ফিরোজকে জামাই হিসেবে প্রথমে মানতে পারেননি নেহরু ( ছবি-ইন্টারনেট)

সিদ্ধার্থ মুখোপাধ্যায়: কিছুদিন ধরেই নাৎসি বাহিনীর প্লেন থেকে প্রায় রোজই লন্ডন শহরের উপর বোমা বর্ষণ হচ্ছিল। বেশিরভাগ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলি বন্ধ রাখা হয়েছে। ইংল্যান্ডে পড়তে যাওয়া ভারতীয় ছাত্ররা পড়েছে মহাসংকটে। ব্রিটিশ সরকারও চাইছে না সেখানে থাকা ভারতীয় ছাত্রদের কোনরকম দায়িত্ব নিতে।

চাইছে এরা এবার নিজেদের দেশে ফিরে যাক। সেইমতো বরং ভারতে ফেরানোর জন্য জাহাজের ব্যবস্থা করছে। সেইমতো সমুদ্রপথে আরও বেশ কয়েকজন ছাত্রের সঙ্গে ফিরোজ দেশে ফিরছে। তাদের সঙ্গে রয়েছে ইন্দিরাও।‌ ফিরোজ আর ইন্দিরা একে অপরকে বেশ কয়েক বছর ধরে চেনে।

ইন্দিরার চেয়ে এই যুবক বছর পাঁচেকের বড়। ইন্দিরার মা কমলা নেহরু যখন কঠিন অসুখে অসুস্থ তখন দেশে বলে নয়, বিদেশ বিভূইতেও এই‌ ফিরোজকেই তাদের পাশে থাকতে দেখা গিয়েছে। অসুস্থ কমলার সেবা করতে এগিয়ে এসেছিল এ ছেলেটা। মায়ের মৃত্যুর পরেও ফিরোজের সঙ্গে ইন্দিরার যোগাযোগ হত।

ইন্দিরার বাবা জওহরলাল নেহরু চেয়েছিলেন‌ তার মেয়ে যেন যেন অক্সফোর্ডে পড়া শেষ করে। কিন্তু ইন্দিরা তা না করেই দেশে ফিরছে। হঠাৎ যেন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হওয়ায় আর ভারতের রাজনৈতিক আন্দোলনে যোগ দেওয়ার ইচ্ছায় সে দেশে ফিরছে ঠিকই।

তবে রাজনৈতিক পারিপার্শ্বিক পরিস্থিতির পাশাপাশি ওই সময় ইন্দিরা এবং ফিরোজ তাদের ব্যক্তিগত জীবন সম্পর্কে একটা সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছে।ঠিক করেছে ওরা এবার বিয়ে করবে।‌ দেশে ফিরে কয়েক দিন পরেই ইন্দিরা দেখা করতে যায় জেলে বন্দী তার বাবার সঙ্গে।

মনে মনে একটা আশঙ্কা ফিরোজকে তার বাবা ও পরিবার আদৌ মেনে নেবে তো? সেই ভয়ে বাবার সঙ্গে দেখা হতেই বিয়ের প্রসঙ্গ তোলেনি। সেখান থেকে ঠিক বের হওয়ার আগে ইন্দু তার বাবাকে বিয়ের কথা বলে।

জামাই হিসেবে মন থেকে মেনে নিতে পারছেন না ফিরোজকে অথচ আবার তিনি চান না একমাত্র মেয়ে কোনও রকম কষ্ট পায়। তখন অন্তত কোনও মতামত ইন্দিরাকে জানাতে পারেনি তার বাবা। পরেন দিন মেয়েকে চিঠি লিখলেন ,”যদি তুমি ফিরোজকে বিয়ে করতে চাও, কর। কেউ তোমাকে বাধা দেবে না।”

যদিও পাশাপাশি তিনি মেয়েকে বাস্তব অবস্থা সম্পর্কে সতর্ক করে জানিয়েছিলেন, পারিপার্শ্বিক অবস্থার যে পরিবর্তন হবে সেটাও বুঝে নিতে ‌হবে এবং সেটায় ধীরে ধীরে অভ্যস্ত হতে হবে। নেহেরু তার কন্যাকে বোঝাতে চাইলেন,সে যে নতুন জীবনে যেতে চাইছে তা কেমন তা সে জানে না।

শুধু ফিরোজ বলে নয় তার পরিবারের আরও অনেকের সংস্পর্শে আসতে হবে । এটা যেমন ঠিক কোন পরিবারের সঙ্গে বিবাহ হয় না তেমনি এটাও ঠিক পরিবারকে অগ্রাহ্য করা যায় না।

ফিরোজকে জানলেও পন্ডিতজিও তাদের পরিবারের বা চেনাশোনা অন্য কাউকে চেনেন না বলেই জানিয়েছিলেন সেদিন তাঁর মেয়েকে। জেলে থাকায় জহরলাল ইন্দিরাকে তখন বলেছিলেন , সে যেন এই বিষয়ে তার পিসিদের সঙ্গে আলোচনা করে। ইন্দিরার দুই পিসি প্রথমে কেউই ঠিক এমন প্রস্তাবে সমর্থন দেননি।

এটা ঘটনা জহরলাল বিজয়লক্ষ্মী এবং কৃষ্ণা এরা কেউই কিন্তু প্রেম করে বিয়ের বিরোধী নয়। অসবর্ণ অথবা ভিন্ন ধর্মের বিয়েতেও এদের আপত্তি তেমন ছিল না। বিজয়লক্ষ্মী এবং কৃষ্ণা উভয়ের স্বামী কাশ্মীরি ছিলেন না। তার উপর কৃষ্ণার স্বামী ব্রাহ্মণ ছিলেন না।

এছাড়া তাদের জ্ঞাতি ভাই বি কে নেহরু এক হাঙ্গেরীয় ইহুদিকে বিয়ে করেছিলেন। তাছাড়া তাদের পরিবারের আর এক জ্ঞাতি মুসলমান বিয়ে করেছিলেন। ফিরোজের পড়াশোনার মান খারাপ ছিল না কারণ সে লন্ডন স্কুল অফ ইকোনমিক্সে পড়তে গিয়েছিল।

এতো কিছু সত্বেও তাকে এরা মেনে নিতে পারছিলেন না তার কারণ হলো ফিরোজের সামাজিক এবং আর্থিক মর্যাদার জন্য। এই যুবক কি সক্ষম হবে ইন্দিরা যে রকম পরিবারের আর আরামে মানুষ হয়েছে সেই আরাম দিতে ।

এই কথা অবশ্য এরা কেউই ঠিক বলতে পারেননি। আর তা না বলে বরং বড়রা যেমনভাবে প্রেমে বিভোর সন্তানের মোহভঙ্গ করাতে চায় সেই ভাবেই এক্ষেত্রে কথা বলেছিলেন। পাশাপাশি জহরলাল তখন তাকে গান্ধীজির পরামর্শ নিতেও বলেছিলেন। ইন্দিরা মহাত্মাজির সঙ্গে দেখা করতে রাজি হলেও বুঝিয়ে দিয়েছিলেন ফিরোজকে ছেড়ে আসার তার কোনো ইচ্ছে নেই।

পরিবারকে খুশি করতে গান্ধীজির সঙ্গে দেখা করেছিলেন । তবে প্রিয়দর্শিনী আত্মবিশ্বাসী ছিলেন গান্ধীজির আস্থা অর্জন করতে সক্ষম হবে বলেই ।‌ আর গান্ধীজির আশীর্বাদ নেওয়াটা এক্ষেত্রে তাঁর খুব কাজে লাগবে। গান্ধীজির বুঝেছিলেন, এই মেয়ে বিয়ের ব্যাপারে একেবারে বদ্ধপরিকর তাই তিনি তাঁর মত দেন।

অবশ্য তিনি ফিরোজের কাছ থেকে প্রতিশ্রুতি আদায় করেছিলেন, যতদিন না নেহরু মত দেন ততদিন বিয়ে হবে না। ১৯৪১ সালের ৪ ডিসেম্বর জেল থেকে ছাড়া পান নেহেরু। এর কিছুদিন পর বেনারসে উত্তর প্রদেশ কংগ্রেস কমিটির বৈঠক সেরে রাতের ট্রেনে এলাহাবাদ ফিরছিলেন ইন্দিরা ফিরোজ এবং জওহরলাল।

তারা তিনজন একই কম্পার্টমেন্টে বেশ কিছুক্ষণ ছিলেন। সেই ট্রেন যাত্রাপথেই নেহরুর সম্মতি মিলেছিল। তারপর ১৯৪২ সালের ৬ মার্চ ঘোষণা হল ইন্দিরা ফিরোজের বিয়ে হবে আনন্দ ভবনে ২৬ মার্চ রামনবমীর দিনে। তখন এই বিয়ে নিয়ে গোঁড়া হিন্দু এবং পারসিদের কাছ থেকে ক্ষোভ প্রকাশ করে প্রচুর বেনামে চিঠি আসতে থাকে। ভিন্ন ধর্মের মধ্যে এভাবে বিয়ের বিরোধিতা করে তারা।

এমনকি বিয়ে হলে নানা রকম ভয় দেখাতেও থাকে। ফলে ওই পরিস্থিতিতে নেহেরুকে কিছুটা শক্ত হয়ে বিবৃতি দিতে হয়। সেই বিবৃতিতে নেহেরু জানান, ইন্দিরা এবং ফিরোজ একে অপরকে বিয়ে করতে চায়। ফিরোজ গান্ধী একজন যুবক এবং সে বহু বছর ধরে তাঁদের পারিবারিক বন্ধু এবং তিনি আশা করেন এই যুবক দেশকে সেবা করবে । তাঁকেই তার মেয়ে পছন্দ করেছে ।

এ ক্ষেত্রে এটা গ্রহণ করতে হবে অথবা তাঁকে নীতির বিরুদ্ধে যেতে হবে। তার আশা এই বিবাহের মাধ্যমে সত্যিকারের জীবনের সম্পর্ক গড়ে উঠবে।

পাশাপাশি নেহেরু বলেছিলেন, “মহাত্মা গান্ধী যার মতকে শুধুমাত্র জনগণের ব্যাপারে গুরুত্ব দিই না, ব্যক্তিগত ব্যাপারেও দিয়ে থাকি। তিনি এই প্রস্তাবের পক্ষে আশীর্বাদ দিয়েছেন। আমার পরিবারের সদস্য এবং আমার স্ত্রীয়ের পরিবারের সদস্যরা সম্মতি দিয়েছেন। ” এই বিয়েতে ইন্দিরার হাতে একটি তরবারি তুলে দিয়ে শপথ বাক্য পাঠ করানো হয় যার একটা রাজনৈতিক তাৎপর্য ছিল।

তাতে বলা হয়েছিল, “বিশ্বের চারদিক থেকে যদি কেউ চলে আসে আমাদের স্বাধীনতা‌থেকে বঞ্চিত করতে,আমি তরবারি হাতে তাদের শেষ পর্যন্ত বাধা দেবার জন্য প্রস্তুত হলাম। আমি প্রার্থনা করি এই স্বাধীনতার আলো ছড়িয়ে পড়ুক।যা সবদিক থেকে আমাদের ঢেকে রাখবে।”

তৎকালীন লিডার কাগজ অনুসারে, এই শপথবাক্য গান্ধীজির বার্তা ছিল। কারণ সেই সময় অহিংসার ধর্মবিশ্বাস থাকা সত্ত্বেও মহাত্মা এক মহিলার পক্ষ থেকে হিংসাকে সমর্থন করেছিলেন তাদের মর্যাদা রক্ষার কথা ভেবে। ইন্দিরা ফিরোজের পরিণয়‌ এদেশের বিয়ের জগতেও একটা সংস্কার বলা চলে। হিন্দুর সঙ্গে একজন অহিন্দুর বিবাহ। এই বিয়ের পরেও তাদের দুজনেই আগের মতই রইলেন। যা পরবর্তীকালে আইন ও সংস্কারের‌ ক্ষেত্রে উদাহরণ হয়ে ওঠে।

তথ্য ঋণ- 1Feroze Gandhi A Political biography :Shashi Bhushan 2.Feroze Gandhi A Crusader in Parliament: Tarun Kumar Mukhopadhyay 3.Feroze the forgotten Gandhi:Bertil Falk 4.The Sanjay story:Vinod Mehta

প্রশ্ন অনেক-এর বিশেষ পর্ব 'দশভূজা'য় মুখোমুখি ঝুলন গোস্বামী।