মানব গুহ, কলকাতা: ‘আচ্ছে দিন আয়েগা’৷ মোদীর স্বপ্নের আচ্ছে দিনের প্রতীক্ষায় গোটা ভারত৷ আচ্ছে দিনের প্রত্যাশায় মোদীকে ভোট দিয়ে দিন গুনছেন ভারতবাসী৷ কিন্তু কোথায় আচ্ছে দিন?! দিন দিন জঘন্য কালো দিন দেখছে আমজনতা৷ আচ্ছা দিনটা যে স্রেফ বাচ্চা ভোলানো কথা তা এতদিনে জেনে গেছেন সাধারণ মানুষ৷

‘আচ্ছে দিন আয়েগা’৷ প্রধানমন্ত্রীর ভাষণে বুক বেঁধেছিলেন আমজনতা৷ স্বাধীনতার পর তো অনেকবারই স্বপ্ন দেখেছিলেন ভারতবাসী৷ অনেকবার কংগ্রেস, বেশ কয়েকবার জোট সরকার, মাঝে বাজপেয়ীর বিজেপি সরকার ও এখন মোদীর বিজেপি সরকার৷ ‘আগলিবার মোদী সরকার’, স্বপ্নে বিভোর ভারতবাসী ফের আরেকবার স্বপ্ন দেখলেন৷ কিন্তু সেটা দিনের পর দিন এত ‘আগলি’ (Ugly) হয়ে উঠবে সেটা স্বপ্নেও ভাবে নি আমজনতা৷ ফের একবার স্বপ্নভঙ্গ৷ রাজনৈতিক নেতাদের বাকচাতুরীতে ভুলে স্বপ্ন দেখে কতবার যে ঠকবে ভারতবাসী তা কেউ জানে না৷

আচ্ছে দিন আয়েগা৷ জিরো ব্যালেন্সে গরীব মানুষদের ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট খুলে বিভিন্ন সুবিধার স্বপ্ন দেখিয়েছিলেন মোদীজি৷ দেশ জুড়ে কোটি কোটি ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট খোলা হল ঘটা করে৷ যাঁরা কোনদিন ব্যাঙ্কে যান নি তাঁরাও ব্যাঙ্কে অ্যাকাউন্ট খুললেন৷ ১০০ দিনের কাজ থেকে বিভিন্ন ভাতা পেতে শুরু করলেন ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট মারফত৷ সবাই ভাবলেন, এই তো আচ্ছে দিনের শুরু৷ ব্যাস, স্বপ্ন দেখতে না দেখতেই স্বপ্নভঙ্গ৷ অ্যাকাউন্টে কম ব্যালেন্স রাখার কারণে মোদীর নির্দেশে ব্যাঙ্ক কাটতে শুর করলো ফাইন৷ ৫০০০ টাকার কম ব্যালেন্স থাকলেই জরিমানা নিতে শুরু করল ব্যাঙ্ক৷ ব্যাস, মোদীর বাকচাতুরীতে ভুলে স্বপ্ন দেখা গরীব মানুষদের চূড়ান্ত স্বপ্নভঙ্গ৷ আচ্ছে দিন চলা গেয়া৷

অন্য়দিকে বিভিন্ন শিল্পপতিদের ব্যাঙ্কঋণ মকুব করে সাধারণ মানুষের উপর আরও চাপ বাড়াচ্ছে মোদী সরকার৷ মনমোহন সিং সরকারের আমল থেকে বড় শিল্পপতিদের যে ঋণ দেওয়া ও ঋণ মকুবের জঘন্ন খেলা শুরু হয়েছিল তা মোদী সরকারের আমলেও বলবৎ আছে৷ অর্থাৎ পাল্টায় নি কিছুই৷

আচ্ছে দিন নয়, আরও কালো দিন এসেছে ভারতে৷ যদিও অরুণ জেটলি বলেছেন, মোদী সরকার আসার পর শিল্পপতিদের কোন ঋণ মকুবের ঘটনা ঘটে নি৷ কিন্তু কোটি কোটি টাকা ব্যাঙ্ক ঋণ আদায় করার কোন রাস্তাও বের করে নি মোদী সরকার৷ তার ফল ভোগ করতে হচ্ছে সাধারণ মানুষকেই৷ আদানী, আম্বানী ও মালিয়ার কোটি কোটি টাকা ঋণ মকুব হচ্ছে আর সাধারণ মানুষের অল্প টাকার অ্যাকাউন্ট থেকে টাকা কেটে আখের গোছাবার চেষ্টা করছে ব্যাঙ্কগুলি৷

Demonetisation বা নোটবন্দীর খেলা৷ বাতিল ৫০০ ও ১০০০ টাকার নোট৷ ২০১৬ র ৮ ই নভেম্বর সন্ধ্যের এক ঘোষণায় গোটা ভারত নেমে এসেছিল বিভিন্ন ব্যাঙ্কের ATM এর লাইনে৷ ‘আচ্ছে দিন’ আয়েগা৷ ধরা পড়ে যাবে কোটি কোটি টাকার কালো টাকা৷ আবার আশায় বুক বাঁধলেন ভারতবাসী৷ ‘দেখ কেমন লাগে, আর কালো টাকা করবি?’ এবার ঠিক ধরা পড়ে যাবে, কোটি কোটি টাকা ঘুষ খেয়ে যারা কালো টাকা করেছে তারা৷ ৪-৫ মাস কি নিদারূণ কষ্টে কাটিয়েছে ভারতবাসী৷ এবার আচ্ছে দিন আসবে৷

কিন্তু কোথায় কি? রিজার্ভ ব্যাঙ্কের হিসাব মতো ৯৯ শতাংশ টাকাই জমা পড়ে গেছে বিভিন্ন ব্যাঙ্কে ও সেখান থেকে রিজার্ভ ব্যাঙ্কে৷ কোথায় গেল কালো টাকা? কোথায় গেল ঘুষের টাকা? কোথায় গেল আচ্ছে দিন? জবাব নেই৷ প্রাক্তন রিজার্ভ ব্যাঙ্ক গভর্নর রঘুরাম রাজন বলেছেন, নোটবাতিল অর্থনৈতিক ভাবে পুরোপুরি ব্যর্থ, ফল ভোগ করেছে গরীবরাই৷ ‘আচ্ছে দিনে’ র কি আচ্ছা নমুনা !!

বিশ্ব বাজারে কমেছে ক্রুড ওয়েলের দাম৷ সাধারণত: বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম কমলে সব দেশেই কমে পেট্রোল ডিজেলের দাম৷ কিন্তু ভারতে কি হচ্ছে? ভারতে তো মোদীর আচ্ছে দিন চলছে! আর তাই ‘আচ্ছে দিনে’ দিন দিন বাড়ছে তেলের দাম৷ ধীরে ধীরে তেলের দাম আকাশছোঁয়া হয়ে যাচ্ছে৷ তেলের দাম বাড়ার ফলে বাজারে বাড়ছে জিনিসপত্রের দাম৷ সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষের নাভিশ্বাস উঠে যাচ্ছে৷ কংগ্রেস আমলে তেলের, গ্যাসের দাম বাড়লে দেশ জুড়ে রাস্তায় বসে পড়তেন বিজেপি নেতারা৷ আর আজ, তেল আর রান্নার গ্যাসের দাম আকাশছোঁয়া হয়েছে ‘আচ্ছে দিনে’৷

ভারতের তুলনায় অনেক পিছিয়ে থাকা প্রতিবেশী দেশগুলিতে ভারতীয় মুদ্রায় পেট্রোল ও ডিজেলের দাম কত?
১লা সেপ্টেম্বর ২০১৭ তে দিল্লীতে এক লিটার পেট্রোলের দাম ৬৯.২৬ টাকা৷ পাকিস্থানে ৪০.৮২ টাকা, শ্রীলঙ্কাতে ৪৯.৮০ টাকা, নেপালে ৬১.৮৮ টাকা বাংলাদেশে প্রায় ভারতের সমান দাম ৬৯.১৬ টাকা৷

ডিজেলে দিল্লীতে দাম প্রতি লিটারে ৫৭.১৩ টাকা, শ্রীলঙ্কাতে ৪০.৪৩ টাকা, নেপালে ৪৬.৭২, পাকিস্থানে ৪৭.১৫ টাকা ও বাংলাদেশে ৫২.২৭ টাকা৷ ভারতের প্রতিবেশি দেশগুলিতে ভারতের চেয়েও ভালো ‘আচ্ছে দিন’ চলছে বলাই যায়৷

‘আচ্ছে দিনে’ ভারতের GDP বা গ্রস ডমেস্টিক প্রোডাক্ট কমে এসেছে তলানিতে৷ ২০১৬ র ৯.২ থেকে GDP কমতে কমতে ২০১৭ জানুয়ারীতে ৬.১ হয়ে জুলাই এ দাঁড়িয়েছে ৫.৭৷ কমছে আরও কমছে GDP৷ আচ্ছে দিন আসছে!

এগ্রিকালচার প্রোডাকশন বা কৃষি উৎপাদনে অনেক পিছিয়ে গেছে মোদীর ভারত৷ খাদ্য শস্য উৎপাদনেও অনেক পিছনের সারিতে ‘আচ্ছে দিনে’ র ভারত৷ গত চারটি কেন্দ্রীয় সরকারের হিসাব অনুযায়ী একেবারে পিছনের সারিতে মোদী সরকার৷ দুটি কংগ্রেস শাসিত সরকার তো বটেই এমনকি মোদীর সরকার ঢের পিছিয়ে বিজেপিরই বাজপেয়ী সরকারের চেয়েও৷ এটাই কি আচ্ছে দিনের নমুনা?

রিজার্ভ ব্যাঙ্ক অফ ইন্ডিয়ার হিসাব অনুযায়ী, বাজপেয়ী সরকারের আমলে এগ্রিকালচার প্রোডাকশন বা কৃষি উৎপাদনে তলানিতেই ছিল ভারত৷ কিন্তু UPA1 আমলে কৃষি উৎপাদন বেড়ে হয়েছিল ৫.৪, UPA 2 তে তা কমে হয় ২.৫৷ তবে, মোদী সরকারের সময় তা সবচেয়ে কমে হয়েছে -২.১৷ হাঁ, মাইনাস -২.১৷ আচ্ছে দিনের কি নমুনা৷

খাদ্য শস্য উৎপাদনেও মাইনাসে চলছে মোদী সরকার৷ বাজপেয়া সরকার ০.৭, UPA1 আমলে ১.৯, UPA2 আমলে ২.৬, কিন্তু মোদী সরকারের আমলে সেটা কমে দাঁড়িয়েছে মাইনাস -২.৫৷ আচ্ছে দিনের শুরু৷

ম্যানুফ্যাকচারিং বা উৎপাদনেও মোদী সরকার তলানীতে৷ বাজপেয়ীর আমলে ছিল ৫.৭, UPA1 আমলে ১১.৭০, UPA2 আমলে কমে হয় ৩.৪, মোদীর আমলে আরও কমে হয়েছে ২.২৷ আচ্ছে দিনের শুরু৷

ইলেকট্রিসিটি উৎপাদনেই একমাত্র গড়পরতা সাফল্যের মধ্যেই রয়েছে মোদী সরকার৷ বাজপেয়ী সরকারের আমলে ছিল ৪.৫, UPA1 এর আমলে ছিল ৫.১, UPA2 আমলে ছিল ৭.৭, মোদী সরকারের আমলে সেটা দাঁড়িয়েছে ৬.৯৷

পারসোন্যাল ইনকাম বা ব্যক্তিগত উপার্জনও মোদীর আমলে কমেছে৷ বাজপেয়ীর আমলে ভারতবাসীর গড় ব্যক্তিগত উপার্জন ছিল ১০.০, UPA1 আমলে হয় ১৪.০, UPA2 আমলে গড় ব্যক্তিগত উপার্জন ছিল ১৩.৬, মোদীর আমলে কমে দাঁড়িয়েছে ৯.০৷ আচ্ছে দিনের এই কি নমুনা?

প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর থেকেই বিদেশ ভ্রমণে অভ্যস্থ নরেন্দ্র মোদী সরকারের আমলে এক্সপোর্ট বা রপ্তানী সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে৷ বিদেশ ভ্রমণে মিথ হয়ে হয়ে যাওয়া প্রধানমন্ত্রীর আমলেই ভারতের রপ্তানী মুখ থুবড়ে পড়েছে৷ বাজপেয়ী সরকারের আমলে রপ্তানী ছিল ১৪.৮, UPA1 সরকারের আমলে সেটা দাঁড়ায় সবচেয়ে বেশি ২৪.৪, UPA2 সরকারের আমলে সেটা কমে দাঁড়ায় ৯.১, তবে মোদীর সরকারের আমলে সেটা চলে গেছে মাইনাসে৷ মোদীর আমলে সেটা দাঁড়িয়েছে মাইনাসে -৪.৭৷

গত চারটে সরকারের তুলনা করলে সবদিক দিয়েই পিছিয়ে মোদী সরকার৷ এমনকি বিজেপিরই বাজপেয়ী সরকারের চেয়ে বেশ কিছু ব্যপারে অনেক পিছিয়ে মোদী সরকার৷ তাহলে ‘আচ্ছে দিন’ টা কোথায়? সবটাই কি শুধু মুখের ডায়লগ? উঠছে প্রশ্ন৷ স্বয়ং রিজার্ভ ব্যাঙ্কের বিভিন্ন রিপোর্টই সেই প্রশ্নচিহ্ন তুলে দিচ্ছে৷

সবমিলিয়ে মোদীর ‘আচ্ছে দিনে’ র কি মহিমা! সবেতেই পিছিয়ে যাচ্ছে ভারত৷ সমস্যায় পড়ছেন গরীব ও মধ্য়বিত্তরা৷ প্রশ্ন উঠছে, আচ্ছে দিনের ধাক্কা আর কতদিন সামলাতে হবে ভারতবাসীকে? আচ্ছে দিন কি আদৌ দেখতে পাবে ভারতের আমজনতা? প্রশ্ন কিন্তু উঠছে৷ আর সেই প্রশ্নের জবাব নেই ভারতবাসীর কাছে৷ কব আয়েগা আচ্ছে দিন???

সপ্তম পর্বের দশভূজা লুভা নাহিদ চৌধুরী।