রানা দাস, কলকাতা: জঙ্গি কার্যকলাপ প্রতিরোধে ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তে ‘হাইটেক’ নজরদারিকে ফাঁকি দিয়েই এপারে ঘাঁটি গেড়েছিল জামাত জঙ্গি সাজিদরা৷ দেদার জাল নোটের আমদানি, চোরাচালান এবং জঙ্গি আনাগোনা রোধ করতে অত্যাধুনিক নজরদারি কার্যত বিফলেই গিয়েছে৷ ভারতীয় সীমান্ত রক্ষী বাহিনীর (বিএসএফ) হাতে আধুনিক প্রযুক্তির সরঞ্জাম তুলে দেওয়া হলেও সাজিদদের মতো জামাত জঙ্গিদের এপারে ঘাঁটি করা আটকাতে পারেনি কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রক৷

কারণ, বছর তিনেক আগেই বিএসএফকে সীমান্ত নজরে হাইটেক প্রযুক্তিতে সাজিয়ে তোলা হলেও, এপার-ওপার বাংলায় অবাধে যাতায়াত করেছে সাজিদ-সঙ্গী ফিঁদায়ে জঙ্গিরা৷ বাংলাদেশকে অশান্ত করে তুলতে বর্ধমান-মুর্শিদাবাদের গবেষণাগার থেকে অবাধে বিস্ফোরক পাচার করা হয়েছে৷ স্বাভাবিকভাবেই কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের বিষনজরে এখন ভারতীয় সীমান্ত রক্ষী বাহিনী৷

ভারতীয় সীমান্ত রক্ষী বাহিনীর এক মুখপাত্র জানালেন, জমি সহ বেশ কিছু সমস্যার জন্য ইন্দো-বাংলা সীমান্তের অনেকটাই এখনও উন্মুক্ত৷ সমস্যার কারণে কাঁটাতারের বেড়া দেওয়া সম্ভবপর হয়নি৷ তাই, সীমান্তে নজরদারি বাড়াতে আধুনিক প্রযুক্তির শরণ নেওয়া হয়েছে৷ ইতিমধ্যেই, বিএসএফ জওয়াননদের হাতে তুলে দেওয়া হয়েছে এই সমস্ত সরঞ্জাম৷ এই তালিকায় রয়েছে, লং রেঞ্জ অবজার্ভেশন সিস্টেম, নজরদারি রাডার, হস্তচালিক থার্মাল ইমেজারস, নাইট ভিশন ডিভাইস এবং নাইট ভিশন চশমা৷ এক বিএসএফ কর্তা জানালেন, এই সমস্ত অত্যাধুনিক যন্ত্রপাতি দিয়ে বর্ডার আউটপোস্ট থেকেই জিরো পয়েন্ট নজরদারি চালানো যাবে৷ এই অত্যাধুনিক নজরদারি ভেদ করে কাকপক্ষীও গলতে পারে না৷ ওয়াচ টাওয়ারে স্থাপন রাডারেই ধরা পড়বে অনুপ্রবেশকারী এবং চোরাচালানকারীদের গতিবিধি৷ ফলে, এক্কেবারে আঁটসাঁট করা হয়েছে ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তের নজরদারি৷

খাগড়াগড় বিস্ফোরণস্থলে জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত ডোভাল৷ ফাইল ছবি-কলকাতা24×7

বিএসএফ কর্তার এই দাবি এবং কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রকের উদ্দেশ্য যে ফাঁকা আওয়াজ, তার প্রমাণ করেছে বর্ধমানের খাগড়াগড়ের বিস্ফোরণ৷ অনেক টালবাহানার পর কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা তদন্তভার গ্রহণের পর ভারতীয় সীমান্ত রক্ষী বাহিনীর ঢিলেঢালা নজরদারির দিকটা প্রকাশ্যে চলে এল৷ প্রশ্ন উঠেছে, বাংলাদেশে নাশকতা ও অশান্ত করার জন্য জঙ্গিরা এপার বাংলা থেকে রসদ নিয়ে গিয়েছে নিয়মিত৷ তারা অবাধে ভারত-বাংলাদেশ সীমা পারাপার করেছে৷ প্রশ্ন উঠেছে, কেনও ভারতীয় সীমান্ত রক্ষী বাহিনীকে হাইটেক প্রযুক্তিতে সাজিয়ে তোলা নজরদারি ব্যবস্থায় তা ধরা পড়ল না৷

নয়াদিল্লির নর্থ ব্লকের উপলব্ধি, এই দেশে অবাধে ভারতীয় জালনোট আমদানির প্রধান উৎসব প্রতিবেশি বাংলাদেশ৷ চোরাপথে, বিএসএফের নজরদারি এড়িয়ে সীমান্ত পেরিয়ে দেদারে ঢুকে পড়েছে ৫০০, ১০০০ টাকার ভারতীয় জালনোট৷ একই সঙ্গে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রকের মাথাব্যাথার কারণ ছিল অনুপ্রবেশ এবং বাংলাদেশকে ঘাঁটি করে সন্ত্রাসবাদী সংগঠনগুলির ভারত-বিরোধী কার্যকলাপ৷ অতীত থেকে শিক্ষা নিয়েই ইন্দো-বাংলা সীমান্তের নিরাপত্তা আঁটসাঁট করা হয়েছিল৷ বাস্তবে, তা ফলপ্রসু হয়নি৷ বরং খাগড়াগড়ের ঘটনার পর কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রকের মাথাব্যাথা বাড়ল বই কমল না৷ উলটে রাজ্য প্রশাসনের দিকে আঙুল তুললেও, এই রাজ্যে জামাত-ঘাঁটির দায় এড়াতে পারছে না নর্থ ব্লকও৷

ভারতীয় সীমান্ত রক্ষী বাহিনীর একটি সুত্রে জানা যাচ্ছে, সারাদেশে ২২৮৯.৬৬ কিলোমিটার ভারত-পাকিস্তান সীমান্ত রয়েছে৷ আর ভারত-বাংলাদেশ সীমান্ত এলাকা রয়েছে ৮০৯৬.৭০ কিলোমিটার৷ অনুপ্রবেশ প্রতিরোধে কাঁটাতারের বেড়া দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল এক যুগ আগে৷ কিন্তু, সীমান্তের বেশ কিছু এলাকায় এখনও কাঁটাতারের বেড়া দেওয়ার কাজ শেষ করতেই পারেনি সেন্ট্রাল পাবলিক ওয়াকর্স ডিপার্টমেন্ট (সিপিডবুলডি)৷ পরিসংখ্যান বলছে, এই রাজ্যে এখনও ১০১ কিলোমিটারে কাছাকাছি ভারত-বাংলাদেশ সীমান্ত উন্মুক্ত৷ এক বিএসএফ কর্তা জানাচ্ছেন, জমি অধিগ্রহণ সংক্রান্ত সমস্যা এবং বেশকিছু গ্রামকে স্থানান্তরিত করতে না পারার কারণে কাঁটাতারের বেড়া দেওয়ার কাজ শেষ করা যায়নি৷ এই উন্মুক্ত ১০১ কিলোমিটার এলাকায় বেড়া দেওয়ার লক্ষ্যমাত্রা ছিল ২০১২ সাল৷

কিন্তু, জটিলতার কারণে সেই লক্ষ্যপূরণে ব্যর্থ হয়েছে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রক৷একদিকে উন্মুক্ত সীমান্ত, অন্যদিকে ভারতীয় সীমান্ত রক্ষী বাহিনীর ঢিলেঢালা নজরদারির কারণেই বাংলাদেশ থেকে বিতারিত-পলাতক জামাত-জঙ্গিরা এই রাজ্যে ঘাঁটি গেড়ে ছিল নিশ্চিন্তে৷ অবাধে সীমা পারাপার করে এপারে তৈরি বিস্ফোরক পাচার করেছে ওপারের নাশকতার কাজে৷

পচামড়াজাত পণ্যের ফ্যাশনের দুনিয়ায় উজ্জ্বল তাঁর নাম, মুখোমুখি দশভূজা তাসলিমা মিজি।