মানব গুহ ও সুমন বটব্যাল, কলকাতা: চেনা ছকের বাইরে এ এক অন্য স্বাদের পুজো৷ যেখানে তিলোত্তমার রাজপথই আস্ত মন্ডপ! মৃন্ময়ী নয়, এখানে দেবতা স্বয়ং আমআদমি৷ পুজোর নৈবেদ্য- বাসমতী চাল, সোনামুগের ডাল, ঘি, ময়দা, ছোলার ডাল, তেল ও রান্নার মশলা৷ পুজোর আয়োজনে সাক্ষাৎ অন্নপূর্ণারা৷

হেঁয়ালি নয়৷ মানুষের মধ্যেই ভগবান৷ স্বামীজির বাণীর অনুপ্রেরণা থেকে সামাজিক দায়বদ্ধতার নিরিখে পথে ঘাটে পড়ে থাকা মানুষগুলোকে পুজোর ক’দিন ভরাপেটে একটু ভালোমন্দ খাওয়ানোয় এই ‘মানবপুজো’র থিম। সেই লক্ষ্যেই শ্যামবাজারের ‘ফেরাম থ্যালাসেমিয়া প্রিভেনশন ফেডারেশনে’র প্রমীলাবাহিনী এবারের পুজোয় সাক্ষাৎ দেবতাদের আরাধনায় ব্রতী হয়েছেন৷

ফেডারেশনের অন্যতম সদস্যা মোনালিসা হালদার বলছিলেন, ‘‘আমাদের সমাজে এমন অনেক সহায়সম্বলহীন মানুষ রয়েছেন, যাঁদের বুক ফাটলেও মুখ ফোটে না৷ পুজোর ক’দিন সেই সব মানুষগুলোর মুখে হাসি ফোটানোর লক্ষ্যেই এই আয়োজন৷’’ আজ অর্থাৎ মঙ্গলবার দেবীপক্ষের সূচনার দিন গণদেবতাদের হাতে খাদ্য সামগ্রী তুলে দেবেন শ্যামবাজারের প্রমীলা বাহিনী৷

এদিন বিকেলে টালা, শ্যামবাজার, শোভাবাজার ও মানিকতলা- তিলোত্তমার চারটি পয়েন্টে ১১০টি সহায়সম্বলহীন পরিবারের হাতে পুজোর চারদিনের খাদ্য সামগ্রী তুলে দেবেন উদ্যোক্তারা৷ তাঁদের এই কর্মযজ্ঞে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিয়েছেন অনেকেই৷ যার অন্যতম টালা প্রত্যুষা, শ্যামবাজার ক্রিয়েটর, শোভাবাজার শিক্ষা এডুকেশনাল ট্রাস্ট ও মানিকতলা দিগন্ত ব্যায়ামাগার৷

ঘর-সংসার সামলে সমাজসেবায় পথ চলা এই প্রমীলা বাহিনীতে রয়েছেন প্রায় ১৫ সদস্যা৷ কারও বয়স ২৪ তো কেউ ৬২৷ বয়সের ফারাক থাকলেও মানসিকতায় মিল রয়েছে মোনালিসা হালদার, নিবেদিতা আচার্য, মালঞ্চ সাহা, অসীমা ধরদের৷ অগত্যা, সেপ্টেম্বরের গোড়ায় এক ঘরোয়া বৈঠকে গণদেবতাদের পুজোর ভাবনা উঠতেই সকলে এক বাক্যে রাজি হয়ে গিয়েছিলেন৷

এই কাজে পাশে পেয়েছেন পরিজনদের৷ পথে ঘাটে ঘুরে গণদেবতাদের লিস্ট তৈরি করছেন৷ আর এসব দেখে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিয়েছেন চেনা বিক্রেতারাও৷ জিএসটি সত্ত্বেও তাঁরা হাসিমুখে নৈবেদ্যর ডালিতে উজাড় করে দিয়েছেন খাদ্য সামগ্রী৷

এক সন্তানের জননী মোনালিসা বলছিলেন, ‘‘ইচ্ছে আছে নবমীতে ওদের একটু ইলিশ খাওয়ানোর৷ আর সম্ভব হলে দশমীতে একটু মিষ্টিমুখ৷’’ পরক্ষণেই প্রত্যয়ী কন্ঠে বলে ওঠেন, ‘‘যেভাবে সবাই এগিয়ে আসছেন, আশাকরি বাজেটে ঠিক পুষিয়ে যাবে।’’

স্বাভাবিকভাবেই দুঃখের বারোমাস্যার মাঝে এক চিলতে হাসির রেখা সন্ধ্যা নন্দী, অনিতা শীল, সন্ধ্যা মণ্ডলদের মুখে৷ বলছেন, ‘‘সমাজে এখনও কিছু ভালো মানুষ আছেন, যাঁরা অন্যদের কথা ভাবেন৷ ঈশ্বর ওঁদের মঙ্গল করুক৷’’

মানুষের মধ্যে এভাবে ভগবানকে দেখতে শিখিয়েছিলেন তো স্বামীজি৷ প্রমীলাবাহিনীর অনুপ্রেরণার মূলেও রয়েছেন তিনি৷ অগত্যা, মাতৃপক্ষে গণদেবতার পুজোয় মাতবেন অন্নপূর্ণারা৷

পপ্রশ্ন অনেক: চতুর্থ পর্ব

বর্ণ বৈষম্য নিয়ে যে প্রশ্ন, তার সমাধান কী শুধুই মাঝে মাঝে কিছু প্রতিবাদ