সমস্যা মিটল কই? বরং বাড়ল। মায়ানমারের ওনজায় ভারতীয় সেনাবাহিনীর অকুতোভয় অভিযানে শখানেক সন্ত্রাসবাদী খতম করেও রাজনৈতিক তুষ্টির সুযোগ পাওয়া গেল না৷ ‘হবে না’র দেশে আশাবাদীরা ভারতীয় ফৌজের হট পারস্যুট দেখে বুক বাঁধলেন, এই তো, আমরাও পারি! আমরাও পারি রক্তচক্ষু দেখাতে, আমরাও পারি অন্যের দেশের সীমানায় ঢুকে অভিযান চালাতে, পারি চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দিতে বৈরি পড়শি দেশে। কিছু লোক ভাবলেন, এই তো, ১০০ জন সন্ত্রাসবাদী মেরে ‘জিন্না’র দেশ তথা ভারতের চরম দুশমন ইসলামাবাদকে স্পষ্ট বার্তা দেওয়া গেল যে, ‘লাগতে এসো না, উড়ে যাবে।’ তবে এত কিছুর শেষে আদৌ লাভ হল কতটা? নাকি কেবল আস্ফালনই সার হল? কারণ যাদের বিরুদ্ধে মূল অভিযান, আড়ালে থাকা সেই ৭৫ বছর বয়স্ক মূল মাথাটাই তো বেঁচে গেল। উলটে দু’দিন আগের সেনাবাহিনীর বীরধর্মের দৌলতে যারা রাজনৈতিক বীরদর্প দেখাচ্ছিল, সেই তাদেরই চুপসে গিয়ে গোটা উত্তর-পূর্ব ভারত জুড়ে জঙ্গি হানার হাই অ্যালার্ট জারি করতে হল। কারণ, বেঁচে গিয়েছেন এনএসসিএন-খাপলাং গোষ্ঠীর মূল মাথা চিনের মদতপুষ্ট এসএস খাপলাং।

নীলোৎপল বিশ্বাস
নীলোৎপল বিশ্বাস

ফেব্রুয়ারি মাসে মায়ানমার প্রশাসন বার্ধক্যজনিত অসুখে কাবু খাপলাংকে ইয়াঙ্গনে নিয়ে গিয়ে হাসপাতালে ভরতি করেছিল। মায়ানমারের নাগরিকত্ব নেওয়া খাপলাংকে ওই দেশের সামরিক জুন্টা সে যাত্রায় হাসপাতালে দিয়েছিল ভারতের অনুমতি নিয়েই। ভারত ভেবেছিল, বুড়ো হাড়ে আর কত? কিন্তু না, সে আবার আসিয়াছে ফিরিয়া…! উলফা, পিএলএ ও বোড়ো জঙ্গিদের সঙ্গে নিয়ে ৪ জুন মণিপুরের চান্দেলে ৬ নং ডোগরা রেজিমেন্টের কনভয়ে হামলা চালিয়ে খুন করেছে ১৮ জন ভারতীয় জওয়ানকে। তার পর থেকেই খাপলাংয়ের বিরুদ্ধে আরও সক্রিয় ভারত।

যা তথ্য পাওয়া যাচ্ছে তাতে, প্রাক্তন গোয়েন্দা কর্তা তথা বর্তমান প্রধানমন্ত্রীর স্নেহধন্য জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত দোভালের নেতৃত্বে তৈরি হয়েছিল খাপলাং খতমের ব্লু-প্রিন্ট। মনে করা হয়েছিল, এ যাত্রায় খাপলাংকে নিকেশ করতে পারলে অনেকটাই কোমর ভেঙে দেওয়া যাবে উত্তর-পূর্বের জঙ্গিদের। তবে সব পরিকল্পনা বানচাল করে দিলেন ৭৫ বছরের অসুস্থ ন্যুব্জ খাপলাং। সৌজন্যে চিনা সামরিক গোয়েন্দা সহায়তা৷ ভারতের গোয়েন্দা সূত্র অনুযায়ী, ভারতীয় সেনাবাহিনী হামলা শুরু করতেই পরিস্থিতি যে বেগতিক, তা বুঝে যান পোড়খাওয়া ওই নেতা। পালটা আক্রমণের পথে না হেঁটে নিজস্ব রক্ষীদের ঘেরাটোপে চুপি চুপি পালিয়ে যান তিনি। সেনাসূত্রে পরে স্বীকার করা হয়েছে, সেদিন শতখানেক সন্ত্রাসবাদী মারা গেলেও ১০-১২ জন একান্ত বিশ্বস্ত অনুচর নিয়ে পালিয়ে যান খাপলাং।

অতঃপর ভয় বাড়ল দ্বিগুণ। বহু মাথাওয়ালা সর্পের মূল যে মাথাকে কাটার লক্ষ্যে অভিযান সে পালাতে সক্ষম হয়েছে। অতএব নতুন করে ভারতবিরোধী নাশকতা চালানোর সুযোগও তার পুরোদস্তুর মিলে গিয়েছে৷

১৯৬৪ সাল থেকে পৃথক নাগালিম রাষ্ট্র গঠনের লক্ষ্যে লড়াই করতে নামা নাগা ডিফেন্স ফোর্সের প্রতিষ্ঠাতা কি হাত গুটিয়ে বসে থাকবেন নাকি! পিছনে এখন সিআইএ-র মদত নেই বটে, কিন্তু চিন তো আছে! অতএব নিজ সংগঠনের মনোবল বাড়াতে নিশ্চয়ই পালটা হামলা চালানোর পথে তিনি হাঁটবেনই হাঁটবেন। ইতিহাসও বলছে সে কথাই৷

পৃথক দুই জঙ্গি সংগঠনের সঙ্গে হাত মিলিয়ে ১৯৬৬ সালের শেষের দিকে এসএস খাপলাং গড়ে তোলেন ন্যাশনাল সোস্যালিস্ট কাউন্সিল অব নাগাল্যান্ড(এনএসসিএন)৷পরবর্তীকালে মুইভার সঙ্গে মতপার্থক্যের জন্য জোট সেই ভেঙে তৈরি করেন পৃথক এনএসসিএন (খাপলাং)। অন্য জঙ্গিরা অস্ত্র ছাড়লেও চিনের প্রত্যক্ষ মদতে পৃথক নাগালিম রাষ্ট্রের দাবিতে এখনও সন্ত্রাস চালিয়ে যাচ্ছেন এই খাপলাং। ভারতের সেনাবাহিনীর দুর্ভাগ্য, বেনজির দুঃসাহসিক হট পারস্যুটেও তাঁকে কাবু করা গেল না।

বেজিংয়ের মদতে ভারতের বিরুদ্ধে পৃথক রাষ্ট্রের দাবিতে একা কুম্ভ হয়ে নাশকতা চালাতে থাকা খাপলাং কবে এবং কী আকারে ফের ‘বদলা’ অপারেশন শানান, সেটাই এখন লাখ টাকার প্রশ্ন। অতএব, প্রত্যেক ক্রিয়ারই সমান ও বিপরীত প্রতিক্রিয়া আছে, এটা ধরে নিয়েই তৈরি থাকতে হবে ভারতের সেনাবাহিনীকে।

প্রতিবেদন: নীলোৎপল বিশ্বাস