বাংলা ছবির দুনিয়ায় বুদ্ধদেব দাশগুপ্ত এক সুপরিচিত নাম। চেনা ছকের বাইরে বেরিয়ে তিনি বাংলা ছবির ঘরানা পালটে দিয়েছেন। তাঁর ব্যতিক্রমী কাজের কথা মনোযোগী সিনেমাপ্রেমীদের অজানা নয়। চিত্রপরিচালকের বাইরে তাঁর আরও একটা পরিচয় তিনি বাংলা ভাষার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কবি। তাঁর ‘শ্রেষ্ঠ কবিতা’ প্রকাশিত হয়েছে দে’জ পাবলিশিং থেকে। পত্রপত্রিকার শারদীয়া সংখ্যায় তাঁর নতুন লেখা প্রকাশ পেয়েছে এবারও। পুজো ও শারদ সাহিত্য নিয়ে খোলামেলা আড্ডায় বুদ্ধদেব দাশগুপ্ত। মুখোমুখি অরুণাভ রাহারায়।

প্রশ্ন: শৈশবের পুজোর কথা কিছু বলুন…
বুদ্ধদেব: আমাদের শৈশবে পুজো মাস খানেক ধরে হত। আমার ছোটবেলা কেটেছে কলকাতার বাইরে বিভিন্ন জায়গায়। বাবার চাকরি সূত্রে আমি একাধিক জায়গার দুর্গাপুজো দেখেছি। বাবা সরকারি হাসপাতালের ডাক্তার ছিলেন, বদলির ব্যাপার ছিল। সেই সূত্রে বিভিন্ন জায়গায় আমার ছোটবেলা কেটেছে।

প্রশ্ন: এত জায়গায় থেকেছেন, কোন জায়গাটা সবচেয়ে প্রিয়?
বুদ্ধদেব: মধ্যপ্রদেশ। যখন মধ্যপ্রদেশে ছিলাম, দুর্গাপুজোর সময় দেখতাম কলকাতা থেকে কারিগররা প্রতিমা বানাতে যেতেন। সেখানে গিয়ে তাঁরা প্রতিমা বানাতেন। আমরা বাচ্চারা ভিড় করে সেইসব দেখতাম। সেই পুজোর একটা অন্য আনন্দ ছিল। একমাস দেড় মাস ধরে আমাদের ভেতরে পুজো চলত। তারপর যখন দশমী আসত, প্রতিমা ভাসান হত তখন খুবই দুঃখ পেতাম। কান্নাকাটিও করতাম। দশমীর পরের দিন ‘ওঁ দুর্গায় নমঃ’ লিখে জলখাবার খেতাম।

প্রশ্ন: তারপর তো কলকাতায় চলে এলেন? এখানে পুজো কেমন কাটে?
বুদ্ধদেব: তখন থেকেই অভ্যাসটা চলে গেল। আজকালকার পুজো নিয়ে আমার বিশেষ উৎসাহ নেই। এমনিতেই আমি ভিড় খুব একটা পছন্দ করি না। শব্দও খুব পছন্দ করি না। তাই পুজোর সময় কলকাতা থেকে দূরেই সরে থাকতে চাই। থাকিও প্রতিবার। এবার অবশ্য বাইরে কোথাও যাচ্ছি না। কিন্তু, এই যে পুজো ঘিরে লোকজন আনন্দ করছেন, ঘুরে বেড়াচ্ছেন, নতুন নতুন জামাকাপড় পরছেন, অঞ্জলি দিতে যাচ্ছেন– আমি দূর থেকে সেইসব দেখি। আমার বাড়ির ব্যালকনি থেকে এসব দেখতে খুব ভাল লাগে।

প্রশ্ন: দুর্গাপুজোয় শুটিং করেননি কখনও?
বুদ্ধদেব: দুর্গাপুজোর সময় বহুবার বাইরে শুটিং করেছি। ছবির কাজে বাইরে থেকেছি। এমন হয়েছে যে, ছবির দৃশ্যে দুর্গাপুজো নেই, কিন্তু ঘটনাচক্রে দুর্গাপুজোয় শুটিং করতে হয়েছে। তবে বাইরে থাকলেও অষ্টমীর দিন আমি শুটিং করতাম না। সেদিন ছুটি কাটাতেই ভালবাসতাম। মনে পড়ছে, একবার পুজোর সময় পুরুলিয়ায় শুটিং করেছিলাম। পুরুলিয়া এমনিতে আমার খুবই প্রিয় জায়গা। সুযোগ পেলে অযোধ্যা পাহাড়ে যাই। ওখানেই আমার ‘উত্তরা’ ছবির শুটিং হয়েছিল।

প্রশ্ন: তারপর একদিন আপনার পুজো পালটে গেল? বিচারক হয়ে পুজো দেখতে গিয়েছেন?
বুদ্ধদেব: আমি কোনও দিন গলায় ফিতে ঝুলিয়ে পুজোর বিচারক হইনি। অনেক বার অনুরোধ এসেছে অবশ্য। আমি এসব একদম পছন্দ করি না। ছোটবেলায় তো বাবার কর্মসূত্রে মধ্যপ্রদেশে কেটেছে। ছোটবেলার পুজোর কথাই স্মৃতির পর্দায় ভেসে ওঠে শরৎকালে।

প্রশ্ন: চিত্রপরিচালকের বাইরে আপনার আরও একটা পরিচয় হল আপনি একজন বাংলা ভাষার কবি। কিছু শারদ সংখ্যায় আপনার নতুন লেখা পেয়েছি এবারও…
বুদ্ধদেব: হ্যাঁ আমি নিয়মিত কবিতা লিখি। সম্পাদকরা অনুযোগ করেন যে, আমার কাছ থেকে কবিতা পেতে তাঁদের একটু বেশি সময় লাগে। বারবার তাঁদের আমার কাছে লেখা চাইতে হয় আর কি! এটা আমার একটা বদভ্যাস বলা যায়। এবার একটা বাণিজ্যিক পত্রিকার শারদ সংখ্যায় আমার একগুচ্ছ কবিতা প্রকাশিত হয়েছে। ওই ১২ টা কবিতা পড়ে ইতিমধ্যে অনেকেই মতামত জানিয়েছেন। ‘কবিতা পরিযায়ী’ নামের একটি লিটল ম্যাগাজিনেও আমার কবিতা প্রকাশিত হয়েছে এবার।

প্রশ্ন: শুটিংয়ের মতো কি নিজের লেখা নিয়েও আগে থেকে প্যান থাকে?
বুদ্ধদেব: পুজো সংখ্যায় লিখব বলে আগে থেকে কোনও পরিকল্পনা থাকে না। কোনও সম্পাদক আগে থেকে আমার কাছে কবিতা চাইলে আমি তাঁকে লেখা দেওয়ার চেষ্টা করি।

প্রশ্ন: পত্রপত্রিকার শারদীয়া সংখ্যা পড়েন নিশ্চয়ই
বুদ্ধদেব: ছোটবেলায় শারদীয়া সংখ্যা পড়ার জন্য অপেক্ষা করে থাকতাম। তবে এখন আর অপেক্ষা কবি না। এখন শারদ সাহিত্যের মান কমেছে। শারদীয়া সংখ্যায় আগের মতো ভাল মানের লেখা পাই না। হাতে পেলে অবশ্যই দু-একটা পুজো সংখ্যা পড়ে দেখি। দু-এক পাতা পড়ার পর আর পড়তে ইচ্ছে করে না!

প্রশ্ন: তাহলে ছোটবেলায় কার লেখা পড়তে ভালবাসতেন?
বুদ্ধদেব: একটা সময় সত্যজিৎ রায়ের ফেলুদা, প্রফেসর শঙ্কু পড়ার জন্য বসে থাকতাম। এখনও শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়ের উপন্যাস পড়তে ভাল লাগে। ইদানীং খুবই বই পড়ি কিন্তু শারদ সংখ্যার উপন্যাস পড়ি না। এখনকার শারদ সাহিত্য পাঠযোগ্য নয়। দু-তিন পাতা পড়ার পর মনে হয় এটা খুব গোঁজামিল দেওয়া লেখা। ব্যতিক্রম যে নেই তা অবশ্য নয়, ব্যতিক্রম আছে। তবে সেগুলো খুব অল্পই।

প্রশ্ন: পুজো উপলক্ষে আপনার গুণমুগ্ধদের উদ্দেশ্যে কী বার্তা দেবেন?
বুদ্ধদেব: সবাই ভাল থাকুন, পুজোয় আনন্দ করুন। মানুষ আনন্দ করছে– এটা দেখতেও খুব ভাল লাগে। এটাই আমি বলতে চাই, এটাই কামনা করি।