্ত ছিলেন৷এই সরকার এখন গোলওয়ালকরের স্বপ্নকেই রূপ দেওয়ার চেষ্টা করছে৷ ঠিক নাৎসি জার্মানির মতোই এরা প্রপাগান্ডাকে প্যারানয়া ছড়ানোর কাজে লাগাচ্ছে৷

ইতিহাসের এহেন পুনরাবৃত্তি দেখে আমার আশঙ্কা হচ্ছে৷ এরা এক পরাক্রান্ত হিন্দু সাম্প্রদায়িক আদর্শের জিগির তুলছে৷ আরএসএস সাম্প্রদায়িক, কোনও দিক থেকেই দেশপ্রেমী শক্তি নয়৷ ১৯৪৭ সালের আগের দেশাত্ববোধই দেশের প্রয়োজন৷ঠিক যে ধরনের দেশাত্মবোধ ছিল জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের সময়৷সেই সময় এরা (আরএসএস) ছিল না৷

প্রশ্ন: ইতিহাস বিকৃতি ঘটানোর জন্য এরা কী ধরনের পন্থা অবলম্বন করছে? তা কি এতই সূক্ষ্ণ যে, সাধারণ মানুষের তা বোধগম্য হচ্ছে না?

ইরফান হাবিব: না৷ আমার মনে হয়, এটা এখন প্রত্যেকের কাছেই পরিষ্কার হয়ে গিয়েছে৷যখন দেশের কোনও প্রধানমন্ত্রী সিদ্ধিদাতা গণেশের প্ল্যাস্টিক সার্জারির হওয়ার মতো কোনও অবৈজ্ঞানিক কথা বলেন, তখন তা আমার কাছে অত্যন্ত অস্বস্তিকর ঠেকে৷যা ভুলই করুন না কেন, অটলবিহারী বাজপেয়ি এ ধরনের হাস্যকর কথা কোনও দিন বলেননি৷নরেন্দ্র মোদী আরও খারাপ৷ বহু দিন ধরেই আওরঙ্গজেব রোডের নাম পালটানোর দাবি জানাচ্ছিল ওরা, আর যেনতেন প্রকারে শেষ পর্যন্ত তা করেও ছাড়ল৷

আশ্চর্যভাবে অন্য রাজারাজড়াদের এরা কোনও দিন টার্গেট করেনি৷ যেমন ধরা যাক মান সিংহের কথা৷মহারানা প্রতাপের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার জন্য তাঁকে ওরা বিশ্বাসঘাতক বলে চিহ্নিত করতেই পারত, সেটা কিন্তু করেনি৷আওরঙ্গজেবকে ওরা রাক্ষসরূপে দেখাতে চায় স্রেফ একটাই কারণে, তিনি ছিলেন মুসলিম নৃপতি৷ওরা ঐতিহাসিকভাবে এটাই প্রমাণ করতে উদগ্রীব যে, মুসলমানরা বিদেশি৷

প্রশ্ন: কিন্তু বিদ্বজ্জন এবং সৃজনশীল ব্যক্তিত্বদের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠেছে যে, তাঁদের বিক্ষোভ আসলে বাছাই-করা প্রতিবাদ৷ নরেন্দ্র মোদী প্রধানমন্ত্রী হওয়ার আগেও কি সাম্প্রদায়িক হিংসা-টেনশন ছিল না?

ইরফান হাবিব: হিংসা-দ্বেষের ঘটনা আগেও ঘটেছে, এটা অস্বীকার করার প্রশ্নই ওঠে না৷তবে একটা কথা সেক্ষেত্রে আমাদের খেয়াল রাখতে হবে, কোনও না কোনও ভাবে সেইসব দাঙ্গায় আরএসএস জড়িত ছিল৷এই নজিরের কথা যে কোনও উল্লেখযোগ্য রিপোর্টে রয়েছে৷চিন্তাশীল মহলের এখন একটা বিমূঢ় অবস্থা, কারণ এইসব লোকই এখন ক্ষমতায়৷ এসটাবলিশমেন্টের তরফ থেকে এই ধরনের এলিমেন্টদের প্রশ্রয় দিতে এর আগে কখনও দেখা যায়নি৷

একটি গ্রামে গুজবের ভিত্তিতে এক ব্যক্তিকে খুন করা হল৷ সেখানে গিয়ে কেন্দ্রীয় সংস্কৃতি মন্ত্রী কিছু ব্যক্তিকে নির্দোষ বলে ঘোষণা করলেন৷ এটা কি কোনও ব্যক্তির, বিশেষ করে কোনও মন্ত্রীর, এই ধরনের কথা বলার জায়গা? এরা উত্তর প্রদেশের ক্ষমতায় নেই, তাও সেখানে এই ধরনের ঘটনায় উসকানি দেওয়ার ক্ষমতা এদের আছে৷

ধর্মীয় ও জাতপাতভিত্তিক সংখ্যালঘুরা ক্রমাগত নিপীড়নের শিকার হচ্ছেন৷আরএসএসের অধীনে ভারত পাকিস্তানের একটি প্রতিবিম্বে পরিণত হচ্ছে৷

প্রশ্ন: কেন্দ্রীয় অর্থমন্ত্রী অরুণ জেটলি সম্প্রতি বলেছেন, চিন্তাশীল মহলের প্রতিবাদ আসলে ম্যানুফ্যাকচার্ড রেবেলিয়ান৷ এ সম্পর্কে আপনার মতামত কী?

ইরফান হাবিব: ২০০২ সালে গুজরাত দাঙ্গার সময় থেকে আমি অরুণ জেটলির মতামত নজরে রাখছি৷ তিনি তখন বিজেপি-র মুখপাত্র ছিলেন৷তখনও তিনি এ রকম কাণ্ডজ্ঞানহীন বক্তব্যই পেশ করতেন৷

প্রশ্ন: যে সাহিত্যিক ও চিত্র-পরিচালকরা তাঁদের সাহিত্য অ্যাকাডেমি এবং জাতীয় পুরস্কার ফিরিয়ে দিচ্ছেন, তাঁদের কি আপনি সমর্থন করেন?

ইরফান হাবিব: আমার মতে, কারও রাষ্ট্রীয় সম্মান ফেরানো বা না-ফেরানো সম্পূর্ণতই তাঁর ব্যক্তিগত ব্যাপার৷ কে কীভাবে প্রতিবাদ করবেন, সেটাও প্রত্যেকের অধিকারের আওতায় পড়ে৷ প্রতিবাদের পন্থাকে কোনও ভাবেই অযৌক্তিক বলা যায় না৷