প্রসেনজিৎ চৌধুরীঃ দেওর ও বৌদির মধ্যে খুনসুটি হওয়াটাই স্বাভাবিক৷ কিন্তু দু পক্ষ যদি মুখ দেখাদেখি বা একে অপরের বিরুদ্ধে শক্তি শেল ছুঁড়তে শুরু করেন তাহলে হাওয়া গরম বুঝতে হবে৷ সেই গরম হাওয়া ঝড় ডেকে আনে৷ ঠিক এমনই অবস্থা, বাংলাদেশ জাতীয় সংসদের বিরোধী দল জাপা অর্থাৎ জাতীয় পার্টির৷ রাজপথে যদি আন্দোলনের দল হয় একসময়ের বিরোধী বিএনপি তবে ঠাণ্ডা সংসদ অধিবেশন কক্ষে বিরোধী দলের তকমাটি রয়েছে এই জাতীয় পার্টির৷ সরকারের হাত মিলিয়ে বিরোধী ভূমিকার অভিনব ফর্মুলাটি তারা মেনে চলে৷

সদ্য প্রয়াত একদা বাংলাদেশের একনায়ক শাসক তথা রাষ্ট্রপতি হুসেইন মহম্মদ এরশাদ এই সূত্র তৈরি করে গিয়েছেন৷ পুরো দেশজুড়ে তেমন অস্তিত্ব নেই জাতীয় পার্টির৷ যাবতীয় শক্তির কেন্দ্র রংপুর৷ তবুও সেই এরশাদীয় ছলা-কলায় ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের সঙ্গে হাত মিলিয়ে প্রধান বিরোধী দল জাতীয় পার্টি৷ এহেন জাপার অন্দরমহলে এখন এরশাদ পরবর্তী গরম হাওয়া বইছে৷ এর কেন্দ্রে এরশাদ পত্নী রওশন ও দেওর জিএম কাদের৷ দুজনেই চান দলের সাংগঠনিক ক্ষমতা দখল ও বিরোধী নেতার ভূমিকাটি একসঙ্গে পালন করতে৷

দু-পক্ষই অনড়৷ ফলে জাতীয় পার্টিতে বড়সড় ফাটল ধরেছে৷ সেনাশাসক থেকে একনায়ক হওয়া ও জাতীয় পার্টি (জাপা) গঠন করে ক্ষমতায় থাকার কেরামতি দেখিয়েছিলেন এরশাদ৷ প্রবল গণবিক্ষোভে ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পরেও বার বার জিতে চমক দেখিয়ে গিয়েছেন৷ যেমন এরশাদ ছিলেন আওয়ামী লীগ সরকারের বিরোধী আবার সরকারেরই বিশেষ দূত ! আবার জাতীয় নির্বাচনে বিরোধী হয়ে লড়াই করা অথচ সরকারের সঙ্গে হাত মিলিয়েই নিজেকে টিকিয়ে রাখার কারিগর৷

এহেন এরশাদের প্রয়াণের কিছু আগে থেকেই তৈরি হচ্ছিল কোন্দল৷ দলে আড়াআড়ি বিভাজন দেখা দেয়৷ একপ্রান্তে বৌদি তথা এরশাদ পত্নী রওশন, অপরদিকে দেওর তথা এরশাদ ভ্রাতা জিএম কাদের৷ মজা করে অনেকেই বলছেন, রাজনীতিক ঝগড়া ছেড়ে দেওর-বৌদির খুনসুটি করাই ভালো৷ তবে দুজনেই একে অপরের মুখ দেখাদেখি বন্ধ করে দেন৷ গত কয়েকদিনের বেশ চর্চিত বিরোধী জাতীয় পার্টির দেওর-বৌদি কাদা ছোঁড়াছুঁড়ি৷ এতে বারে বারে আন্দোলিত হয়েছে বাংলাদেশ রাজনীতি৷ সমর্থকদের অনেকই বীতশ্রদ্ধ৷

এরশাদ পত্নী রওশন সংসদের বিরোধী নেত্রী আর এরশাদের ভাই জিএম কাদের দলের চেয়ারম্যান৷ দুজনেই দুজনের পদটি সম্পূর্ণ রূপে দখল করতে মরিয়া৷ একদা একনায়ক এরশাদ বেঁচে থাকতে বারে বারে এই পরিস্থিতি সামাল দিয়েছিলেন৷ তিনি সমাহিত হওয়ার পর থেকেই চরমে উঠেছে ঝগড়া৷ আর জাতীয় পার্টির সমর্থকদের অনেকেই মনে করছেন, এভাবে সরকারের সঙ্গে আঠায় আঠায় লেগে বিরোধী হওয়ার থেকে আন্দোলনের পথ নেওয়াই ভালো৷ কিন্তু প্রয়াত এরশাদের এই সরকার ঘনিষ্ঠ বিরোধী তকমার ফর্মুলা কেউ মুছতেও পারছিলেন না৷

এরই মধ্যে ক্ষমতায় থাকা আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে অভিযোগ ওঠে, শেখ হাসিনার নির্দেশে তারাই নাকি জাতীয় পার্টির এই কোন্দলকে মদত যুগিয়ে চলেছে৷ এরপরই বিবৃতি দেন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের৷ তিনি বলেন, বিরোধী জাতীয় পার্টির এই বিভাজনের কোন্দল তাদের ঘরোয়া বিষয়৷ চমকপ্রদ মোড় তার পরেই৷ ঝগড়া মুখ দেখা দেখির পর্ব চুকিয়ে একটি নিশ্চিত সমাধানের দিকে এগোতে শুরু করল জাতীয় পার্টি৷ রওশন থাকছেন সংসদের বিরোধী নেত্রী৷

আর জিএম কাদের সাহেব থাকছেন দলের চেয়ারম্যান৷ দু পক্ষের সমঝোতা হয়েছে তা স্বীকার করেছেন জাতীয় পার্টির মহাসচিব মসিউর রহমান রাঙ্গা। ঢাকার অভিজাত এলাকা বারিধারা-তে সাংবাদিক বৈঠকে এমনই জানিয়েছেন তিনি৷ সবই তো সামাল দেওয়া গেল এবারের মতো৷ কিন্তু এরশাদ বিহীন জাতীয় পার্টির কী হবে, তা কেউ বলতে পারছেন না৷ এদিকে নির্বাচন বয়কট করার খেসারত দিয়ে একদা ক্ষমতায় থাকা খালেদা জিয়ার দল বিএনপি সংগঠনের দিক থেকে বেশি সক্রিয় হলেও জাতীয় পার্টির এরশাদীয় ফর্মুলায় পিছিয়ে৷ জল মেপে আওয়ামী লীগের সুপ্রিমো শেখ হাসিনা নিশ্চিত, আগামী সময়েও তাঁর দল ফের ক্ষমতায় আসতে চলেছে বাংলাদেশে৷