বণিকসভায় যোগ চর্চা

স্মার্টফোনে দুনিয়া মুঠঠিমে এসে গিয়েছে৷ এবার যোগ বলে রোগমুক্ত দীর্ঘজীবনের অপেক্ষায় দুনিয়া!

যোগচর্চা মানব জীবনে অন্য মাত্রা এনে দিতে চলেছে ৷ সুস্থ সবল শান্তিতে বেঁচে থাকতে সবচেয়ে সস্তার দাওয়াই হল এটি৷ অন্তত গত কয়েকদিন ধরে ঘটনাপ্রবাহ এবং প্রচার তেমনই বার্তা দিচ্ছে ৷ তবে যোগ শুধু পরিষেবা ক্ষেত্রেই নয়া মাত্রা দেবে তা নয়, ভারতের অর্থনীতিতেও নতুন অধ্যায় শুরু করতে পারে৷ ইতিমধ্যেই তো গোটা বিশ্বজুড়ে যোগা-বাজার গড়ে ওঠার সংকেত মিলেছে ৷ সে বাজার গড়ে উঠলে ভারতীয়দের(পড়ুন যোগীদের) লাভবান হওয়ার সম্ভাবনা প্রবল তা বলাই বাহুল্য৷

একটা সময় ছিল যখন শিল্প বললেই যে কারখানা-চিমনির ধোঁয়া ভাবতে হবে এমন নয় ৷ দিন বদলেছে৷ শিল্পের বিবর্তনের ফলে শুধু মাত্র উৎপাদন ক্ষেত্রেই শিল্পকে আটকে রাখা সম্ভব নয়৷ আস্তে আস্তে পরিষেবাও শিল্পক্ষেত্রে নিজস্ব একটা জায়গা করে নিয়েছে ৷ আগে মূলত পরিষেবা বলতে ভাবা হত ব্যাংক, বিমা, হোটেল, পর্যটন ইত্যাদি৷ কিন্তু প্রতিনিয়ত মানুষের কাজ লাগে এমন অনেক কিছুই এখন পরিষেবার তকমা পেয়ে যাচ্ছে ৷ এর জেরে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে হাসপাতাল এখন লগ্নিকারীদের বিনিয়োগের জায়গা হয়ে উঠছে ৷ আগে জমিদার কিংবা ব্যবসায়ীরা দান ধ্যান স্বরূপ জনহিতের কথা ভেবে স্কুল-কলেজ-হাসপাতাল গড়ে তুলতেন৷ সেই সব প্রতিষ্ঠান চালানোর ক্ষেত্রে অনেক সময় বেশ কিছু অভিযোগ থাকলেও সেগুলি থেকে মুনাফার কথা কখনও ভাবা হত না৷ যারা করে যেতেন তাঁরা তাঁদের মা-বাবা অথবা পূর্বপুরুষদের স্মৃতিরক্ষার্থে এমন উদ্যোগ নিতেন৷ অর্থাৎ এমন উদ্যোগের উদ্দেশ্য ছিল যার নামে ওই প্রতিষ্ঠানটি সেই ব্যক্তির মৃত্যুর পরেও যাতে মানুষের মনে নামটি টিকিয়ে রাখা যায়৷ কিন্তু বেসরকারিকরণের জোয়ারে ভেসে এখন তো শিক্ষা-স্বাস্থ্য পরিষেবায় পরিণত হয়েছে ৷ যদিও সেই পরিষেবার দাম এবং গুণগত মান নিয়ে নানা সময়ই প্রশ্ন উঠছে ৷ এখন যে সব হাসপাতাল কিংবা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে টাকা ঢালা হচ্ছে সেগুলি আর কোনও মতেই দাতব্য প্রতিষ্ঠান নয়৷ একেবারে কড়ায় গণ্ডায় লাভের অংক বুঝে নিতে চায় এই সব উদ্যোগপতিরা৷ রোগীকে আয়ের উৎস মনে করে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ অযথা একগুচ্ছ পরীক্ষা করে নিয়ে বিলের অংকটা বাড়িয়ে তুলতে নেমে পড়ে ৷ অন্যদিকে, এই সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলির স্বীকৃতি এবং পড়ানোর মান নিয়ে নানা সময় নানা রকম প্রশ্ন উঠতে দেখা যায়৷ Yoga-Day-2

এটা ঠিক গত দু’দশক ধরে তথ্যপ্রযুক্তি শিল্পের প্রসার বিপ্লব এনে দিয়েছে মানব জীবনে৷ দুনিয়া জুড়ে তথ্যপ্রযুক্তির বিস্তারে আর্থিক ভাবে লাভবান হয়েছেন অবশ্যই ভারতীয়রা ৷ এক সময় এদেশে যারা চাকুরির সম্ভাবনা সংকুচিত হওয়ার আশংকায় কম্পিউটারের বিরোধিতা করেছিলেন তাঁরাও পরে নিজেদের ভুল বুঝতে পেরে পুরনো নীতি ঝেড়ে ফেলে তথ্যপ্রযুক্তিকে বরণ করে নিয়েছেন৷ তথ্যপ্রযুক্তি যত এগিয়েছে ততই মাউস, ইন্টারনেট আর স্মার্টফোন ক্রমশ পৃথিবীটাকে ছোট করে দিয়ে একেবারে নাগালের মধ্যে এনে দিয়েছে ৷ ইংরেজি জানার সুবাদে এবং সহজাত গাণিতিক মেধায় অন্যদের থেকে ভারতীয়রা পারদর্শী হওয়ায় কম্পিউটার জগতে দখলদারি নিতে পেরেছে ৷ তবে ইদানিং চিনের মানুষ ইংরেজি শেখার দিকে নজর দেওয়ায় ভারতীয়দের তথ্যপ্রযুক্তি সাম্রাজ্যে ভবিষ্যত নিয়ে দুশ্চিন্তা দানা বাঁধছে ৷ কারণ ইংরেজি না জানলেও চিনাদেরও ভারতীয়দের মতোই সহজাত গাণিতিক মেধা রয়েছে বলেই মনে করা হয়৷

তথ্যপ্রযুক্তি ক্ষেত্রে যত এগিয়েছে ভারতবাসীরা ততই তারা ইর্ষার পাত্র হয়ে উঠেছেন ইউরোপ অ্যামেরিকায়৷ তাই বলা হত গত শতাব্দীর শেষ লগ্নে উন্নাসিক সাদা চামড়ার একদল সাহেবদের কষ্টের দিন শুরু৷ শোনা যেত ইউরোপের বেশ কিছু মানুষ যারা ভারতীয় বলতে বুঝত ভিখারি-সাপুড়ে-বাবাজি, তাদের পক্ষে এই সব কালো ভারতীয়দের কাছ থেকে কম্পিউটারে প্রশিক্ষণ নেওয়া মানসিক ভাবে ছিল রীতিমতো পীড়াদায়ক ৷ তবু নিয়তির খেলায় ভারতীয়দের অধীনেই তাদের কাজ করতে হচ্ছে ৷

অবশ্য সেদিক দিয়ে বলা চলে ‘কর্পোরেট অফিসের বস’ হিসেবে ভারতীয়দের মেনে নিতে কষ্ট হলেও সাহেব-মেমরা ভারতীয় সাধুবাবা, যোগীদের গুরু মেনে তাঁদের চরণতলে আশ্রয় নিতে বেশ আগ্রহী ৷ নইলে বিদেশেও নানা ভারতীয় বাবাজীদের এত শিষ্য শিষ্যা ছড়িয়ে পড়ত না ৷ এদিকে রাষ্ট্রসংঘের কাছ থেকে আন্তর্জাতিক যোগ দিবসের স্বীকৃতি আদায় করতে সক্ষম হয়েছেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী৷ শুধু আন্তর্জাতিক দিবস হিসেবে স্বীকৃতিই নয় গত রবিবার ভারতের সীমানা ছাড়িয়ে গোটা দুনিয়াই মেতে উঠেছিল যোগ-চর্চায়৷ শারীরিক ভাবে সুস্থ থাকতে মানসিক ভাবে শান্তি পেতে যোগাই পথ দেখাতে পারে এই বার্তা গোটা বিশ্ব মোটামুটি গ্রহণ করেছে ৷ যার জন্য ইতিমধ্যেই চাহিদা বাড়তে শুরু করে দিয়েছে যোগ-চর্চার জন্য ব্যবহৃত ম্যাট , পোশাক ও অন্যান্য সরঞ্জামের৷ যোগ গুরুদের কদর বাড়ছে ৷ নজর এড়ায়নি বণিকসভার৷ লক্ষ্য রেখে চলেছে পরিবর্তিত পরিস্থিতির দিকে ৷ তাদের হিসেব বলছে, দুনিয়া জুড়ে মানুষের এমন সাড়ায় এই বাজার ৩৫ শতাংশ বেড়ে গিয়েছে ৷ তাই তো দেশের ভিতর সিনেমার নায়ক নায়িকাদের পাশাপাশি শিল্পপতি এবং বণিকসভার প্রতিনিধিরাও গত রবিরার অংশ নিয়েছিল যোগ-যজ্ঞে ৷ অতএব বাবাজীরা সাবধান ৷ যোগা বিপ্লব থেকে উঠে আসা অমৃতের ভাগ দিতে হবেই শিল্পমহলকেও ৷ তবে বাবাজীদের খুব বেশি দুশ্চিন্তা করার দরকার নেই কারণ শিল্পপতিরা গুরুজিদের সামনে রেখেই ব্যবসা করবেন৷ অর্থাৎ গুরুজীরা থাকবেন যেমন থাকার তবে তাদের রিমোট কন্ট্রোলটা চলে যেতে পারে কোনও এক শিল্পগোষ্ঠীর হাতে৷

প্রতিবেদক: সিদ্ধার্থ মুখোপাধ্যায়