সৌপ্তিক বন্দ্যোপাধ্যায়: সাকুল্যে খান পঞ্চাশেক মাটির ঘর। পানায় ভরা পুকুর, বুড়ো বটগাছের ছায়ায় ক’য়ে যাওয়া নানান গ্রামীন গল্প, চাষ-আবাদের ‘খবরা খবরর’। যেমনটি আর পাঁচটা অনামী বাংলার গ্রামে হয়ে থাকে। তেমনই এক গ্রাম কোমধারা। হুগলী জেলার বাবনান থানার অন্তর্গত এই গ্রাম সিঙ্গুরের অন্তর্গত। সেই সিঙ্গুর যা একসময় রাজ্যের রাজনৈতিক পটভূমি বদলে দিয়েছিল ভারী শিল্পকে রুখে দিয়ে মাটি আঁকড়ে পড়ে থেকে। সেই গ্রামের ছেলে মেয়েরা যেন হয় উঠলেন এক এক জন বড় ভাস্কর্য শিল্পী। মাটিকে আঁকড়ে ধরেই। মাটির তাল হাতে পরতেই ওঁরা বানিয়ে নিল নানারকম সব মূর্তি।

কে বলে , ‘মডার্ন আর্ট’ এর জন্য বিশাল শিক্ষার প্রয়োজন। ওঁদের সবার বয়স দশের মধ্যে। কেউ ক্লাস ওয়ানে পরে কেউ ক্লাস ফাইভ। অনেকে আবার স্কুল ছুট। বাড়িতে দারিদ্রের টান , কি হবে ইস্কুলে গিয়ে। যাবার দরকার নেই। শিল্প লুকিয়ে রয়েছে মনের মধ্যে। সেই প্রমাণ দিল কোমধারা। একের পর এক ভাস্কর্য সহজেই বানাল ওঁরা। যেমন খুশি নিজের মতোই কিন্ত অনবদ্য। কে শেখাল ওঁদের? প্রকৃতি উত্তর দেয়, ‘আমি’। রবিবার আয়োজিত হয়েছিল, ‘অরগ্যানিক লাইট’ শিরোনামে একদিনের শিল্পকলা, সংস্কৃতি ‘মেলা’। কোমধারা বারোয়ারি সমিতি ও শিক্ষা বিকাশ সেবা ফাউন্ডেশনের উদ্যোগে সারাদিন ব্যাপী এই অনুষ্ঠানে ছিলেন বহু দেশী – বিদেশী শিল্পীর অপ্রচলিত শিল্পকর্মের এক অতুলনীয় প্রদর্শনী। অন্যতম শিশুদের শিল্প কর্মশালা।

পাশাপাশি ছিল স্বাস্থ্য পরীক্ষা ও সঙ্গীতানুষ্ঠান। অনুষ্ঠানের অনুওতম আয়োজক পবিত্র মিত্র বলেন, ‘এটা বেঙ্গল বিনালে নয় তবে নিঃসন্দেহে তারই অংশ বলা যেতেই পারে। এর মূল উদ্দেশ্য গ্রাম বাংলার শিশুরা অন্ধকারের মধ্যে থেকে বেড়িয়ে তাঁদের অন্তরের কথা শিল্পের মাধ্যমে প্রকাশ করুক। সেটা বাস্তব করতে পেরেছি। প্রায় ১০০ জন শিশু বসে তাঁদের ভিতরের শিল্পী সত্ত্বাকে প্রকাশ্যে আনল। ওঁদের একটা অন্যদিক প্রকাশ পেল। আগামী দিনে যা ওঁদের মনের বিকাশ ঘটাবে।’

সম্প্রতি এই গ্রামেই হয়েছিল ‘বিনালে একজিবিসশন’। ভারতে অনুষ্ঠিত সবচেয়ে প্রচলিত এমন ‘Binnale Exhibition’ হয় কেরালার ‘কোচি’ শহরে, তার নাম হল ‘Kochi-Muziris Biennale’। এখন বাংলার কোমধারাও এই একজিবিসশনের অঙ্গ। ‘ঘীয়া’ নদীর মরা সোঁতা পেড়িয়ে কোমধারা গ্রামে ঢুকেই মনে হল হবে যেন স্বপ্ন রাজ্যে প্রবেশ করলেন। প্রতিটা ঘর সেজে উঠেছে সমকালীন শিল্পীদের আপন খেয়াল-তুলির বলিষ্ঠ টানে। তারই একটি অঙ্গ ছিল ‘অরগ্যানিক লাইট’। কোনওরকম প্রচার ছাড়াই এই ‘Bangla biennale-19’ অনুষ্ঠানটি করা হয়েছিল। ২০২১-এর ফেব্রুয়ারী মাসেই কোমধারায় আবার হবে ‘Bangla biennale-21’। তখন দেখে আসতেই পারেন এই গ্রামটিকে।